Ab Malek

আজাদী সম্পাদকের স্বপ্ন ছোঁয়ার গল্প

প্রকাশিত :১৬.০১.২০১৬, ৮:৫১ পূর্বাহ্ণ

জাহিদ হাসান : ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের সেই দিনটা এখনো মনে করতে পারেন দৈনিক আজাদীর সম্পাদক আবদুল মালেক।

যুদ্ধে হেরে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পন করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন। এ খবর যখন ছড়িয়ে পড়লো, তখন পত্রিকার সাংবাদিক-কর্মচারীরা ছুটে আসলেন।

‘তারা নিজে থেকেই বললেন, পরের দিনই পত্রিকা বের করতে চান তারা। আমি বললাম অবশ্যই পত্রিকা বেরুবে।’ ‘সেই রাতে সবাই মিলে কাজ করে আমরা পরদিন সকালে কাগজ বের করলাম। খুব বড় কাগজ নয়। ডিমাই ওয়ান ফোর সাইজের।’

‘১৭ই ডিসেম্বর সকালে আমার জানা মতে পুরো বাংলাদেশে একটাই পত্রিকা বেরিয়েছিল। সেটা দৈনিক আজাদী।’ সে হিসেবে বলা যেতে পারে আজাদী হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রথম দৈনিক।

সম্প্রতি লন্ডনে প্রবাসী চট্টগ্রামবাসীর সংগঠন ‘চট্টগ্রাম সমিতির’ এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে আজাদীর সেই সংস্করণটির পুনর্মূদিত কপি নিয়ে এসেছিলেন পত্রিকার মালিক এবং সম্পাদক আবদুল মালেক। এটি এখন ‘কালেক্টর্স আইটেম’।

বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর পত্রিকার ইতিহাস অবশ্য জড়িয়ে আছে নানাভাবে। তা নিয়ে গর্বিত তিনি। বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল এবং প্রভাবশালী এই আঞ্চলিক দৈনিকের সঙ্গে তিনি জড়িয়ে আছেন কিশোর বয়স থেকে। বিবিসির সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি বর্ণনা করেছেন দৈনিক আজাদীর ৫৫ বছরের নানা কাহিনী।

সবেেচয়ে পুরোনো আঞ্চলিক দৈনিক
‘দৈনিক আজাদী হচ্ছে বাংলা ভাষায় সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশিত আঞ্চলিক দৈনিক, দাবি করলেন মিস্টার মালেক। “বাংলাদেশে এবং বাংলাভাষী অন্যান্য অঞ্চলে হয়তো আরও অনেক আঞ্চলিক দৈনিক বেরিয়েছে, কিন্তু কোনটিই এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকেনি।”

আজাদী প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর। তার পর থেকে আজ পর্যন্ত দুই দফা পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ ছিল। প্রথম ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার পর। পাকিস্তানি বাহিনী চট্টগ্রামে আজাদী অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেয়। দ্বিতীয়বার ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যখন চারটি বাদে সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়।

“আমার বাবা আবদুল খালেক ছিলেন প্রকৌশলী। কিন্তু তিনি দেখলেন মুসলিমরা শিক্ষায়-দীক্ষায় সব দিক থেকে পিছিয়ে। তাই চাকুরি ছেড়ে অন্য কিছু করার কথা ভাবলেন। প্রথমে একটি লাইব্রেরী খুললেন। এরপর ছাপাখানার ব্যবসায় নামলেন। কারণ বই ছাপাতে তো ছাপাখানা দরকার। চট্টগ্রামের প্রথম বিদ্যুত চালিত আধুনিক ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি, নাম দিয়েছিলেন কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেস’।“

“আমাদের প্রেসেরও কিন্তু একটা ইতিহাস আছে। ১৯৫২ সালে যখন ভাষা আন্দোলন হলো, এ নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন কবি মাহবুবুল আলম। তার সেই বিখ্যাত কবিতা “কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।”

“এই কবিতা কিন্তু সেই রাতেই আমার বাবার তত্ত্বাবধানে আমাদের প্রেস থেকেই ছাপা হয়েছিল। এটা আরেকটা ঐতিহাসিক ঘটনা। আমাদের গৌরবের বিষয়।”।

এই কাজের জন্য মূল্য দিতে হয় তাদের। গ্রেফতার করা হয় প্রেসের ম্যানেজারকে। ছয় বছরের সাজা হয় তার। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তি পান তিনি।

“কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেস থেকে ছাপা হতো চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংবাদপত্র। সেটা দেখে আমার বাবা ভাবলেন, অন্যের পত্রিকা যদি ছাপাতে পারি, তাহলে আমি নিজেই কেন একটা পত্রিকা বের করি না।”

“দৈনিক আজাদীর যখন বেরুলো, তখন চট্টগ্রামে পত্রিকা বিলি করার মতো কোন হকার পর্যন্ত ছিল না। পত্রিকার দাম তখন দুই আনা। আমরাই সাইকেলে করে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পত্রিকা বিলি করতাম। এভাবে এক মাস আমরা পত্রিকা বিলি করেছি।” স্বেচ্ছাসেবী হকারের ভূমিকায় দৈনিক আজাদীর সঙ্গে সম্পর্ক শুরু, কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর তাকেই নিতে হয় এই পত্রিকা পরিচালনার অনেক গুরুদায়িত্ব।

“আমি হলাম আমার বাবার একমাত্র ছেলে। উনি যখন মারা গেলেন আমি তখন কলেজে পড়ি। আমার বয়স তখন একুশ বছর মাত্র। আমার মনে হলো, আমার বাবা একটা জিনিস রেখে গেছেন, এটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে আমাকে।”

ব্যাপারটাকে অনেকটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন তিনি। বছরের পর বছর এই কাগজের পেছনে লোকসান দিয়েছেন। কিন্তু হাল ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবেননি।

“আমরা চেয়েছিলাম কাগজটা জনগণের কাছে পৌঁছাক। আমার মনে হয় আমরা সেই কাজে সফল হয়েছি। পাঠকরা বুঝতে পারেন এটা তাদেরই কাগজ।”

একটানা ৫৫ বছর ধরে একটা কাগজকে পাঠকপ্রিয় হিসেবে ধরে রাখা, এর পেছনে কোন বিষয়টা সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে?

আঞ্চলিক খবরের প্রাধান্য
“আমাদের কাগজের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আমরা মাসে বিশ থেকে পঁচিশ দিন চট্টগ্রামের কোন খবরকেই লীড স্টোরি করি। আমরা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খবরগুলোকেই প্রাধান্য দেই। শুধু তাই নয়, আমরা মাঝে মধ্যে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা দিয়েও হেডলাইন করি।”

“যেমন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস যেদিন নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন, আমাদের পত্রিকার হেডলাইন ছিল, ‘আঁরার ইউনুস নোবেল ফাইয়ি’।”

“আমি মনে করি এর মাধ্যমে আমরা চট্টগ্রামবাসীর অন্তরের অনেক নিকটে পৌঁছে গেছি। কিছুদিন আগে চট্টগ্রামে পর পর দুবার পাহাড়ী ঢলে বন্যা হয়েছে। আমরা হেডলাইন করলাম, ‘আবার হইয়ি’।”কিন্তু একটি সংবাদপত্রে আঞ্চলিক ভাষার এই ব্যবহার পাঠকরা কিভাবে নেয়?

“পাঠকরা এটা খুব এনজয় করে। আমরাও মনে করি, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা টিকিয়ে রাখার জন্য এটা দরকার।” মিস্টার মালেকের আশংকা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ক্রমেই বিপন্ন হচ্ছে, বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা এখন আর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে চাইছে না। তারা শুদ্ধ বাংলায় কথা বলে। তার মতে, আঞ্চলিক ভাষা যদি এভাবে মরে যায় সেটা কিন্তু ভালো লক্ষণ নয়।

“চট্টগ্রামের যে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, সেটাকেই আমরা ধরে রাখতে চাই।” কিন্তু অনলাইন গণমাধ্যমের প্রসারের ফলে মূদ্রিত সংবাদপত্র এখন যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, সেটা নিয়ে কতটা চিন্তিত তিনি?

“আমার মনে হয় না আগামী দশ-বারো বছরের মধ্যে আমাদের এরকম চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে। কারণ বাংলাদেশে বেশিরভাগ মানুষ এখনো অনলাইনে যেতে পারেন না, তাদের সেই সুবিধে নেই।” কিন্তু তাই বলে আমরা এই প্রযুক্তিকে অবহেলা করছি না।আমাদের কাগজ কিন্তু অনলাইনে আছে। প্রতিদিনের প্রিন্স সংস্করণও আমরা ই পেপার হিসেবে অনলাইনে দিচ্ছি। অনলাইন পাচ্ছেন। প্রতিদিন আড়াই লক্ষ হিট হয় আমাদের সাইটে। “আমার স্বপ্ন ছিল, এই কাগজটাকে আমার এস্টাবলিশ করতে হবে। সেই স্বপ্ন আমার পূরণ হয়েছে। আমি আমার স্বপ্ন ছুঁয়ে ফেলেছি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published.