কিংবদন্তী কুনিও হোশি

কৃষিতেই স্বপ্ন ছিল জাপানি নায়কের

প্রকাশিত :২৮.০২.২০১৭, ৭:৫৭ অপরাহ্ণ

রাজা আবুল কালাম আজাদ:

এ এক কিংবদন্তীর কাহিনী। জাপান থেকে বাংলা মুল্লুকে উড়ে আসা এক সাহসী স্বপ্নপুরুষের গল্প । গল্প? কী বলছি এসব? এটা গল্প নয়- সত্য ঘটনা। বাংলাদেশের মানুষের মনে দীর্ঘস্ভায়ীভাবে গেথে যাওয়া এক রীতিমত সত্য ঘটনা।বলছিলাম, অসামান্ন কর্মঠ, সাফল্যের স্বপ্নবিলাসী কৃষি গবেষক, জাপানি নায়ক কুনিও হোশির কথা।

কীটনাশক ছাড়াই উচ্চফলনশীল ফসল উৎপাদনে গবেষনার নেশা ছিলো তার। জাপানে কৃষি গবেষণা ব্যয়সাধ্য। তাই বাংলাদেশে আসা।

কে এম জাকারিয়া বালা নামের এক বাংলাদেশীর সাথে বন্ধুত্বের সূত্রে রংপুরে এসেছিলেন তিনি। এদেশের শীর্ণকায় গরুর  রুগ্ন  স্বাস্থ্য দেখে ভড়কে যান তিনি।কীভাবে রোগা পটকা গরুগুলোকে মোটা তাজা স্বাস্থ্যবান করা যায়, সে চিন্তা পেয়ে বসে তাকে। মন দেন পশুখাদ্য উৎপাদনে। সেই চিন্তা থেকে চলে আসে ভালো মানের ঘাস উৎপাদন। তারপর মনোযোগ দেন বিনা কিটনাশকে উচ্চফলনক্ষমতা সম্পন্ন শস্য উৎপাদনের।ভালোই চলছিল তাঁর গবেষনা। হঠাতই একদিন কালোছায়া নেমে আসে তাঁর জীবনে। কালোমেঘে ঢেকে যায় তাঁর কৃষিগবেষনার ভাগ্য।বাঙালির কপালে লেগে যায় আরেকটি কলঙ্করেখা। এদেশের কৃষিমজুরের ভাগ্য থেকে মুছে যায় এক অপার সম্ভাবনার পথরেখা।  ২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর একদল পথভ্রস্ট বাঙালি জঙ্গির প্রক্ষিপ্ত গুলিতে প্রাণ হারান এই প্রদীপহস্ত কালপুরুষ।

কুনিওর বন্ধু এই জাকারিয়া বালা এক সময় জাপানে থাকতেন। পরে জাকারিয়ার জাপান প্রবাসী ভাইয়ের সঙ্গে কুনিওর পরিচয় হয়।তার সাথে যোগােযোগের সুত্র ধরেই কুনির রংপুর যাত্রা।

জাকারিয়া স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমার দুই ভাই জাপানে যাওয়ার পর আমি ফিরে আসি। আমার ভাইয়েরা ২০ বছর ধরে টোকিওর তেচিগিতে হোটেল ব্যবসা করেন। ছোট ভাই জামিল শিপন একদিন ফোন করে আমাকে কুনিওর কথা । তিনি রংপুর আসতে চান।আমার কাছে খুশির খবরই ছিল সেটা। বহুদিন পরে তাঁকে দেখবো। বাংলাদেশ দেখাতে পারবো।”

২০১১ সালে প্রথম রংপুরে আসেন কুনিও। কিছুদিন থেকে চলে যেতেন। কয়েক মাস পরে আবার আসতেন। ২০১৫ সালের ১৪ মে ছিল তাঁর শেষ আগমণ।

কুনিও অল্প অল্প বাংলা ভাষা শিখেছিলেন জাপানে থাকতেই।তারপর, বাংলাদেশে এসেেসেতো মিশেই গিয়েছিলেন এদেশের ভাষা সংস্কৃতির সঙ্গে। রীতিমত বাঙলায় কথা লেতেন কৃষকদের সাথে। ধর্মও পরিবর্তন করে মুসলিম হয়েছিলেন। এদেশবাসীর সাথে সামন্জস্য রেখে নাম ধারণ করেছিলেন গোলাম মোহাম্মাদ কিবরিয়া।

বলতে গেলে বেশ সাদামাটা জীবন যাপন করতেন কুনিও| সব সময় টি-শার্ট ও প্যান্ট পরতেন | শাক-সবজি ছিল তার প্রিয় খাবার।

উত্তর-পূর্ব জাপানের ইওয়াতে জেলার অধিবাসী কুনিও। সেখানে লেখাপড়া শেষে চলে আসেন তেচিগি। সেটাই ছিল তার জাপানি নিবাস। কুনিও বিয়ে করেননি।

জাকারিয়া জানান, তার শ্যালক হুমায়ুন কবীর হীরা ও কুনিও যৌথভাবে দুই একর আট শতক জমি লিজ নেন কাউনিয়া উপজেলার সারাই ইউনিয়নের আলুটারি গ্রামে। ওই গ্রামের শাহ আলমের কাছ থেকে এক বছরের জন্য তারা ৮২ হাজার টাকায় জমিটি লিজ নেন।

হীরা বলেন, “যে জাতের ঘাসটি আমরা প্রথম উৎপাদন করি, জাপানি ভাষায় তার নাম ‘কয়েল’ বলে জানিয়েছিলেন কুনিও।
“কুনিও বলেছিলেন, এই ঘাস একই জমিতে বছরে তিন-চারবার আবাদ করা যায়। প্রতি তিন মাস পর কেটে নতুন করে লাগাতে হয়। এটা দেখতে আখের মতো। তবে রস আখের চেয়ে কম মিষ্টি। এর রস দিয়ে গুড় তৈরি করার কথা ছিল। ওই গুড় মৌচাষে মৌমাছির খাবার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আর রস বের করার পর গাছ হবে গরুর খাবার। এটা খেয়ে গরু মোটা-তাজা হয় বলে কুনিও বলেছিলেন।”
আজিজ মিয়া নামে স্থানীয় এক কৃষক বলেন, “কুনিও একদিন বলছিলেন, জাপানে এ ঘাসটি ৫-৬ ফুট লম্বা হয়, রংপুরে ১০-১২ ফুট হওয়ায় তিনি খুব খুশি ছিলেন।”

কুনিও খামারে এসে ঘাস কতটা লম্বা হয়েছে তা মাপতেন বলে জানান আজিজ মিয়া।

কুনিও কখনও কখনও নিজেই নিড়ানি দিতেন বলেও তিনি জানান।

কুনিওর মৃত্যুর ciদিন রাতেই হীরাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে কয়েক দফায় ২৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। শেষ পর্যন্ত এ হত্যাকাণ্ডে জেএমবির সম্পৃক্ততা পাওয়ায় হীরাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
কুনিও রংপুর নগরীর মুন্সিপাড়া জাকারিয়ার বাড়িতে থাকতেন। তাকে আপন করে নিয়েছিল মুন্সিপাড়ার মানুষ।
ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর স্থানীয় কেরামতিয়া জামে মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে যেতেন। সবাইকে সালাম দিতেন। কেউ সালাম দিলে তা গ্রহণ করতেন।
একই এলাকার মুদি দোকানি হযরত আলী বলেন, “প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমার দোকানে আসতেন। আমাকে সালাম দিতেন। আমার ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করার পরামর্শ দিতেন। প্রতিদিন দুই হালি কলা কিনতেন। সেই মানুষটির হত্যা খবর পেয়ে ভীষণ কষ্ট পেয়েছি।”

রংপুরের কেরামতিয়া জামে মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাজে কুনিও

রংপুরের কেরামতিয়া জামে মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাজে কুনিও

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সারাই ইউনিয়নের আলুটারি গ্রামে ২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর গুলি করে হত্যা করা হয় ৬৬ বছর বয়সি জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে।

মৃত্যুর পর ঢাকার জাপানি দূতাবাসের অনুরোধে ১২ অক্টোবর গভীর রাতে মুন্সিপাড়া কবরস্থানেই কুনিওকে দাফন করে স্থানীয় প্রশাসন।

কুনিও হত্যামামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রথীশচন্দ্র ভৌমিক বাবুসোনা জানান, কুনিওর মৃত্যুর পর পুলিশ তার মানিব্যাগ থেকে পাসপোর্ট উদ্ধার করে। পাসপোর্ট থেকে জানা যায়, তার জন্ম ১৯৪৯ সালের ৩১ মে। সেই হিসেবে তার বয়স ৬৬ বছর।

মঙ্গলবার রংপুরের বিশেষ জজ নরেশচন্দ্র সরকারএই ভয়ঙ্কর হৃদয়গ্রাহী হত্যামামলার   রায় ঘোষণা করেন। নিষিদ্ধ জঙ্গি দল জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) পাঁচ জঙ্গির ফাঁসির ঘোষনা এসেছে। শুনে খুব ভালো লাগলো। এদেশবাসীর হৃদয়ের সাথে একাত্ম হয়ে কুনিওর বিদেহী আত্মাও হয়ত খুশি হয়েছে রায় শুনে।
কিন্তু, কুনিওর লাগানো ঘাসগুলো, আর সেগুলোর সম্ভাব্য খাদক রংপুরের শীর্ণকায় গরুগুলো হয়ত আজো একবার ডুকরে কেঁদেছে। কুনিওর হাতের আদর কেড়ে নেওয়ার অভিযোগে ওদের করা নালিশের রায় খোদা তা’য়ালার মারফত হয়ে রংপুরের আদালত ঘোষনা করেছে।
দু’চোখে কয়েকফোটা জল টলমল করলেও বাঙালিরা আজ খুশি।