2

‘কুমিল্লা শহরকে সত্যিকারের আধুনিক শহরে পরিণত করব’

প্রকাশিত :২৬.০২.২০১৭, ৫:৫৩ অপরাহ্ণ

কুমিল্লার ইতিবাচক রাজনীতিতে নূর উর রহমান মাহমুদ তানিম এখন একটি অপরিহার্য নাম। সাবেক ভি.পি ও জি.এস, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। সাবেক সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ। আসন্ন কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তানিম নিজেকে দেখতে চান কুমিল্লার নগরপিতা হিসেবে। নূর উর রহমান মাহমুদ তানিম মুখোমুখি হয়েছিলেন ‘আজ সারাবেলা’র। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন
রবিউল ইসলাম রবি ও সামিউল তারেক।

আজ সারাবেলা : আপনি ছাত্র রাজনীতি সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত, আপনার রাজনৈতিক জীবনের যাত্রাটা যদি বলেন, ছাত্র রাজনীতির শুরু থেকে আপনি আজকে এখানে এই জায়গায় দাঁড়িয়ে। অনেক লোক আপনাকে আজ শ্রদ্ধা করে ভালবাসে, নিশ্চয়ই শুরুর যাত্রাটা এত মসৃণ ছিল না।

নূর উর রহমান মাহমুদ তানিম : ১৯৮৫-১৯৮৬ সালের দিকে যখন সারাদেশে এরশাদবিরোধী গণআন্দোলন চলছে, ছাত্র আন্দোলন তুঙ্গে, সে সময় আমি ছাত্র রাজনীতিতে প্রথম অংশগ্রহণ করি। তৎকালীন ছাত্র নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে তখন সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে মিছিল, সমাবেশ করি। পুলিশ এবং বিডিআরের ধাওয়া খেয়ে ধরা পড়তে পড়তে কোনভাবে বেঁচে যাই। এবং এইভাবেই দেখা গেল, মিছিল মিটিংয়ে একটা নেশা হয়ে যায়। স্বৈরাচারবিরোধী স্লোগান দেওয়া, পুলিশের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ করে পালিয়ে যাওয়া, এতে করে সাহস এবং আন্দোলন প্রতি একাগ্রতা আরো বেড়ে যায়। এরই মাঝে একদিন গ্রেফতার হই আমি। স্পষ্ট মনে আছে, হিন্দু মুসলিম একটি সাজানো দাঙ্গা যখন দেশে ক্রমে ক্রমে তৈরি হচ্ছিল সেটির বিরুদ্ধে আমরা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীরা সবাই এক সঙ্গে একটা সমাবেশ করে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার পর্যায়ে পুলিশ এসে ঘেরাও করে এবং আমাদেরকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। পরে পনের দিন জেল খেটে বের হই। এটা আমার জীবনের প্রথম কারাবরণ।

পরবর্তীতে আরো পাঁচবার কারাবরণ করেছি, আন্দোলনে ও মিথ্যা মামলায়। প্রত্যেকটি ঘটনাই রাজনৈতিক এবং আমাকে মনে হয় নেতৃত্বের জায়গাটাতে একটু একটু করে এগিয়ে দিচ্ছিল। এর মধ্যে আমি ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র সংসদের সম্পাদক হই। আপ্যায়ন আমোত প্রমোদ, দ্বিতীয়বার আপ্যায়ন আমোদ প্রমোদ সম্পাদক হই, তৃতীয়বার ভিক্টোরিয়া কলেজের জিএস হই, যখন সারাদেশে বিএনপি মাত্র ক্ষমতায় আসল। আমার স্পষ্ট মনে আছে, সারাদেশে তখন মাত্র দুটি কলেজ, ভিক্টোরিয়া কলেজ একটি এবং সম্ভববত ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজ অন্যটি। দুটি কলেজেই ছাত্রলীগের প্যানেল বিজয়ী হয়েছিল। ছাত্র সংসদের দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে বিএনপি সন্ত্রাসীদের মুখোমুখি হই এবং দীর্ঘ আট মাস সারা শহরে ছাত্র দলের সঙ্গে আমরা বিক্ষিপ্ত সংর্ঘষে জড়িয়ে যাই। সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে ছাত্রদলের সে সময়ের সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করতে সক্ষম হই। ছাত্র সংসদে আমরা শপথ নেই এবং ছাত্র সংসদের কর্মকা- পরিচালনা করি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে খালেদাবিরোধী যে আন্দোলন তখন জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে হচ্ছিল, ঠিক সে সময় আমি আরো দুইবার গ্রেফতার হই। আশ্চর্যজনক হলো ১৯৯৫ সালে একটি মামলায় যথারীতি এক দেড় মাস জেল খেটে বের হই। প্রত্যেকটি ঘটনায় আমাকে কেন্দ্র করে যেভাবে মামলাগুলো সাজানো হচ্ছিল এতে করে মনে হচ্ছি ছাত্র রাজনীতিতে আমার অবস্থান আরো পাকাপোক্ত হচ্ছিল।

আওয়ামী লীগ এর মধ্যে আন্দোলন করে নির্বাচনে যায়, নির্বাচনে করে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে। ১৯৯৭ সালে ভিক্টোরিয়া কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভিপি পদে নির্বাচিত হয়ে নতুনভাবে আমার ছাত্র রাজনীতির ক্যারিয়ার ডেভেলপ করতে শুরু করি।
এর মধ্যে একটু বলে নেওয়া ভাল, রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার আগে আমি বিএনসিসি করেছি। স্কুল জীবনে স্কাউট করেছি। কলেজে রোবার স্কাউট করেছি। বিএনসিসির বেস্ট ক্যাডেট হয়েছিলাম, ময়নামতি রেজিম্যান্টে। ভিক্টোরিয়া কলেজে অনার্স পড়াকালীন সময়ে যখন ছাত্র সংসদের জিএস তখন টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় আমার কলেজের পক্ষে অংশগ্রহণ করে চ্যাম্পিয়ন হই। ১৯৯৮-১৯৯৯ সালে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা জড়িয়ে যায়। এরই মধ্যে জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসে। আমাদের উপর নির্যাতনের মাত্রা ও মামলা বেড়ে যায়। ২০০৩ সালে গ্রেফতার হয়ে তিন মাস কারাবরণ করি। ২০০৫ সালে র‌্যাব কর্তৃক গ্রেফতার হই, আমাকে ক্রসফায়ায়ের চেষ্টা করা হয়। আমার নেতাকর্মী ও সাধারণ জন মানুষের আন্দোলনের মুখে র‌্যাব আমাকে ক্রয়ফায়ার দেয়া থেকে সরে এসে একটি মিথ্যা অস্ত্র মামলা দেয়। আবার সাড়ে তিন মাস জেল খেটে বের হয়ে আছি।

1

আজ সারাবেলা : এ মামলাগুলো মূলত কাদের দেওয়া?

নূর উর রহমান মাহমুদ তানিম : প্রায় সব মামলা জামায়াত-বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া। আর কিছু আছে আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের।

আজ সারাবেলা : আপনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কারা?

নূর উর রহমান মাহমুদ তানিম : আমি ছাত্র জীবন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আমার অবস্থান বরাবরই সূদৃঢ়। জামায়াত- বিএনপি আমার প্রতিপক্ষ। যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সঙ্গে বেইমানি করে, লুটপাটের রাজনীতি করে, যারা রাজনীতিকে ব্যক্তি স্বার্থে, ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করে তারাও আমার প্রতিপক্ষ। ওয়ান ইলেভেনের সময়ও আমি বিরাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করি।

২০০৮ এ আমরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাই। কুমিল্লা জেলা ও মহানগর কমিটি কোনটিই নতুনভাবে হয়নি। মহানগর কমিটি নতুনভাবে হলে হয়তো আমার সেখানে কোন একটা জায়গা হবে। কিন্তু সেটাও কবে হবে তারও ঠিক নেই। তাই এক যুগ নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে আমি আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছি।

আজ সারাবেলা : আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আপনি একজন মেয়র হতে চান। আরো অনেক মেয়র প্রার্থী রয়েছেন। আপনাকে লোকে ‘কোন বিশেষ’ কারণে নির্বাচিত করবেন বলে মনে করেন?

নূর উর রহমান মাহমুদ তানিম : কুমিল্লা একটি প্রাচীন শহর। শিল্প-সাহিত্য সাংস্কৃতির শহর কিন্তু সঠিক নেতৃত্বের অভাবে এ শহর তার ঐতিহ্য হারিয়েছে। গত দীর্ঘ ১২ বছর একজন অর্ধশিক্ষিত লোক মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় হারিয়ে যেতে বসেছে এ শহর। আমার এ শহরে জন্ম, বেডে ওঠা, আমার পরিবার, আমার ছাত্র রাজনীতি-সবই এ শহরের লোক জানে। আমার সততা, নিষ্ঠা সম্পর্কে লোকে ওয়াকিবহাল। নেতৃত্বের জায়গাটিতে আমার মেধা ও যোগ্যতা সম্পর্কে লোকের ধারণা রয়েছে। যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে যখন এ শহরটি তার ঐহিত্য হারাতে বসেছে, তখন আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শ্রম, মেধা বিবেচনা করে এ শহরের মানুষ আমাকে তাদের সেবা করা সুযোগ প্রদান করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এবং আমি দায়িত্ব পালনে বরাবরই বদ্ধপরিকর। আজকের আপনি কুমিল্লা শহরের যে কোন মানুষের কাছে জানতে চান ‘তানিম কেমন’, আশা করি আমার কথার সঙ্গে তাদের কথার ৯৫ % মিল পাবেন।

আজ সারাবেলা : যে কোন চিকিৎসার আগে রোগ নির্ণয় জরুরি। আপনি কুমিল্লা শহরের সমস্যাগুলো চিহিৃত করতে পেরেছেন কি না?

নূর উর রহমান মাহমুদ তানিম : অবশ্যই। কুমিল্লার ভূ-প্রকৃতি একটু ভিন্ন। পৃথিবীর যে কোন বড় শহর গড়ে ওঠেছে নদীর পাড়ে। আমাদের বেলা হয়েছে উল্টো। নদীপথ আমাদের ব্যবসা বাণিজ্যে কখনো ব্যবহার হয়নি। নদীপথ এখানে সমতলের চেয়ে উঁচু, ফলে জলাবদ্ধতার একটি আতঙ্ক থেকেই যায়। অন্যান্য শহরের জমানো জল নদীতে গিয়ে মিশে কিন্তু আমাদের হয়েছে উল্টো। নদীর পানি শহরে এসে ঢুকে। অব্যবস্থাপনা ও অজ্ঞতার কারণে সংশ্লিষ্ট মানুষগুলো এ সমস্যা বুঝতে অসমর্থ্য। জলজট কমানোর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি রয়েছে। কিন্তু তারা সে পথে না গিয়ে লোক দেখানো কাজ নিয়ে ব্যস্ত। এতে কোটি কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে। ফলে এতে সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত যানজট। রাস্তা কম গাড়ির সংখ্যা বেশি। প্রয়োজনের চেয়ে গাড়ির সংখ্যা বেশি হওয়ায় স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

তৃতীয় সমস্যা মাদক। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে শহরের এখানে সেখানে মাদকের বিস্তার মহামারির আকার ধারণ করেছে। কুমিল্লার তরুণ সমাজের বড় একটি অংশ মাদকে নিমজ্জিত।

চতুর্থ সমস্যা অপরিকল্পিত নগরায়ন। বিভিন্ন সময় মেয়ররা স্বজন প্রীতি ও দুর্নীতির কারণে অপরিকল্পিত, নিয়মবর্হিভূত ভবনকে অনুমোদন দিয়েছে। যেখানে পাঁচতলা হওয়ার কথা নয় সেখানে দশ তলা হচ্ছে। যত্রতত্র মার্কেট হচ্ছে। কোনো সুনির্দিষ্ট জোনিং, প্লানিং নেই। পৌরপার্ক যেটা বিনোদন কেন্দ্র, সেখানে ক্ষমতা ত্যাগের মাত্র তিন দিন আগে পঁচিশটি দোকান অবৈধভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চিড়িয়াখানায় কোন পশু নেই, সিমেন্ট দিয়ে বাঘ, ভাল্লুক বানিয়ে রাখা হয়েছে। পার্কে গাছ না লাগিয়ে প্লাস্টিকের ফুল গাছ সাজিযে রাখা হয়েছে। এমন হাস্যকর চেষ্টা কুমিল্লাবাসী আগে কখনো দেখেনি।

পঞ্চম সমস্যা সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব। দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার অভাব।

 

আমি মনে করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা যদি আমাকে দলীয় মনোনয়ন দেন তাহলে আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ, সততা ও আন্তরিকতার ধরাবাহিকতায় আমি কুমিল্লাবাসীর পাশে থাকব। কুমিল্লা শহরকে সত্যিকারের আধুনিক শহরে পরিণত করব।