ড. কামাল হোসেন
ড. কামাল হোসেন

পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক রাখতে ভূট্টো শুধু মুজিবের পা ধরা বাকি রেখেছিলো- ড. কামাল হোসেন

প্রকাশিত :১০.০১.২০১৭, ১:৪২ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ থেকে দেড় হাজার মাইল দূরে রাওয়ালপিন্ডির মিয়ানওয়ালি কারাগারে দীর্ঘ নয় মাস বন্দী ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘ এই সময় ইয়াহিয়া-ভূট্টোর চোখে বিশ্বাসঘাতক শেখ মুজিবকে সহ্য করতে হয়েছে অসহ্য নির্যাতন। কারা প্রকোষ্ঠ্যে সারাক্ষণ মৃত্যুর প্রহর গুনতে হয়েছে শেখ মুজিবকে। ২৫ শে মার্চ মধ্যরাতে আটক হওয়ার পর শেখ মুজিবকে নেওয়া হয় ঢাকা ক্যান্টমেন্টে। সেখান থেকে করাচী। এপ্রিলেই প্রথম সপ্তাহেই নিক্ষিপ্ত হন মিয়ানওয়ালি কারাগারে। এর চার মাস পর লায়ালপুর কোর্টে শেখ মুজিবের বিচার শুরু হয়। জানা যায় সেপ্টম্বরের শেষ দিকে শেখ মুজিবকে ফাঁসি ঝুলানোর সব বন্দোবস্ত পাকা করেছিলেন ইয়াহিয়া খান। কিন্তু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালীকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়নি। বাংলার অদম্য মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন করেছে বাংলাদেশ। ছিনিয়ে এনেছে বঙ্গবন্ধুকে। ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি বন্ধবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানের কারাগারে কাটিয়ে এই দিনই তিনি ফিরেন স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে। যাত্রাপথে পাকিস্তান থেকে লন্ডন, সেখান থেকে দিল্লী হয়ে তিনি ঢাকায় পৌছান। মিয়ানওয়ালি কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর বেশ কিছু পাকিস্তান ও লন্ডনে বেশ কিছু  ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। জুলফিকার আলী ভূট্টোর সাথে ডিনার, ইরানের শাহ পাহলভীর সাথে সাক্ষাতের প্রস্তাব প্রত্যাখান, পাকিস্তানের সাথে নাকমাওয়াস্তে একটা সম্পর্ক বা কনফেডারেশন বজায় রাখাতে চতুর ভূট্টোর আকুতিসহ আরো অনেক কিছু। বাংলাদেশের ইতিহাসে  খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেই সব ঘটনার সাক্ষী বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্র মন্ত্রি বিজ্ঞ আইনজীবী ব্যারিস্টার ড. কামাল হোসেন। স্বাধীনতার ৪০ বছর পর ইতিহাসের সেই সব ঘটনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন ব্যারিস্টার ড. কামাল হোসেন।

আজ সারাবেলা : পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর সাথে আপনার প্রথম কবে দেখা হয়?

ড. কামাল হোসেন : আমি মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বন্দী ছিলাম হরিপুর জেলে। প্রথম দিকে আমার সাথে কয়েদির মত আচরণ করা হলেও ১৬ ডিসেম্বরের পর আমার প্রতি জেলারের আচরণ রাতারাতি পাল্টে যায়। আমাকে উন্নত খাবার দেওয়া হয়। পাল্টে যায় জেলখানায় আমার সেলের আসবাপত্র। এরপর ২৪ তারিখ জেলার বলেন, আমাকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যেখানে গেলে আপনার ভালো লাগবে। এরপর ২৮ ডিসেম্বরে হরিপুর জেলখানা থেকে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় রাওয়ালপিন্ডি পুলিশ একাডেমির শিহালা গেস্ট হাউজে। সেখানেই বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার প্রথম দেখা হয়। আমাকে দেখেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এতো দেরী করলা ক্যান।

 

আজ সারাবেলা : বঙ্গবন্ধুতো মিয়ানওয়ালী কারাগারে বন্দি ছিলেন । তাঁকে এই গেস্ট হাউজে কোন প্রেক্ষাপটে আনা হয়েছিলো?

ড. কামাল হোসেন : দেখুন, নিয়াজী ছিলেন মিয়ানওয়ালী এলাকার বাসিন্দা। ১৬ ডিসেম্বর নিয়াজীর আত্মসমর্পণের পর কারাগারে উত্তেজনা তৈরী হয়েছিলো। সেখানে বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা ছিলো। তাই সেখান থেকে জেলার তাঁকে এই গেস্ট হাউজে নিয়ে এসেছিলেন। সেখানে তিনি কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ছিলেন।

 

আজ সারাবেলা : ঐ গেস্ট হাউজে আপনারা কয়েক দিন ছিলেন। সেই সময় আপনারা কি করেছেন?

ড. কামাল হোসেন : গেস্ট হাউজে প্রথম যখন বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা হয় তখন তিনি রেডিও শুনছিলেন। আমার সাথে দেখা হওয়ার পরই তিনি বলেন, কামাল রেডিওটা নাও। বিভিন্ন চ্যানেলের খবর শোন। আমি তখন বিবিসি, আকাশবাণীসহ বিভিন্ন রেডিও’র খবর শুনতাম। পরে আমি সে বিষয়গুলো বঙ্গবন্ধুকে বলতাম। ঐ কয়েকদিন আমরা বিদেশী বিভিন্ন গণমাধ্যমের বাংলাদেশের বিভিন্ন খবর শুনি এবং প্রকৃত অবস্থা বোঝার চেষ্টা করি।

 

আজ সারাবেলা  : আমরা যতদূর জানি ঐ গেস্ট হাউজে জুলফিকার আলী ভূট্টো এসেছিলো। তার সাথে বঙ্গবন্ধুর কি কথা হয়েছিলো?

ড. কামাল হোসেন : সেখানে হটাৎ করেই একদিন ভূট্টো চলে আসেন। তখন বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন তুমি এখানে কেন। তখন ভূট্টো বলেন, আমি এখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। বঙ্গবন্ধু বলেন, তুমি কিভাবে প্রেসিডেন্ট হলে? সেই সময় চতুর ভূট্টো পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করেন। ভূট্টো বলেন, আপনিই আসলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হতেন। আপনিই সংখ্যাগরিষ্ঠদের নেতা। ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই সময় ভূট্টো আরো বলেন, যা হবার হয়ে গেছে। আপনি কোন না কোনভাবে পাকিস্তানের সাথে একটু হলেও সম্পর্ক রাখেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, সেটা পরে দেখা যাবে। বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন, তুমি আমাকে তাড়াতাড়ি দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা কর।

 

আজ সারাবেলা : পাকিস্তার ছাড়ার আগে ভূট্টোর দেওয়া এক ডিনারে আপনারা যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে কি ঘটেছিলো?

ড. কামাল হোসেন : আসলে ১৬ ডিসেম্বরের পর পাকিস্তানিরা ভীত হয়ে পড়ে। তারা তখন যুদ্ধ বন্দী ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব দুঃশ্চিতায় ছিলো। আর ভূট্টো চাচ্ছিলেন কোনভাবে একটা আপোষ করতে। সেটা শুধু কাগজে-কলমে বা লোক দেখানো হলেও। আর এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু রাজী করাতে ভূট্টো সব সময়ই চেষ্টা করেছে। ঐ ডিনারে ভূট্টো বঙ্গবন্ধুকে অনেক কাকুতি-মিনতী করেন। কিছু একটা করার জন্য। যাতে সম্পর্কটা থাকে। তার অবস্থা এমন পর্যায়ের ছিলো যে, ভূট্টো শুধু বঙ্গবন্ধুর বঙ্গবন্ধুর পা ধরা বাকি রেখেছিলো।

 

আজ সারাবেলা  : সে সময়ে ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী পাকিস্তান সফরে আসার কথা ছিলো। সে বিষয়টি নিয়ে ভূট্টো কি পরিকল্পনা করেছিলেন?

ড. কামাল হোসেন : ভূট্টো চাচ্ছিলেন কোন না কোনভাবে মুজিবের সাথে শাহর একটা সাক্ষাৎ করাতে। বঙ্গবন্ধুর উপর চাপ সৃষ্টি করাই ছিলো তার উদ্দেশ্য। ডিনারের সময় ভূট্টো মুজিবকে আবার সে কথা বলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বিষয়টি কঠোরভাবে মোকাবেলা করেন। তিনি বলেন আমি পাকিস্তানে আর কারও সাথে দেখা করতে চাই না। আমি দেখা করবো না। তোমার ইচ্ছা হলে তুমি আমাকে আবার জেলে পাঠাতে পারো। পরে আর ভূট্টো চুপসে যান। তিনি আর কিছু বলেনি। আমাদের দ্রুত লন্ডন পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

 

 

আজ সারাবেলা : লন্ডনে পৌছে আপনারা কি করলেন?

ড. কামাল হোসেন : লন্ডনে পৌছে বঙ্গবন্ধু কলকাতায় থাকা তাজউদ্দীন ও নজরুল ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা বলেন। তাদের কাছ থেকে যুদ্ধের বিভিন্ন কথা শোনেন। তারপর দেশে ফেরার বিষয় নিয়ে কথা বলেন। লন্ডন থেকেই বঙ্গবন্ধু দেশের বিভিন্ন খবরা-খবর আরো বিস্তারিতভাবে নিতে থাকেন। বিদেশী অনেক সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ঘটনা শোনেন।

 

আজ সারাবেলা : সেই সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথে সাথে আপনাদের সাক্ষাৎ হয়েছিলো। তার সাথে কি কথা হয়েছিলো?

ড. কামাল হোসেন : লন্ডন পৌছার পরই ১০ নম্বার ডাউনিং স্ট্রিটে আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমরা প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথের সাথে দেখা করতে যাই। বঙ্গবন্ধুর সাথে তার আন্তরিক পরিবেশে সাক্ষাৎ হয়। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে বিভিন্ন সহযোগিতার জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁকে ধন্যবাদ জানান। তখন বঙ্গবন্ধুকে হীথ বলেন, আমি কিভাবে আপনাকে সহযোগিতা করতে পারি। বঙ্গবন্ধু বলেন, আমি দ্রুত দেশে ফিরতে চাই। তখন হীথের রাষ্ট্রীয় কাজের জন্য দুইটি প্লেন ছিলো। তিনি তার সেক্রেটারিকে প্লেন দুইটির খোঁজ নিতে বলেন। তিনি খোঁজ নিয়ে বলেন একটি প্লেন পরশু ফ্লাইয়ের জন্য আবার তৈরী হয়ে যাবে। তিনি তখন বঙ্গবন্ধুকে ঐ প্লেনে ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান। আমরা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ঐ প্লেনে করেই দিল্লী আসি।

 

আজ সারাবেলা : পাক বাহিনীর গণহত্যা বা বুদ্ধিজীবী হত্যা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর কি ধরনের আবেগ আপনি দেখেছেন?

ড. কামাল হোসেন : গণহত্যার কথা আমরা শিহালা গেস্ট হাউজে থাকাকালীন সময়েই শুনেছি। সেই সময়ে তিনি অনেক ভারাক্রান্ত হৃদয়ে দেশের মানুষের কথা বলতেন। আর বলতেন আমি ভূট্টোকে বলেছিলাম মানুষ মেরে তোমরা পাকিস্তান রাখতে পারবা না। গণহত্যা করে বাঙ্গালীকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। তবে লন্ডনে এসে আমরা গণহত্যার কথা বিস্তারিত জানি। বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের কথা শুনি। বঙ্গবন্ধু তখন খুব আফসোস করেছিলেন। ১৪ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী নিহত হয়েছিলেন তিনি তাদের সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। যখন আমরা লন্ডন থেকে দিল্লীর পথে তখনও তিনি তাদের কথা বলে আফসোস করেন। আর একই সাথে বলেন, এইসব হত্যাকান্ডের সাথে যারা জড়িত তাদের বিচার তিনি করবেন।

 

আজ সারাবেলা : আপনারা দিল্লীতে পৌছে কি করলেন?

ড. কামাল হোসেন : ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর প্লেনে করে আমরা দিল্লী পৌছায় ১০ই জানুয়ারি দুপুরে। দিল্লীতে পৌছে আমরা ইন্দিরা গান্ধি সরকারের কাছে উষ্ণ অভ্যর্থনা পাই। পালাম বিমানবন্দরে ইন্দিরা গান্ধি, ভারতের রাষ্ট্রপতি ও সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। সেখানে বঙ্গবন্ধু একটা সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তাতে তিনি বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য ইন্দিরা গান্ধিকে ধন্যবাদ জানান। একই সাথে বাংলার মুক্তি সংগ্রামে ভারতের ভূমিকার জন্য ইন্দিরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। অনেকেই চেয়েছিলেন আমরা যেন দিল্লী হয়ে কলকাতা যাই। কিন্তু বঙ্গবন্ধু দ্রুত ঢাকা ফিরতে চাইছিলেন। শীতের সন্ধ্যা খুব দ্রুত নামে। তাই তিনি বিকেলেই ঢাকায় আসতে চেয়েছিলেন।

 

আজ সারাবেলা : বাংলাদেশে কয়টার দিকে পৌছালেন? এসে আপনি কি দেখলেন?

ড. কামাল হোসেন : ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্লেনে আমরা ঢাকা তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করি বিকাল তিনটার দিকে। আমি যতদূর জানি বঙ্গবন্ধুর আসার খবরে সকাল থেকেই বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স পর্যন্ত এলাকা হাজারো মানুষ ভীড় করেছিলো। বিমান থেকে নামার পরই তাজ ভাই (তাজউদ্দীন আহমদ) বঙ্গবন্ধুকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সেটা ছিলো এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি একে অপরকে জড়িয়ে কাঁদছেন। কাঁদছে আশে পাশের অনেকেই। বিমান বন্দর থেকে একটা ট্রাকে করে বঙ্গবন্ধু চলে যান রেসকোর্সের দিকে। তার পেছনে আর পাশে তখন লক্ষ জনতা।