1472091547

‘বৃক্ষমানব’ বাজানদারের নতুন জীবন শুরু

প্রকাশিত :২৫.০৮.২০১৬, ৯:০৩ পূর্বাহ্ণ

সারাবেলা ডেস্ক:খুলনার পাইকগাছা পৌর সদরে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মানিক বাজানদারের ছেলে আবুল বাজানদার। চার ভাই চার বোনের মধ্যে আবুল বাজানদার ষষ্ঠ। ২০০৫ সালে আবুল বাজানদারের দেহে প্রথম সেই বিরল চর্মরোগ দেখা দেয়। তখন তার বয়স ১৫ বছর। সে বছর খুলনায় বৃষ্টিপাতে চারদিক ডুবে যায়। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় সর্বত্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

থই থই পানির মধ্যে ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতেন আবুল বাজানদার। এক সময় তার হাতে ও পায়ে আঁঁচিলের মতো দেখা দেয়। সেই আঁঁচিল ১০ বছরে ধীরে ধীরে ‘শিকড়ে’ রূপ নেয়। তার দুই পায়ের কিছু অংশেও এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘শিকড়দেহী’ আবুল বাজানদারের ছবি ছড়িয়ে পড়লে তার চিকিত্সার দায়িত্ব নেন পোড়া রোগীদের অকৃত্রিম বন্ধু ডা. সামন্ত লাল সেন।
প্লাস্টিক সার্জনগণ বলেন, এ রোগটি এপিডার্মো ডিসপে­শেয়া ভেরুকোফরমিস। এটা এক ধরনের ভাইরাসজনিত রোগ। এ পর্যন্ত বিশ্বে এর আগে মাত্র দুইজন এ রোগে আক্রান্ত হন। এদের একজন ইন্দোনেশিয়া ও অপরজন রোমানিয়ার বাসিন্দা। ২০০৮ সালে ইন্দোনেশিয়ার রোগীর দেহে অপারেশন করা হয়। তারও পুরো শরীরে এ রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে ওই রোগী মারা যান।
রোগাক্রান্ত শরীরেই আবুল বাজানদার ২০১১ সালে বিয়ে করেন। স্ত্রীর নাম হালিমা বেগম। বাড়ি খুলনার দোকোপে। হালিমা পড়াশোনা করেছেন শহীদ স্মৃতি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে। মানবিক বিভাগে এসএসসি পাস করেন তিনি। আবুল বাজানদারের বোন হাসিনার বিয়ে হয় হালিমাদের গ্রামে। বোনের বাসায় প্রায়ই যেতেন আবুল বাজানদার। সেখানে যাতায়াত করতে করতেই প্রতিবেশী হাসিনার সঙ্গে তার পরিচয়। দুজনের মন দেয়া নেয়ার শুরুও তখন থেকেই।
এরপর দেড় থেকে দুই বছর তারা প্রেম করেন। এরপর দুজনের বিয়ে হয়ে যায়। দিনটি ছিল ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর। তবে পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে হয়নি। কারণ দুজনের পরিবারই এই বিয়ে মেনে নেয়নি। বিশেষ করে, হালিমার পরিবার বিয়েতে তীব্র আপত্তি তোলে। এমন বৃক্ষমানবের সঙ্গে সম্পর্ক কে মেনে নেবে? তবে হালিমা বলেছে, আবুলের কেউ নেই। ওর জন্য আমি আছি।
বিয়ের জন্য উকিলের কাছে যান তারা। উকিল আবুল বাজানদারের ছবিসহ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিয়ে যায় হালিমাকে। অবশেষে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় তারা। এখন তাদের সংসারে রয়েছে ফুটফুটে একটি কন্যা শিশু। নাম জান্নাতুল ফেরদৌস তাহেরা। বয়স তিন বছর।
আবুল বাজানদার বলেন, মেয়ে তার কোলে বসে তাকে  মুখে তুলে খাওয়াতো। বাবার শারীরিক ত্রুটি সে বুঝতো না। মেয়ের ভালবাসায় কিছুক্ষণের জন্য হলেও তিনি ভুলে যেতেন নিজের শারীরিক কষ্ট।
আবুল বাজানদার বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান অধ্যাপক ডা. আবুল কালামের অধীনে চিকিত্সাধীন। আছেন ৫১৫ নম্বর কেবিনে। তার দেহে ১১ বার অপারেশন হয়েছে। এখন আর নতুন করে রোগটি ছড়াচ্ছে না বলে অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম জানান। তবে তার  শরীরে আরও ছোট কিছু অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে আবুল বাজানদার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন।
এখন কেউ তাকে দেখলে বুঝতেই পারবে না, তিনিই পাইকগাছার সেই বৃক্ষমানব আবুল বাজানদার।  সিনেমার নায়কের মতই সুন্দর চেহারা তার। কেউ তাকে দেখতে গেলে হাসিমুখে কথা বলে সে। স্ত্রীর মুখেও হাসি। যে বৃক্ষমানবকে তিনি বিয়ে করেছেন, যাকে দেখলে মানুষ একসময় ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিতো তিনি এখন সুস্থ। “এটাই আমার প্রেমের সার্থকতা”- জানালেন বাজানদারের স্ত্রী। বললেন, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে এটা সম্ভব হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বাজানদার যেন হাসপাতাল ত্যাগ করতে না পারে। বাজানদারের চিকিত্সার ব্যয়ভারও বহন করেন প্রধানমন্ত্রী। তার চিকিত্সার সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিতেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।
সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন তিনি- চিকিত্সকরা এমনটাই প্রত্যাশা করছেন। বাজানদারের ঘটনার মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হলো যে যাবতীয় পরীক্ষা-নীরিক্ষার সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলে এই দেশের চিকিত্সকরাই আবুল বাজানদারের মতো রোগীদের জটিল অপারেশন করতে সক্ষম।
 ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমানে প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেনের হস্তক্ষেপে আবুল বাজানদারকে খুলনা থেকে ঢাকা আনা হয়। প্লাস্টিক সার্জন অধ্যাপক ডা. আবুল কালামের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের মেডিক্যাল বোর্ড তার চিকিত্সা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এই বোর্ডে ছিলেন প্লাস্টিক সার্জন অধ্যাপক ডা. সাজ্জাদ খন্দকার, অধ্যাপক ডা. রায়হানা আউয়াল রয়েছেন। হাসপাতালে তার চিকিত্সা মনিটর করতেন সহকারী অধ্যাপক ডা. নাসির ও ডা. নুরুন নাহার লতার নেতৃত্বে চিকিত্সকদের একটি টিম। আগামী ৬ মাসের মধ্যে তিনি বাড়ি যেতে পারবেন বলে চিকিত্করা আশা করছেন।