mohammad a arafat 1

‘আমার এমপি-মন্ত্রী হবার কোনো বাসনা নেই’

প্রকাশিত :১৮.০১.২০১৭, ৭:২২ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ এ আরাফাত। চেয়ারম্যান, সুচিন্তা ফাউন্ডেশন। আহ্বায়ক, সুচিন্তা বাংলাদেশ। অধ্যাপক, কানাডিয়ান ইউনির্ভাসিটি অব বাংলাদেশ। যুক্তিপ্রবণ, বিদগ্ধজন। আওয়ামী লীগের পার্ট অব ইন্টালেকশিয়া। দ্বিতীয় প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠক, আওয়ামী লীগ-বিএনপির ভবিষ্যৎ, জামায়াতের অবস্থান, আগামী নির্বাচন আর আওয়ামী রাজনীতিতে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন ‘আজ সারাবেলা’র সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জব্বার হোসেন ও রবিউল ইসলাম রবি । 

 

আজ সারাবেলা : আপনি একাডেমিশিয়ান। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক। দীর্ঘদিন ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন। হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয় বদল করলেন কেন?

মোহাম্মদ এ আরাফাত : খুব সহজ হিসাব, আগে যে ইউনিভার্সিটিতে ছিলাম সেটি প্রতিষ্ঠিত। এখন যেখানে য্ক্তু হয়েছি কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, এটা নতুন উদ্দ্যোগ। নতুন চ্যালেঞ্জ। আমি নতুন একটি একাডেমিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছি। আমার যে একাডেমিক নেটওয়ার্ক রয়েছে দেশে-বিদেশে সে নেটওয়ার্কের সুবিধা, সুফল দিতে চাই দেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের। আমি বিশ্ববিদ্যায়ভিত্তিক চিন্তা করি না, চিন্তা করি বাংলাদেশভিত্তিক। আগের বিশ্ববিদ্যালয়টি খুবই ভাল ছিল। চাই দেশে আরও ভাল ভাল বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠুক। আমার যদি সুযোগ থাকে কনট্রিবিউট করার তবে কেন নয়?

আজ সারাবেলা : বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপনার সুনির্দিষ্ট কোন কর্মপরিকল্পনা আছে?

মোহাম্মদ এ আরাফাত : নিশ্চয়ই। প্রাইভেট ইউনির্ভাসিটি নিয়ে অনেকেরই নীতিবাচক ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করে এরা ‘ফার্মপ্রোডাক’। দেশ সম্পর্কে জানে না, ইতিহাস ঐহিত্য, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানে না। আমি সেই ধারণাগত জায়গাটিও বদলাতে চাই কাজ দিয়ে। ইতিমধ্যে সেই কাজ শুরুও করেছি। মনে রাখতে হবে, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, নট অব কানাডা। বিশ্বমানের শিক্ষার সুবিধা দেশে বিস্তার করা, নিজের দেশকে জানা, ভালবাসা, দেশের জন্য কাজ করায় শিক্ষার্থীদের যেন আগ্রহীও উদ্ধুদ্ধ করতে পারি সেটাই লক্ষ্য আমার। সবার আগে বাংলাদেশ। শুধু ক্লাশ লেকচার আর টিউটোরিয়াল যথেষ্ট নয় ব্যক্তির মানস গঠনে। তাই অনেক বেশি প্রোগাম নিয়েছি। যারা সফল মানুষ বিভিন্ন সেক্টরে, তাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ইন্ট্রারেকশনের সেশন নিয়েছি। এটা খুব ভাল ফলদায়ক। শিক্ষার্থীদের কনফিডেন্ট বেড়ে গেছে। আবার শিক্ষার্থীদের কেরিয়ার প্লান কি হবে সেখানেও কাজ করছি। অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমইও সাইন হয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা ইনটার্নশিপ করবে। আমার কথা হচ্ছে শুধু পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে হবে না, তোমাকে রিয়াল লাইফ ফেস করতে হবে। সেভাবে তৈরি হতে হবে। তবে তার আগে হতে হবে মানুষ। বাঙালি, বাংলাদেশের মানুষ।

আজ সারাবেলা : আপনি তরুণ বুদ্ধিজীবীদেরও একজন। আওয়ামী লীগেরও পার্ট অব ইন্টালেকশিয়া। একটা দল যখন ক্ষমতায় থাকে সে একধরনের সুবিধার মধ্যে থাকে। যদিও সংকট থাকে অনেক। আবার যখন ক্ষমতায় থাকে না, প্রতিকুল সময়, তখন এই বুদ্ধিবৃত্তিক অংশটাই তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করে। আওয়ামী লীগের এ জায়গায়টিতে কতটা প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি রয়েছে?

মোহাম্মদ এ আরাফাত : আওয়ামী লীগের একটা সুবিধা হচ্ছে, সাধারণ অর্থে যারা প্রগতিশীল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে, বাংলাদেশ দর্শনে বিশ্বাস করে তারা দলটির আদর্শের প্রতি একাত্ম ও সমথর্ক। খুব প্রাতিষ্ঠানিক না হলেও একধরনের উদ্দ্যোগ কিন্তু আওয়ামী লীগের মধ্যে আছে, যা  অন্য দলগুলোর নেই। সিআরআই খুব একটিভলি কাজ করছে। আওয়ামী লীগের নিজস্ব রিসার্চ ইন্সটিটিউট। সুচিন্তাও কাজ করছে। আমরা স্ট্রেটেজি বা কৌশলকে পলিটিক্সে ইনকর্পোরেট করি। আমাদের নিজেদের রিসার্চ সেল রয়েছে। যেটা হয়ত আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে, সুষ্ঠু গণতন্ত্রের চর্চাকে সহায়তা করে।

আজ সারাবেলা : কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন আওয়ামী লীগে কতটা তা নিয়েও তো প্রশ্ন রয়েছে অনেকের। প্রধানমন্ত্রীর পাঁচজন উপদেষ্টার দিকে যদি তাকাই, দেখব তারা সবাই সাবেক আমলা। মাঠ পর্যায়ের যে রাজনীতি তার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কতটুকু?

মোহাম্মদ এ আরাফাত : সাবেক আমলা যারা তারাও কিন্তু এক ধরনের বুদ্ধিজীবী। রাজনীতির মাঠে সবাইতো আর মিছিল করে না, স্লোগান দেয় না, তার বাহিরেও রাজনীতির লোক থাকে। রাজনীতি থাকে। তাদের যে বিশাল অভিজ্ঞতা তার একটা আলাদা মূল্য রয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে একজনের কথা বলি, ড. এসএ সামাদ। তিনি বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্টের এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি একজন প্রাক্তন সিএসপি। ইকোনোমিক্সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাস্ট ক্লাশ ফাস্ট হয়েছিলেন। মাস্টার্স করেছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে। পিএইচডি করেছেন বোস্টন থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেছেন। পরে আমলা হিসেবে তাকে দেখি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি ছিলেন। ৯৬-এ প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি ছিলেন। তার সর্বশেষ পরিচয় কিন্তু একজন সাবেক আমলা। এখনও যখন তার সঙ্গে কথা হয়, শুধু মুগ্ধ হয়ে শুনি।

আরেকজনের কথা বলি ড. তৌকিক এ ইলাহী। আমলা হিসেবে উনি পরিচিত। অনেকে জানেন না তিনি হাবার্ড থেকে পিএইচডি করেছেন, ইকোনোমিক্সে। একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অনেক ধরনের লোকের প্রয়োজন হয়। রাজনীতিবিদরা তো থাকবেনই কিন্তু তাদের গাইড করার জন্য বিভিন্ন সেক্টরের সৎ ও সফল লোক প্রয়োজন। রাষ্ট্র একটা কালেকটিভ কনসেপ্ট। লিডারশিপের মূল কথা হলো লিডার সবাইকে কাজে লাগাবে। একা সে এগুতে পারবে না, সবাইকে নিয়ে সামনে যাবে।

 আজ সারাবেলা : একটা বিষয় নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, আওয়ামী লীগ ও এন্টি আওয়ামী লীগ এ দ্বন্দ্বটা বাংলাদেশে খুব স্পষ্ট। এ দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি কিভাবে কমানো যায়, কোন ভাবনা বা পরিকল্পনা রয়েছে কি?

মোহাম্মদ এ আরাফাত : আওয়ামী লীগ ও এন্টি আওয়ামী লীগ বলার চেয়ে আমি বলব এটা বাংলাদেশ-এন্টি বাংলাদেশ দ্বন্দ্ব। যদি পেছনে ফিরে তাকাই, সত্তরের নির্বাচনে যাই, দেখব তখনও তারাই ভোট দিয়েছিল যারা বাংলাদেশ চায়। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান, যেটা আজকের বাংলাদেশ সেখানে ভোট পড়েছিল ৭৬ শতাংশ। ১.৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল ওয়ালী মোজাফফর। যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল। সেই হিসেবে ৭৮ শতাংশ ধরা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ২২ শতাংশ ভোট তখনও আমাদের পক্ষে পড়েনি। এই ২২ শতাংশের মধ্যে ভোট ছিল কাদের? পাকিস্তান জামায়াতের।

mohammad a arafat 2

মোহাম্মদ এ আরাফাত।

আজ সারাবেলা : কিন্তু তখন আর এখনের রাজনৈতিক- সামাজিক পরিস্থিতি তো এক নয়।

মোহাম্মদ এ আরাফাত : আদর্শ তো বদলায়নি। বাংলাদেশের যখন ক্রান্তিকাল, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তখনো কিছু মানুষ বাংলাদেশের পক্ষে সিদান্ত নেয়নি। যে ২২ শতাংশ বাংলাদেশের পক্ষে ছিল না, আওয়ামী লীগের পক্ষে ছিল না, তারা এখনো আছে। জেনারেশন বাই জেনারেশন আছে। তারা পাকিস্তানপন্থি। এটা বাস্তবতা, স্বীকার করতেই হবে। ৭৫ পরবর্তী সময় এই ২২ শতাংশের অপপ্রচার, ধর্মের মিথ্যা ব্যাখ্যা, ভারত হিন্দুত্ববাদ এসব নানা অপপ্রচার মিলিয়ে মিশিয়ে আরও ১০ শতাংশ যুক্ত হয়েছে এদের সঙ্গে। এ ১০ শতাংশের আবার বাংলাদেশ বিরোধী নয়, কিন্তু আওয়ামী বিরোধী। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে ৯৬ পূর্ববর্তী পুরোটা সময় ধরে এদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে।এমনকি রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় হয়েছে এদের বিভ্রান্তিতে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ২২ শতাংশের সঙ্গে ১০ শতাংশ যোগ হয়ে, হয়েছে ৩২ শতাংশ। এরাই কিন্তু বিএনপি। এদের মধ্যে আরেকটা গ্রুপ আছে যারা ফ্লোয়েটিং, এরা এদিক যায়, ওদিক যায়।

একটা দেশে শতভাগ লোক সৎ হয় না, নিবেদিত হয় না, দেশপ্রেমিক হয় না। সুবিধাবাদী মানুষও থাকে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় তাহলে মুক্তিযুদ্ধের সরকার দেশ পরিচালনায় থাকে, সেটা আছেও। কিন্তু ওই ৩২ শতাংশের প্রতি কী আপনার দায়িত্ব নেই? আছে। প্রথমে ১০ শতাংশ নিয়ে কাজ করতে হবে যারা বিভ্রান্ত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন। পরবর্তীতে ২২ শতাংশ নিয়েও কাজ করতে হবে। এটি একটি প্রক্রিয়া, একদিনের নয়।

 আজ সারাবেলা : জামায়াত নিষিদ্ধের বিষয়ে আপনি নিজেও সক্রিয় আন্দোলন করেছেন দীর্ঘদিন। জামায়াত কিন্তু নিষিদ্ধ হয়নি এখনো…

মোহাম্মদ এ আরাফাত : জামায়াত নিষিদ্ধের আন্দোলন থেকে সরে আসেনি। কেবল নামমাত্র নিষিদ্ধের ঘোষণায় লাভ হবে না। এখন তো নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে নিষিদ্ধ আছেই। কিন্তু তাদের সংগঠন, ব্যক্তি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে, যাতে অন্য কোন ব্যানার বা সাইবোর্ডে তারা উঠে আসতে না পারে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার, আওয়ামী চেতনার রাজনীতিকেও আরো পরিশুদ্ধ হতে হবে। কেন নাসিরনগরের মত ঘটনা ঘটবে? কেন সাঁওতালরা আক্রান্ত হবে? আমাদের নিজেদের আরো বেশি পরিশুদ্ধি,আত্মশুদ্ধি প্রয়োজন। আমাদের আদর্শের পরিপন্থি, আদর্শের সঙ্গে সাংর্ঘষিক কিছু করছি কিনা সেটাও ক্ষতিয়ে দেয়া জরুরি। নিজেদের শক্তিমান করার জন্যই এটা প্রয়োজন।

আজ সারাবেলা : আপনি নিজেদের আদর্শিকতার সঙ্গে সাংর্ঘষিক বা দ্বন্দ্বের কথা বলেছেন। পাশাপাশি এটাও কি সত্য নয়, কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগ জামায়াত’কে ছাড় দিচ্ছে, সুযোগ দিচ্ছে? এমন অভিযোগও কিন্তু রয়েছে…

মোহাম্মদ এ আরাফাত : ১৬ কোটি মানুষের দেশে ২ কোটি মানুষ আওয়ামী লীগ করে। কোথাও কোথাও বিচ্যুতি ঘটে, ঘটতে পারে। যেটা হয়ত আমি আপনি কল্পনাও করতে পারি না। আমার আপত্তির জায়গা হলো, কোন বিচ্যুতির ঘটনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটলো, সেটাকে ঠিতমতো এড্রেস করছি কি না? সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি কি না? কোথাও কোথাও তো ঘটছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। এটা যদি কঠোরভাবে, প্রত্যেকের দায়িত্বশীল জায়গা থেকে রোধ না করতে পারি তাহলে নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুড়াল মারবো।

আজ সারাবেলা : প্রসাশনের কোথাও কোথাও জামায়াত-বিএনপি রয়ে গেছে এটা কি এর কারণ?

মোহাম্মদ এ আরাফাত : আমার একটাই কথা, একটাই দাবি, এধরনের ঘটনায় কেন দ্রুত অ্যাকশনে যেতে পারছি না? আমি ব্যক্তিগতভাবে এই জায়গাটিতে ক্ষুব্ধ ও হতাশ।

আজ সারাবেলা : নির্বাচন প্রসঙ্গে আসি। আগাম, মধ্যবর্ত্তী নাকি নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে?

মোহাম্মদ এ আরাফাত : নির্ধারিত।

আজ সারাবেলা : আগাম নির্বাচনের কোন সম্ভাবনা?

মোহাম্মদ এ আরাফাত : না, সেটা একেবারেই নেই।

আজ সারবেলা : খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেছেন। আপনার মূল্যায়ন কি? রাজনীতিতে এর কি প্রভাব দেখছেন?

মোহাম্মদ এ আরাফাত : এটা ইতিবাচক। পেট্রোল বোমার আন্দোলন থেকে বেরিয়ে এসে উনি যে ভদ্রলোকের মতো আলাপ-আলোচনায় যাচ্ছেন, খুবই ইতিবাচক সেটা। প্রধানমন্ত্রীর গণভবনে দাওয়াত, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের অফার এসব উপেক্ষা না করে বিএনপি যদি নির্বাচনে যেত, ভাল হতো। এতো দূরবস্থা হতো না। পেট্রোল বোমার আন্দোলন বিএনপি’কে একেবারে অজনপ্রিয় ও জনবছিন্ন করে দিয়েছে। হরতাল হলে, আন্দোলন হলে মানুষ সরকারকে গালি দেয়, কারণ সরকার সকল চাওয়া পাওয়া পূরণ করতে পারে না। কিন্তু এইবারই প্রথম দেখলাম, আন্দোলন করে বিরোধীদল অজনপ্রিয় হচ্ছে। এটা কিন্তু আওয়ামী লীগের আন্দোলনের সময়ও ঘটেনি।

 পাবলিক সেন্টিমেন্ট সবসময় আন্দোলনকারীর পক্ষে থাকে। পেট্রোল বোমায় সাধারণ মানুষ মারায় উল্টো ফল হয়েছে। তাদের বুঝতে হবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়টি নাই, তারাই এটাকে নষ্ট করেছে। ২২ জানুয়ারি ২০০৭ এ যে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল। তারাই দেখিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকলে গণতন্ত্রের কি ক্ষতি হয়, কিভাবে ওয়ান ইলেভেনের মত জিনিস আসে। আর অলরেডি কোর্টেরও রায় চলে এসেছে এর বিপক্ষে। খালেদা জিয়ার উচিত ছিল এর বিকল্প কি হতে পারে সেটা চিন্তা করা। সেই জায়গাটা চিন্তা করে তারা নিজেরা জরিপ করতে পারত, গবেষণা করতে পারত।একটা উপযুক্ত যৌক্তিক প্রস্তাবনা তৈরি করে জনগণের সামনে পারত দাঁড়াতে। কিন্তু সেটা বিএনপি করেনি। তবুও ভালো দেরিতে হলেও যদি তারা বুঝতে পেরে কাজ করে, তাহলে নিজেদের জন্যই ভালো।

আজ সারাবেলা : অনেকেই বলছেন, বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তারা রাজনৈতিকভাবে প্রায় দেউলিয়া। এখন আরেকটি জাতীয় পার্টি হতে চাইছে। আপনার কি মনে হয়?

মোহাম্মদ এ আরাফাত : বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পরেছে এটা সত্য, কিন্তু বিএনপি জাতীয় পার্টি নয়। বিএনপির নিজস্ব সমর্থক রয়েছে। এটা বাস্তবতা, আমাদের মানতে হবে। আওয়ামী লীগকেও আগামীতে জিততে হলে, ক্ষমতায় আসতে হলে এই বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করেই আসতে হবে।

আজ সারাবেলা : এখানে এখনো পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই দুটোই প্রধান রাজনৈতিক দল। কোন কারণে দুটো দলের একটি নির্বাচনে না আসলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ। যেকোনো কারণে যে কেউ না আসতেই পারে, কৌশলগত অবস্থানও হতে পারে। এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কি বলে মনে হয় আপনার?

মোহাম্মদ এ আরাফাত : এর সমাধান সুশীল সমাজের হাতে। তারা প্রায়ই তথ্য উপাত্ত ছাড়া যেকোনো মন্তব্য করেন, পরামর্শ দেন। সুশীল সমাজকে বুঝতে হবে দোষটা কার? সব দোষ সরকারকে দিলে কি করে হবে? ৫ জানুয়ারির নির্বাচন আদর্শিক হয়নি, প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। টেলিভিশনেও একথা ওপেনলি বলি। কিন্তু সেটার জন্য দায়ীতো বিএনপি, আওয়ামী লীগ নয়। আওয়ামী লীগ সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে। কিন্তু বিএনপি গো ধরে বসেই ছিল। তারা সবকিছুতেই না বলবে। ভালমন্দ বিচার না করে সবকিছুতেই না বলার নাম ‘আপোষহীন’? শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন, মনে আছে নিশ্চয়ই। একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাব দিলেন। শেখ হাসিনা বললেন, বাইরে থেকে লোক আনার দরকার নেই। আসুন, আপনি, আমি, আমরা নিজেরা বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটা কেবিনেট করি। রাজনীতিবিদরা মিলে করি। এটা একটা সম্মানজনক প্রস্তাব ছিল। বিএনপি যদি এতটুকুও বলতো যে, আপনার প্রস্তাবের অর্ধেকটা মানলাম, আমি আপনি কেবিনেটে থাকবো। কিন্তু আপনি প্রধানমন্ত্রী থাকবেন এটা মানতে পারলাম না। তারা কিন্তু এটাও বলেনি। তারা প্রক্রিয়াটাই বাদ দিল। দাওয়াত দিল, আসলো না। নির্বাচনকেও প্রতিহত করলো। এখন বলেন কিভাবে একটা আদর্শিক নির্বাচন করবেন?

আজ সারাবেলা : আপনি আওয়ামী লীগের বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গাটিতে দায়িত্ব ও সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। যৌক্তিক সমর্থন দিচ্ছেন। পাঠকের খুব কৌতুহল, আপনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হবেন কবে?

মোহাম্মদ এ আরাফাত : আমিতো রাজনীতির মধ্যেই রয়েছি। সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছি।

 

আজ সারাবেলা : পরিষ্কারভাবে বলি, ভোটের রাজনীতিতে নির্বাচনের মাঠে আপনাকে দেখবো কিনা? আরেকটু বলে রাখি, সৈয়দ আশরাফ কিন্তু তার মন্তব্যে একধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন…

মোহাম্মদ এ আরাফাত : দুটো বিষয় ঘটে। রাজনীতি যদি ক্যারিয়ার হয়, দলে যোগ দিব। সাধারণ সদস্য হব। এই কমিটিতে যাব ঐ কমিটিতে যাব। সংসদ সদস্য হব। কেন্দ্রীয় কমিটি, তারপর একদিন প্রেসিডিয়াম সদস্য হব। এটা একটা ফর্ম। আরেক ধরনের রাজনীতি আছে। আপনি কোন পদ পদবি নিলেন কি নিলেন না, আপনি আদর্শিক জায়গায় থেকে সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে পারলেন। যে সমাজের স্বপ্ন আপনি দেখেন। ক্যারিয়ার হিসেবে যে রাজনীতি সেটাই একমাত্র রাজনীতি নয়।

আজ সারাবেলা : আপনি যেটা বললেন, সেটা খুব আদর্শিক রাজনীতির সংজ্ঞা। কিন্তু যদি পাওয়ার পলিটিক্সের কথায় আসি?

মোহাম্মদ এ আরাফাত : রাজনীতি বলতে আমি আদর্শ, সততাকেই বুঝি। আমি আমার সবটুকু দিয়েই কাজ করছি যেন, জামায়াত-বিএনপি ক্ষমতায় না আসে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জয়বাংলার চেতনা যেন আরো বিস্তার লাভ করে। এটা অবশ্যই পাওয়ার পলিটিক্স। আমি হয়ত ব্যক্তি কেন্দ্রিক পাওয়ার পলিটিক্সের মধ্যে নেই। এক এমপি আরেক এমপি’কে দোষারোপ করে ফাঁসায়। মন্ত্রী হতে চায়। এতে যে নিজেদের ও শেখ হাসিনার ক্ষতি করছে তারা সেটা বোঝে না। আমার কোনো পদ-পদবির আকাক্সক্ষা নেই। আমার এমপি-মন্ত্রী হবার কোনো বাসনা নেই।

ভবিষ্যতে যদি দেশের স্বার্থে প্রয়োজন হয়, সেটা ভিন্ন হিসাব। কেউ একটা পদ নিয়ে, এমপি-মন্ত্রী হয়ে ডিফরেন্স মেক করতে পারে, না নিয়েও পারে। আমি সক্রিয় রাজনীতি করি, নিষ্ক্রিয় নই। মাঠের রাজনীতির সঙ্গেই আছি। আমরা এখনো এই রাজনৈতিক কনসেপ্টের সঙ্গে পরিচিত নই বলে হয়তো একটু খটকা লাগছে। আমার কথা হচ্ছে, আমি কাজ করছি কিনা,আমার আমাদের চেতনার, স্বপ্নের সংগ্রামের বাংলাদেশের পক্ষে। সেদিক থেকে আমি অনেক বেশি সক্রিয়।