d2e31a74f34eb4543c16f5265208a38c-57b1399171188-550x380

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নীলনকশা হয় দু’বছর আগেই :শশাঙ্ক ব্যানার্জী

প্রকাশিত :১৬.০৮.২০১৬, ১১:৫৭ অপরাহ্ণ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে এদেশে সামরিক শাসনের যে উত্থান তার নীলনকশা শুরু হয় কমপক্ষে আরও দু’বছর আগে। এই হত্যাকাণ্ডের সুবিধাভোগী হিসেবে পরবর্তীতে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৩ সাল থেকেই এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত। তবে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি সশরীরে উপস্থিতি এড়িয়ে যান।
সম্প্রতি লন্ডনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব দাবি করেছেন ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক ব্যানার্জী।
১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতীয় এই কূটনীতিক ১৯৭১ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন লন্ডনে ভারতীয় দূতাবাসের অ্যাটাশে। এই দুই সময়ের দায়িত্বকালেই কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান ও জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তার। এমনকি লন্ডন থেকে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সময়ে নিজের একটি সুটকেস ও ব্যাটন শশাঙ্ক ব্যানার্জির কাছে রেখে গিয়েছিলেন কর্নেল ফারুক, যেটি সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হয়েও ১৯৭৩ সালে লন্ডন থেকে নিয়ে যান জিয়াউর রহমান।
কর্নেল ফারুক রহমানের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও মুজিব সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রের বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় এই কূটনীতিকের লেখা ‘ইন্ডিয়া, মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ লিবারেশন অ্যান্ড পাকিস্তান’ (অ্যা পলিটিক্যাল ট্রিটিজ) বইয়ে একটি বিশেষ অধ্যায় রয়েছে। বইটির ১৬তম অধ্যায়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রসঙ্গে শশাঙ্ক ব্যানার্জী লিখেছেন, ‘১৯৭৩ সালে লন্ডনে যুদ্ধখেলায় যুক্ত হয়েছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান।’
এসব বিষয় সম্পর্কে জানতে শশাঙ্ক ব্যানার্জীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ১৯৭৩ সালে বসন্তের এক বিকেলে যুদ্ধ খেলা শুরু হয়, স্থান লন্ডন। প্রধান চরিত্র ছিলেন বাংলাদেশের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ জিয়াউর রহমান। ভারতের বিচক্ষণ গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে জানা যায়, পাকিস্তানের রাওয়ালপিণ্ডির সদর দফতরে জেনারেলরা হতাশা ও ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে গোয়েন্দা প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করছেন কীভাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যায়। হত্যাকাণ্ডের গণ্ডগোলের মধ্যে একজন জেনারেলের সামরিক ক্ষমতা গ্রহণ ঘটতে পারে কিনা সে বিষয়েও সম্ভাব্য অপশনগুলো আলোচনা হয়েছে রাওয়ালপিণ্ডিতে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা গোপনে একটি জনপ্রিয়তা যাচাই ক্যাম্পেইন করতে চাইছিল যাতে এই বিশেষ অপারেশনের প্রস্তুতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। তার আগে তারা সাধারণ জনগণের মধ্যে মুজিবের বিরুদ্ধে প্রোপাগাণ্ডা তৈরি করে।
কিন্তু, জিয়াউর রহমানকেই টার্গেট করে যে রাওয়ালপিণ্ডির সামরিক কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিকল্পনা ছক আঁকছেন, ঘটনার দুই বছর আগে ১৯৭৩ সালেই এই সিদ্ধান্তে আপনি কেমন করে পৌঁছেছিলেন?
এ প্রশ্নের জবাবে শশাঙ্ক ব্যানার্জী বলেন,‘রাওয়ালপিণ্ডির সামরিক গোয়েন্দা ও জেনারেলরা অ্যাবোটাবাদের যে প্রশিক্ষণ শিবিরে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন জিয়াউর রহমানও একই স্থানে প্রশিক্ষণ নেন। সেসময়েই তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠে। তাছাড়া জিয়াউর রহমান এর আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতেই কর্মরত ছিলেন। তাই পাকিস্তানি গোয়েন্দা ও জেনারেলদের জন্য জিয়াউর রহমান ছিলেন একটি ভালো অপশন। ১৯৭৩ সালের দিকে ভারতে একটি গুজব চলছিল যে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ, এই দুই সংস্থা মিলে শেখ মুজিবের হত্যার পরিকল্পনা করেছে। আর সেই সময়ে জিয়াউর রহমান ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাছাড়া ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্র থেকে আমরা জানতে পেরেছিলাম জিয়াউর রহমান ওয়াশিংটনে গিয়ে পাকিস্তানি মিলিটারি অ্যাটাশের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, অথচ জিয়াউর রহমান আমার সঙ্গে (শশাঙ্ক ব্যানার্জী) লন্ডনে বৈঠকের সময় কিন্তু নিজে থেকে বলেননি তার সঙ্গে আইএসআই এর বৈঠক হয়েছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে আমি জানতে চাইলে জিয়াউর রহমান স্বীকার করেন, তিনি পাকিস্তানি মিলিটারি অ্যাটাশের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।’
শশাঙ্ক আরও জানান,‘বাংলাদেশকে সমর্থন দেওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সেসময় ইন্দিরা গান্ধী সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গোপসাগরে নিক্সনের পাঠানো ৭ম নৌবহরের উপস্থিতি উপেক্ষা করে ভারতীয় বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে। মার্কিন বাহিনীর ৭ম নৌবহর একটি গুলি না ছুঁড়েও ফিরে যাওয়া ছিল চীনের সামনে মার্কিনিদের বিশাল পরাজয়।তাই ইন্দিরা গান্ধীর আশীর্বাদপুষ্ট সরকারকে উৎখাত করতে পারলে নিক্সনের ব্যক্তিগত ক্রোধ কিছুটা হলেও কমবে।’
শশাঙ্ক ব্যানার্জীর মতে, লন্ডনে ‘স্যুটকেস ওয়ার গেইম’ বৃত্তান্তই মুজিব হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততার সিদ্ধান্তে তাকে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে।
তিনি আরও জানান, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জন্য জোটবিরোধী নীতি তৈরিতে মনোযোগ দিয়েছিলেন। যুদ্ধকালীন যেমন ভারত ও রাশিয়া হয়ে উঠেছিলো বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু, তেমনি যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ক্রম বিকশিত জোটবিরোধী নীতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বঙ্গবন্ধু ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ কর্নেল জিয়াউর রহমানকে তার ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৭৩ সালে ওয়াশিংটনে পাঠান। জিয়াউর রহমান ৬ সপ্তাহের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় পেন্টাগন, সিআইএ এবং স্টেট ডির্পাটমেন্টের প্রধানদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পথে জিয়াউর রহমান লন্ডনে এসে আমার সঙ্গে দেখা করেন। আমি সেসময় লন্ডনে ভারতীয় হাইকমিশনের অ্যাটাশের দায়িত্ব পালন করছিলাম।’
তিনি দাবি করেন, লন্ডন থেকে ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের আগে ফারুক রহমান তার একটি স্যুটকেস ও কর্নেল ব্যাটন রেখে যান তার কাছে। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন সফরে আসেন তদানীন্তন ডেপুটি চিফ অব স্টাফ জিয়াউর রহমান। ৬ সপ্তাহের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় পেন্টাগন, সিআইএ এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রধানদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে ফেরার পথে লন্ডনে এসে তার (শশাঙ্ক) সঙ্গে দেখা করেন জিয়া। তিনি তখন তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনের অ্যাটাশে। মূলত ফারুক রহমানের স্যুটকেসটি ফেরত নিতেই আসেন তিনি। কিন্তু, তার আগমন ও অধঃস্তন কর্মকর্তার সুটকেস বহনই ইঙ্গিত দেয় অন্য কিছু ঘটতে যাচ্ছে।
তিনি জিয়াউর রহমানের কাছে জানতে চান,‘একজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা হয়েও তিনি কেন ফারুক রহমানের মতো অধীনস্ত কর্মচারীর স্যুটকেস নেওয়ার তুচ্ছ কাজ করতে যাচ্ছেন?’ জবাবে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন,‘কর্নেল ফারুক আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাই তার স্যুটকেসটি আমি নিজ হাতে পৌঁছে দিতে চাই।’ তখনই শশাঙ্ক ব্যানার্জী সামরিক ক্যুর মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখল করার গোপন ইচ্ছার বিষয়টা বুঝতে পারেন।
শশাঙ্ক ব্যানার্জী জানান, ওয়াশিংটন সফরকালে পাকিস্তানি মিলিটারির সঙ্গে জিয়াউর রহমানের কী ধরনের কথা হয়েছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে জিয়াউর রহমানকে খুব নার্ভাস দেখাচ্ছিল। তবে শশাঙ্ক ব্যানার্জীর খোঁচাখুচির জবাবে জিয়াউর রহমান স্মিত হেসে জবাব দিলেন,‘আপনার ঈশ্বর প্রদত্ত ঊর্বর কল্পনা শক্তি আছে, একটি স্যুটকেস নিয়ে আপনি আমার সঙ্গে রসালো যুদ্ধ খেলা খেললেন।’
শশাঙ্ক বলেন, জিয়াউর রহমানের সঙ্গে লন্ডনের কথোপকথনের বিস্তারিত নিয়ে দিল্লিতে একটি রিপোর্ট পাঠাবো সেকথাও তাকে ওই বৈঠকে জানাই। এ কথা জেনে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন,‘আপকে পাস ইতনা খিয়ালি পোলাও হ্যায়? আপনার ফরেন সার্ভিসে কাজ না করে গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করা উচিত ছিলো মিস্টার ব্যানার্জী।’ বাংলা ট্রিবিউন