22222222

আসুন সচেতন হই, এই আধুনিক প্রাণ হত্যা বন্ধ করি

প্রকাশিত :২১.০১.২০১৭, ৩:২৭ অপরাহ্ণ

ডা. জাকির হোসেন

একজন চিকিৎসককে সবার আগে ভাল মানুষ হওয়া জরুরি। চিকিৎসকেরা সবার আগে চিন্তা করেন রোগীর জীবন। এই পেশায় আমাদের দেশে অন্যান্য দেশ থেকে একটু বেশি প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। এর অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হলো আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিক্ষার অভাব। দেশে এমন কোন চিকিৎসক খুঁজে পাওয়া যাবে না, যাকে জীবনে কোন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়নি।
আট বছর যাবৎ চিকিৎসক হিসেবে কাজ করছি। কিন্তু প্রতিনিয়ত একটা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে যার সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি হিমশিম খেতে হয়। আমি তো রক্ত মাংসে গড়া মানুষ। চিকিৎসক প্রথমে একজন মানুষ, তারপর তিনি একজন চিকিৎসক। অন্যসব মানুষের মতই আমাদের আল্লাহ জ্ঞান দিয়েছেন, বিবেক দিয়েছেন। এই বিবেক আবার এবজন চিকিৎসককে একটু বেশিই প্রয়োগ করতে হয়। কারণ এই পেশার লোককেই জীবন নিয়ে সব সময় কাজ করতে হয়।
কিছুদিন আগে হঠাৎ করে এক পুরনো মেয়ে বন্ধুর ফোন আসে। অপরপ্রান্ত থেকে সে বলছিল, তোর কী একটু সময় হবে, তোর কাছে একটা জরুরি কাজে আসতে চাই। স্বভাবতোই আমি ধরে নিয়েছি তার কোন চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজের প্রয়োজনে আসতে চায়। আমি তাকে পরের দিন আসতে বললাম। পরের দিন সে একজন ৪৫ উর্ধ্ব বোরখা পড়া মহিলা নিয়ে হাজির হলো। সম্পর্কে আমার বন্ধুর স্বামীর বড় বোন। বলল তার পেটের অনেক সমস্যা। কিন্তু পেট পরীক্ষা করতে চাইলে সে রাজি হলো না। বলল, আমি নিয়মিত মহিলাদের জামাতে যাই, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, আমি পেট পরীক্ষা করতে দিতে পারব না। বন্ধু তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলে আমি তাকে বললাম, থাক দরকার নেই।
পরে তাকে একটা আল্ট্রাসাউন্ড হোল এবডোমেন টেস্ট দিয়ে রিপোর্টসহ দেখা করতে বললাম। সঙ্গে সাময়িক কিছু ওষুধ দিলাম। পরের দিন আমার বন্ধু সেই আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্ট নিয়ে একাই হাজির হলো। রিপোর্ট হাতে নিয়ে অবাক হলাম। উনি আট সপ্তাহের গর্ভবতী! বন্ধু চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, এই রিপোর্ট সে জানে। তখন বললাম, এখন কী করবেন উনি। বন্ধু বললো রোগীর মেয়েও গর্ভবতী। এখন এই কথা বাসার কাউকে জানায়নি। বললো রোগীর সঙ্গে কথা বলেছে। অনুরোধ করল যেভাবে পারি যেন এটা ফেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করি।
বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, দেখ বাইরে কাউকে গুলি করে মারা যে কথা আর গর্ভের ভিতরও হত্যা করা একই কথা। এই পাপের ভার আমি নিতে পারব না। তখন তার মুখ অনেকটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। পরিচিত কোন গাইনোকোলজিস্ট দিয়ে এটা করে দিতে পীড়াপীড়ি শুরু করল। আমি বন্ধুত্বের খাতিরে তার সামনে আমার পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে ফোনে কথা বললাম। কিন্তু কেউ রাজি হলো না। শেষমেশ, তাকে আমি একটি ঠিকানা দিয়ে ঢাকা মেডিকেল যাওয়ার জন্য বললাম এবং বললাম ওখানে গিয়ে আমার নাম বলা যাবে না যে আমি পাঠিয়েছি। দেখলাম তার চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ। বুঝতে পারলাম সে আমার উপর বেশ ক্ষেপে আছে। আমার ধারণা আরো সঠিক প্রমাণিত হলো যখন কিছুদিন পর তাকে ফোন দিলে সে আর ফোন রিসিভ করে না।
চিকিৎসক সমাজ বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতার কাছে কত যে অসহায় তা নিজে চিকিৎসক না হলে কখনও বুঝতে পারতাম না। আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই উন্নয়নের যুগেও অনেক মানুষ কোন চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করে না। কিংবা চিকিৎসকের ফি এর কথা চিন্তা করে অনেকে চিকিৎসকেরই দারস্থ হয় না। আবার অনেকে ধর্মের দোহাই দিয়ে এই সকল ব্যবস্থা থেকে নিজেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যাকে নিয়ে এই লিখা উনি নিজেও অত্যন্ত ধার্মিক মহিলা। সে কিন্তু একটি প্রাণ হত্যা করতে কুণ্ঠাবোধ করলেন না। অথচ অতি সহজেই এই পাপ থেকে তিনি নিজেকে বিরত রাখতে পারতেন। আমাদের দেশে ওষুধের মূল্য অত্যন্ত চড়া হলেও পরিবার পরিকল্পনার উপকরণ সামগ্রী এখনও বেশ সস্তা। আরএমআর করতে গিয়ে যে পরিমাণ দৈহিক ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয় সে দিক থেকে একজন চিকিৎসকের ফি অত্যন্ত নগন্য। আমাদের দেশে এখনও একশ টাকা ভিজিট দিয়ে একজন এমবিবিএস চিকিৎসকের নিকট পরামর্শ নেওয়া যায়। শুধু অভাব জ্ঞানের এবং সচেতনতার। অনেকে আবার এমআরকে পরিবার পরিকল্পনার প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সহজলভ্য মনে করে। ব্যাপারটি কিন্তু মোটেও তা নয়।
এমআর একটি সার্জিক্যাল পদ্ধতি যার রয়েছে নানাবিধ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এমন কী জীবনের জন্যও হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। এই পদ্ধতিটি সবচেয়ে বেশি অবলম্বন করা হয় যখন কারো গর্ভের বাচ্চা নষ্ট করতে হয়। এটি কিন্তু জীবিত প্রাণকে হত্যা করার জন্য আবিষ্কার হয়নি। আমরা অনেকে মানব অধিকার নিয়ে খুব বেশি সরব। কিন্তু নিজেদের অজান্তে কিংবা পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে আমাদের হাতে কত প্রাণ বিনষ্ট হচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। পর্যাপ্ত জ্ঞান চর্চাই পারে আমাদেরকে প্রাণের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে।

লেখক: চিকিৎসক ও কলামিস্ট