dalim-feni

মা কেন সন্তানের ঘাতক

প্রকাশিত :১৯.১২.২০১৬, ৩:৩৩ অপরাহ্ণ

সোলায়মান ডালিম

বলা হয়ে থাকে মায়ের বিকল্প কেবল মা-ই। সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হচ্ছে মায়ের কোল। শ্রমে-ঘামে-রক্তে মা-ই পরম মমতায় আগলে রাখেন সন্তানকে। সেই মায়ের হাতে সন্তান খুন! এরপর মায়ের আত্মহত্যা। পুরো বিষয়টি যেন গোলকধাঁধার মতো। বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয়। মানবিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের এর চেয়ে বড় নির্মম উদাহরণ আর কী হতে পারে?
মা’র হাতে সন্তান খুন, কিংবা সন্তানের হাতে পিতা-মাতা খুনের ঘটনা নতুন নয়। সোমবার (১২ ডিসেম্বর) ফেনীর রামপুর এলাকার ঘটনাটি নাড়া দিয়েছে বিবেককে। হতবাক দৃষ্টিতে সবার একই প্রশ্ন, কি করে সম্ভব? মা কি সত্যিই খুনি? দুটি নিষ্পাপ সন্তানকে গলাটিপে খুন করার সময় একটিবারও কি মায়ের হাত কাঁপল না? এ কেমন মা? আবার তিনি নিজেই কেন আত্মহত্যা করলেন? প্রশ্নগুলোর জট যেন খুলছেই না। সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ছেলে মাহিন আহমেদ (৪) ও মেয়ে তাসনিম আহমেদ মাহি (৮) দুই সন্তানকে হত্যা করে আত্মহত্যা করেছে মর্জিনা আক্তার মুক্তা (২৮) নামের এ মা।
নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে মায়ের হাতে শিশু সন্তান হত্যার বিষয়টি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সবার মুখে একটাই আলোচনা। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী মনে করছে পারিবারিক কলহের কারণে ঘটনাটি ঘটেছে।
কিš‘ শুধু পরিবারিক কলহ মূল কারণ হতে পারে না- এভাবে মায়ের হাতে সন্তান হিংস্রতার শিকার হওয়ার কারণ হচ্ছে সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ কমে যাওয়া।’ এমটাই মনে করছে সমাজ বিজ্ঞান।
মা কর্তৃক দুই শিশুহত্যার এ ঘটনা হৃদয়বিদারক। যে মায়ের আঁচল সন্তানের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ, দশ মাস নিজের পেটে শত যন্ত্রণা নিয়েও গায়ের রক্ত দিয়ে বড় করেছেন, সেই মায়ের দ্বারা শিশুহত্যা ভাবা যায় না! বদ্ধ পাগল মাও এমন করে বলে শোনা যায় না। শোনা যায়, স্বামীর সঙ্গে মর্জিনা মুক্তার পারিবারিক কলহ ছিল। তিনি শিশুদের ভবিষ্যৎ ভাবনায় অস্থিরতায় ভুগতেন। নিজে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। কিন্তু সন্তানদের ভবিষ্যৎ কি? তা চিন্তা করে নিজেও মরলেন সন্তানদেরকেই নিয়ে গেলেন। তবুও সন্তানকে শ্বাস রোধ করে কেন মারলেন আর নিজেও কেন আত্মহত্যা করলেন তা বিস্তারিত জানা যায়নি।
তবে কি আমরা সমাজের অবক্ষয় দেখতে পাচ্ছি? এ কথা অনস্বীকার্য যে, সর্বত্র ভোগবাদের সমাজ তৈরির প্রচেষ্টাতেই পারিবারিক ও সামাজিক অনাস্থা বাড়ছে।
আমরা এ ঘটনার একটু গভীরে গেলেই দেখতে পাব, এ মা কতটা হতাশ ছিলেন। হতাশা তাকে চরমভাবে গ্রাস করেছে। কিš‘ এ জন্য দায়ী কে? সমাজ, পরিবার। একজন মা এ পরিস্থিতির দিকে ক্রমে এগিয়ে গেছেন কেউ কি তা লক্ষ্য করেছে? এর পেছনে কারণ কী?
পরিবারে আমরা যতটা শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকি, মানসিক অসুস্থতা নিয়ে ততটা ভাবী না। পরিবারে কেউ মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে কিনা তা-ও খেয়াল করি না। উপরন্ত‘ তাকে অবহেলা করে থাকি। অথচ মানসিক বিকারগ্রস্ত হওয়ার কারণে সমাজে বড় বড় অপরাধ ঘটে চলেছে। তাই শারীরিক সুস্থতার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক সুস্থতার বড় প্রয়োজন। একজন স্বাভাবিক মানুষ তার সন্তান খুন করতে পারে না। সামাজিক অবক্ষয় ও মূল্যবোধের অভাব ক্রমে মানুষকে অস্বাভাবিক করে দিচ্ছে। সমাজে অপরাধ যুগে যুগে ছিল, থাকবে। কিন্তু শিশু খুন, মায়ের হাতে সন্তান খুন কিংবা সন্তানের হাতে পিতা-মাতা খুন এসব কোনো সুস্থ সমাজের চিত্র হতে পারে না। সমাজের অবক্ষয় রোধে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে সচেতন হতে হবে।
সময় এসেছে আত্মহত্যার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলবার।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও সংগঠক