k-khan

আমার বিজয়

প্রকাশিত :১৬.১২.২০১৬, ৩:৫৩ অপরাহ্ণ

কানতারা কে খান

ডিসেম্বর মাস। প্রাকৃতিক নিয়মে যদিওবা এইসময়ের মধ্যে জম্পেশ শীত পরে যাবার কথা, তবুও কেন জানি, শহরে অন্তত, শীত এখনো আমাদের সঙ্গে লুকোচুরি আর ছোয়াছুয়ি খেলছে। কিন্তু তাইবলে আমাদের মন তো আর বসে নেই। প্রজাপতির মতন হালকা শীতের আমেজেই সে স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়াচ্ছে আর সময়টাকে উপভোগ করছে।
ডিসেম্বর, আমাদের বিজয়ের মাস। আমাদের প্রাপ্তির মাস, অহংকারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার মাস। সারা বিশ্বকে দেখিয়ে দেবার মাস। বীর বাঙালি বলে কথা। হয়তোবা লোক দেখানোর কমই আছে, তবে বুকের ভিতর আছে অসম্ভব এক শক্তি, অদম্য এক স্পৃহা। তাই নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি আমরা।

আমাদের অনেকের মনেই হয়তোবা প্রশ্ন, বিজয়, জিনিষটা কি? দেখতে কেমন, কেমন অনুভত হয় বিজয়ে? বিজয় কি কষ্টের নাকি সুখের? বিজয় কি চাহিদা নাকি প্রাপ্তি? অপরিহার্য নাকি বিলাসিতা? জয়ের অপর নামই কি বিজয়? জানতে ইচ্ছে করে।
তাই বিজয়কে বুঝতে একটু ইতিহাসের দিকে তাকাই।  পিছনের দিকে তাকালেই একেবারে শিকড়ে নাড়া পরবে। সাতচল্লিশে ব্রিটিশরা দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, ভারত ও পাকিস্তান।  মুসলিম আধিক্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সীমানা চিহ্নিত করা হয়, ফলে পাকিস্তানের মানচিত্র দুটি পৃথক অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে যায়। তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমানের বাংলাদেশ নিয়ে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান এবং অপরটি পশ্চিম পাকিস্তান। বৈষম্য সেই শুরু থেকেই; অর্থনৈতিক  বৈষম্য, সামরিক অসমতা, রাজনৈতিক বিষমতা, মতপার্থক্য এবং পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের নানা অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পদক্ষেপ ধীরে ধীরে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের মনে বিক্ষোভের দানা বাঁধতে উৎসাহিত করে। যার চূড়ান্ত ফসল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন।

জন্মের পর মানুষের প্রথম মতপ্রকাশের মাধ্যম ভাষা।  সেই ভাষার উপর যখন আঘাত আসলো, বাঙালি তখন প্রথমবাররে মতো রুখে দাঁড়ালো। বাঙ্গালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপর নিপীড়নের প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো, যখন পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ২১ শে মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান) এক গণসংর্বধনা অনুষ্ঠানে দ্ব্যর্থহীন চিত্ত্বে ঘোষণা দেন ‘উর্দু এবং কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালি ছাত্রসমাজ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে এই ঘোষণার বিরুদ্ধে। আন্দোলন আরো তীব্রতম রূপ ধারণ করে ১৯৫২ সালরে ২১শে ফেব্রুয়ারি। এদিন পুলিশের গুলিতে ভাষার জন্য প্রাণ দেন সালাম, বরকত, রফিক, শফি, জব্বারসহ আরো অনেকে। ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হলো ভাষার অস্তিত্বকে রক্ষার জন্য। শেষ পর্যন্ত অনেকটা বাধ্য হয়েই ১৯৫৬ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে হয়। আজ বিংশশতাব্দীতে এসে বিশ্বব্যাপী, ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। একেই কি বলে, বিজয়? হয়তোবা তাই।
তবে এটা শেষ নয়, বরং শুরু। এরপরতো শুরু হলো আমাদের অস্তিত্বের লড়াই। একের পর এক বাধা ও তার বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিবাদ। ৬৬তে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছয় দফা, ৬৯-এ পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগে শেখ মুজিবুরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা; অতঃপর ঐতিহাসিক এগারো দফা কর্মসূচি পেশের মাধ্যমে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। এই সব কিছুই ধিরে ধিরে বাঙালিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো, চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষে। ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও পশ্চিম পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়, নানা টালবাহানা শুরু করে। এ ছিল বাঙালিদের সহ্যের বাইরে। আর তাই বঙ্গবন্ধুর একডাকে, এক তর্জনীর নির্দেশে, সাড়া দেয় পুরো বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ। বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ৯টি শব্দ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ গোটা জাতিকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উন্মাতাল করে তোলে। ১৮ মিনিটের ভাষণে শেখ মুজিব প্রত্যেকে বাঙালিকে দেন এক দিকনির্দেশনা, এক অকুণ্ঠভয় সাহস। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের প্রতিক্রিয়া সারাদেশে, শহর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত প্রান্তরে, শুধু একটাই বিশ্বাস, একটাই নির্দেশনা পৌঁছায়, ‘সব কথার শেষ কথা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ আর  ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ মুক্ত করো।’  এটাই ছিল প্রকৃত অর্থে বাঙালির স্বাধীনতার ঘোষণা। আমাদের বিজয়ের ঘোষণা।

এরপর তো শুধুই টকটকে লাল রক্তে ভেজা ইতিহাস। কাপুরুষের মত গভীর রাতে অসহায় নিরীহ বাঙালির উপর ‘অপারশেন সার্চলাইট’ এর নামে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড চালায় ভিতু পাকিস্তান আর্মি। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ভেবেছিলেন জোর করে বাঙালিকে দাবিয়ে রাখতে পারবেন। তাই বার বার তার মুখে উচ্চারিত হত এমন কথা। তিনি বলতেন, ‘কিল থ্রি মিলিয়ন অফ ডেম এন্ড দে (দা বেঙ্গলিস) উইল বি ইটিং আউট অফ আওয়ার হ্যান্ডস’।  ২৫ শে মার্চ সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঢাকা থেকে পালিয়ে যাবার পূর্বে এয়ারপোর্টে তিনি একই কথা বলেছিলো। তারা বিশ্বাস করেছিল বাঙালি হেরে যাবে। একরাতে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারবে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নকে। তবে ভুট্টো বোধ হয় কিছুটা বুঝেছিলো। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বারান্দা থেকে, ২৬শে মার্চ সকালে, যখন দূরে ইংরেজি সংবাদপত্র ‘দ্যা পিপল’ এর অফিস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ দাউদাউ করে আগুনে জ্বলছিল, তখন হয়তোবা ভুট্টো উপলব্ধি করেছিল, কি ভুলটাই না তারা করেছে। পাকিস্তান আর কখনোই আগের মতন হবে না।
আসলেও কোনোকিছুই আর আগের মতন হলো না।  ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরেই পাকিস্তানি সেনারা বঙ্গবন্ধুসহ তার পাঁচ বিশ্বস্ত সহকারীকে গ্রেফতার করে। তৎকালীন কর্মরত পাকিস্তানি জেনারেল সিদ্দিক সালিক এর বইতে উল্লেখ রয়েছে, সেই রাতে প্রথম প্রহরে পাকিস্তান রেডিওর কাছাকাছি ক্ষীণ এক ওয়েভলেংথ এ শোনা গিয়েছিলো বঙ্গবন্ধুর দেওয়া প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণাটি। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘এটাই হয়ত আমার শেষে বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহবান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক।’
যারা সেই রাতে ঘোষণাটি শুনেছিলেন তারা এবং তার বাইরেও প্রতিটি বাঙালি সেই রাত থেকেই নিজেদের সবকিছু দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তির সংগ্রামে। বঙ্গবন্ধুর সেই কয়টি কথা, ‘প্রত্যেকে ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে, আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’  অক্ষরে অক্ষরে পালন  করেছে বাঙালি তাদের নেতার কথা, বঙ্গবন্ধুর কথা।  দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ, হারিয়েছি আমরা অনেক কিছু, ফিরে পাইনি অনেককে, তবে রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে এনেছি আমাদের স্বাধীনতাকে। আমাদের বিজয়কে আটকাতে পারেনি শক্তিশালী পাকিস্তানি আর্মি। অতঃপর আত্মসর্মপণ তাদের।

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১। পৃথিবীর বুকে জন্ম নিলো একটি স্বাধীন দেশ; বিশ্বের অভিধানে সংযোজিত হলো বিজয়ের এক নতুন সংজ্ঞা। পৃথিবী অবাক তাকিয়ে দেখলো, মাথা উঁচু করে আছে এমন একটি জাতি, যারা প্রতিবাদ করে রক্ষা করলো নিজের মাতৃভাষাকে, রক্তের মূল্যে কিনে নিলো নিজের মাতৃভূমিকে। এটাই ছিল প্রতিটি বাঙালির বিজয়।
শুরু হলো নতুন এক পথচলা। যুদ্ধে ভঙ্গুর একটি দেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলা। কারো কাছে ভিক্ষা করে নয়, মাথা উঁচু করে দেশকে পৃথিবীর দরবারে পরিচিত করেছেন বঙ্গবন্ধু। পৃথিবীর বড় বড় নেতারা দেখতে চেয়েছে, জানতে চেয়েছে বঙ্গবন্ধুকে, সম্মানিত করেছে, নানা উপাধি দিয়েছেন তারা। বঙ্গবন্ধু একদিকে যেমন দেশ গুছাছিলেন, অন্যদিকে সারা পৃথিবীর সঙ্গে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পক প্রতিষ্ঠার লক্ষে কাজ করে যাচ্ছিলেন। ২৫শে সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে তিনি ছিলেন প্রথম, যিনি বাংলায় বক্তব্য রেখে আমাদের ভাষাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরো সম্মানিত করেছিলেন।  পৃথিবীর ইতিহাসে তিনি একমাত্র নেতা যার দূরদর্শীতার কারণে আজ বাংলাদেশের মাটিতে একজন ভারতীয় সেনাও দাঁড়িয়ে নেই। পৃথিবীর যেকোনো দেশের স্বাধীনতায় যখন কোনো ‘এলাইড ফোর্স’ সাহায্য করে, তখন যুদ্ধ শেষে সেদেশে তাদের কিছু সৈন্য সবসময় স্বাধীন দেশে দায়িত্বরত থেকে যায়। তাকিয়ে দেখি আমরা জাপান, কোরিয়া ও ভিয়েতনামে, মার্কিন  সৈন্যদের উপস্থিতি। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হয়নি, বঙ্গবন্ধু বুঝে ১৯৭২ সালেই সেই ব্যাপারে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। একেই বলে আমাদের নেতা, আমাদের বঙ্গবন্ধু, আমাদের বিজয়ের প্রতীক।

কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি আমাদের এগিয়ে চলা। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট, কিছু পথভ্রষ্ট কীটের কাছে হারাই আমাদের ধ্রুবতারাকে। সেই ভয়াল রাতে বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের ১৮ জন একনিমিষেই নাই হয়ে যায়। শত্রুরা ভেবেছিলো নিশ্চিহ্ন করে দেবে তারা বঙ্গবন্ধুর সত্তাকে। কিন্তু পারেনি। কথায় আছে, ‘রাখে আল্লাহ মারে কে।’ সেই রাতে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে গিয়েছিলেন। যদিও শত্রুরা তারপরেও চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেনি, তবুও তাদের ভাগ্যে লেখা ছিল অন্য কিছু।
৭৫ পরবর্তী সময় এদেশের মানুষের জন্য ছিল মেঘাচ্ছন্ন। উন্নতি যে একেবারেই হয় নাই, তা বলবো না, তবে যতটুকু হতে পারতো, তার কিছুই হয়নি। ১৯৮০ সালের দিকে সকল বাধা, সকল হুমকি উপেক্ষা করে দেশে ফিরেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। তবে দেশ শাসনের ভার হাতে নিতে লেগে গেছে ষোলটি বছর। ১৯৯৬ সালে দেশের গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে যখন পথচলা শুরু, তখন চারদিকে শুধু নাই নাই আর অন্ধকারের হোঁচট খাওয়া। বিদ্যুৎ নাই, চাকরি নাই, আন্তর্জাতিক বিশ্বে সম্মান নাই, সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার, গণতন্ত্র পদদলিত সর্বক্ষেত্রে। সেখান থেকেই যাত্রা শুরু। এসেছে অনেকটা পথ। তবে জানে, যেতে হবে আরো বহুদূর।

আজ ২০১৬ এর গল্প অনেকটাই ভিন্ন। আজ বার বার মনে পরে গোবিন্দ হালদারের সেই গানটা’ পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল … জোয়ার এসেছে জন-সমুদ্রে, রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল।’ অনেক রক্তের বিনিময়, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের আজকের এই অবস্থান। সহজ ছিল না পথটা। বাধা এসেছে বার বার। কখনো ধর্মের নামে, কখনো গ্রেনেড হয়ে, কখন জেলে আটকে রেখে, কখনোবা দেশ বিক্রি করে দেবার ভীতি দেখিয়ে বা মিথ্যা অন্য কোনো অভিযোগে। বাধা আজও আছে, আগামীতেও থাকবে। কথা সেটা নয়। দেখার বিষয় কিভাবে, নিজেকে সর্ম্পূণ উজাড় করে দিয়ে দেশকে ভালোবাসা যায়। একের পর এক পথভ্রষ্টদের মিথ্যা প্রমাণিত করে দেশকে এগিয়ে নেয়া যায়।

যখনি কোনো সুচিন্তার আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, তখনি শকুুনিদৃষ্টির কালোমেঘ ঈশানকোণে দেখা গিয়েছে। দেশের উন্নয়নে পদ্মা সেতু হবে, দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন হবে, পথ কাটলো সাদা বিড়াল। তবে শেষ রক্ষা হলো না। নিজ অর্থায়নে আজ পদ্মার বুকে দাঁড়িয়ে আছে অজস্র পিলার; খুব একটা দেরি নেই যখন আমাদের স্বপ্ন রূপ নিবে বাস্তবতায়।
দেশের অগ্রগতিতে অনুপ্রাণিত হয়ে যখন বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে, তখনি ধর্মের নামে দেশকে পিছনে নিয়ে যাবার চেষ্টা দেখেছি আমরা। কাজ হয়েছে কি? আজ বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করবার জন্য প্রস্তুত। হাজার হাজার বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আজ আমাদেরকে আর অবাক করে না। আমরা জানি, এটাই আমাদের প্রাপ্য। একটা সময় ছিল, দেশ অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকতো বেশিরভাগ সময়, ব্যবসা বাণিজ্য, কলকারখানা বন্ধ হবার উপক্রম। বিদেশি সংস্থাগুলো ন্যায্য অন্যায্য কারণে এগিয়ে আসছিলো না। তাই বলে আজো কি আমরা অন্ধকারে? শুরু করেছিল ৩০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিয়ে, আজ ১৫০০০ মেগাওয়াট ছুঁই ছুঁই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেবার প্রতিশ্রুতিতে অঙ্গীকারবদ্ধ বর্তমান সরকার। তাই বুঝি আজ বিজয়ের আলো ঝলমল করে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে।

২০০৮-২০০৯ সালের দিকে ডিজিটাল বাংলাদেশ ছিল হাস্যরসের এক গল্প। ভবিষ্যতের তরুণ নেতৃত্বে যখন দেশের মানুষকে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখায় তখন অনেকেই ভেবেছিলো এ যেন ‘ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে আকাশে উড়ার’ অভিপ্রায়। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে দেখেন। সেদিনের সেই গল্প আজ এক সফল বাস্তবতা। শুধু দেশ নয়, সারা বিশ্ব আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে যে, বাংলাদেশের এই সফল যাত্রা বিশ্বের জন্য একটি উদাহরণস্বরূপ। আজকের তরুণ নেতৃত্বে ‘আই সি টি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০১৬’ এর মাধ্যমে বয়ে এনেছে দেশের জন্য সম্মান। এই সম্মান কাদের জন্য? এই বিজয় কাদের? উত্তর আমার, আপনার সবার।

বছরের শুরুতে কোমলমতি শিশুদের হাতে নতুন বই, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্যে স্বয়ংসর্ম্পূণতা, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, আমার দেশ আমার গ্রাম প্রকল্পের মাধ্যমে ডিজিটাল মার্কেটিং এর সুবিধা গ্রামের প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া আজ বর্তমান বাস্তবতা। মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এম ডি জি) সফলভাবে বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে আজ সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এস ডি জি) এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। জলবায়ু পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারায় এখন বাংলাদেশ বিশ্ব রোল মডেল। বিশ্ব শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের ভূমিকা ঈর্ষণীয়। আর এম জি সেক্টর, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, রিনিউবল এনার্জি কোন খাতেই আমরা আজ পিছিয়ে নেই।

সম্প্রতিকালে বাঙালি ভারমুক্ত হয়েছে আর এক বিরাট আত্মগ্লানি থেকে। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর আমরা কিছুটা হলেও শান্তি দিতে পেরেছি সেই সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদজায়া, বীরাঙ্গনা ও শহীদ পরিবারদের, যাদের রক্ত ও ত্যাগের বিনিময় আমাদের লাল সবুজের পতাকা। আমরা বিচার করতে পেরেছি এমন কিছু নরপশুদের যারা বাংলাদেশ চায়নি। আজ বাঙালি জাতি ভারমুক্ত, কলঙ্কমুক্ত। বিশ্বদরবারে আমরা আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে শুনতে পাবো, কবি সুকান্তের মতো কেউ আমাদের বলছে, ‘সাবাস বাংলাদেশ! এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়।’
তবে এখানেই শেষ নয়; বন্ধুর পথ আরো বহুদূর, উৎরে যেতে হবে আরো বহু বাধা। সবেতো শুরু। মনে রাখতে হবে আমাদের উদ্দেশ্য, আমাদের গন্তব্য, অবিচল থাকতে হবে সত্যের পথে। বিশ্বাস করতে হবে নিজেদের উপর, নেতৃত্বের উপর। ভুলে গেলে চলবে না, আমি বড় না দেশ বড়। মাঝে মাঝে অবাক হই, যখন শুনি, কাউকে বলতে, আমি কোন দল করি না, আমি সাধারণ জনগণ। অবাক লাগে চিন্তা করতে, দেশকে ভালোবাসতে দল করতে হয়? একাত্তরের সেই নয় মাস, কোন দলে ছিলাম আমরা? কি দল করতাম তখন? অনেক ভেবে, উত্তর পেয়েছি। জীবনের দল, অস্তিত্বের দল, বেঁচে থাকার দল, নিজের ভাষায় কথা বলার দল।

আজ তাই বলবো, কোনো দল করার প্রয়োজন নাই। বিশ্বাস করুন নিজেকে, বিশ্বাস রাখেন নিজের অস্তিত্বের উপর। যে পাশে এসে দুঃসময় দাঁড়াবে, বিশ্বাস করুন তাকে। যে ভালোবাসবে, তার তরে উজাড় করে দিন নিজের ভালোবাসাকে। যে আগামীর পথ দেখাবে, তার কাছে সঁপে দিন বিশ্বাসকে। যে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকবে, স্বপ্ন দেখেন তার সঙ্গে। যে আশায় বুক বাঁধতে শিখাবে, তার আশায় আলোকিত করুন নিজেকে। যে বিজয়ের স্বাদ দেবে, তার বিজয় ভাগ করে নিন নিজের সঙ্গে। জয় আমাদের সেখানেই। আমাদের প্রত্যেকের স্বপ্নের রূপায়নই আমাদের জয়। আর প্রত্যেকের জয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের বহুকাঙ্খিত বিজয়।  তাই কাব্যিক ভাষায় বলছি,

‘বিজয় … সে আবার আলাদা কি?
আমার অস্তিত্বের মাঝেই তো সে লুকিয়ে আছে
আমার কথায়, আমার চিন্তায়, আমার ভালোবাসায়
সেই বিজয়েরই আনাগোনা
প্রতি দিনে রাতে আমার যেই স্বপ্ন, আমার যেই আকাঙ্খা
তার প্রতিফলনই আমার বিজয়।
বিজয় … সে আবার আলাদা কি
আমার প্রতিটি জয়ই প্রজ্জলিত হয়
আমার বিজয়।’

 

লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, আজ সারাবেলা।