ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

প্রকাশিত :০১.০৩.২০১৭, ৪:৩৩ অপরাহ্ণ

মাহমুদুল হাসান তুষার

এদেশের ছাত্ররাজনীতির স্বরুপ বুঝতে হলে ছাত্ররাজনীতির অভ্যূদয়, বিকাশ ও ঐতিহাসিক পরিক্রমায় এর নানান ঘাত-প্রতিঘাত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এদেশে আধুনিক রাজনীতির সূচনা থেকেই বার বার পরিবর্তিত রাজনৈতিক-সামাজিক কাঠামোর মধ্য দিয়েই ছাত্ররাজনীতি বিকশিত হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোতে ছাত্রনেতা কর্মীদের ভূমিকা ও কর্তব্য ছিল ভিন্ন রকম। ঐতিহাসিক পটভূমি থেকে ছাত্ররাজনীতির পরিকাঠামো আলোচনা করতে গেলে সমান্তরালভাবে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে ছাত্ররাজনীতির সূচনা হয়েছে, অবিভক্ত বাংলা তথা ভারতের কতিপয় ছাত্রসংগঠনের হাত ধরে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্রিটিশ ভারতে দেশীয়দের রাজনীতিতে সক্রীয় হওয়ার সঙ্গে এদেশের ছাত্রসংগঠনগুলোও রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এসময় কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত ‘নিখিলবঙ্গ মুসলীম ছাত্রলীগ’, ছাত্র-তরুণ নির্ভর ‘অনুশীলন সমিতি’, ও কলকাতার বিভিন্ন কলেজভিত্তিক ছাত্রসংগঠন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পরে। ১৯৩৬ সালে ‘নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশন’ ও পরের বছর ‘নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন’ প্রতিষ্ঠিত হলেও পূর্ববাংলায় এগুলোর রাজনীতি ছিল না বললেই চলে। এ অঞ্চলে ছাত্র-তরুণের রাজনীতি শুরু হয় ‘অনুশীলন সমিতির’ হাত ধরে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে। ব্যাপকতর অর্থে ও সার্বজনীন ছাত্ররাজনীতি শুরু হয় বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ছাত্ররাজনৈতিক সময়কাল থেকে। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালীন শেখ মুজিব ‘নিখিলবঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগে’ জড়িয়ে পড়ার অল্পদিনের মধ্যে তিনি এ সংগঠনটির নেতৃত্ব নিয়েছিলেন। ১৯৪৪ সালে তিনি ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর পূর্ববাংলায় ছাত্ররাজনীতিকে সংগঠিত করতে তিনি মাঠে নেমে পড়েছিলেন। মূলত তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ও প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় ফরিদপুর ও ঢাকা জেলায় নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের রাজনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। এসময় পূর্ব বাংলার ছাত্ররাজনীতি ব্রিটিশ আমলের যেকোন সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।
ছাত্ররাজনীতির নতুন যুগে পদার্পণ ঘটে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ বিতারণের পর। বাংলা বিভক্ত হওয়ার পর মুসলীম ছাত্রলীগও বিভক্ত হয়। পূর্ববাংলার শাখাটি নাম ধারণ করে ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’। ছাত্রসংগঠনটি আবার নবগঠিত ‘নিখিল পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের’ শাখায় পরিণত হয় এবং বরাবরের মত সংগঠনটি মুসলিম লীগের অঙ্গসংগঠনের মত কাজ করতে থাকে। দেশভাগের পর বাংলার মুসলিম লীগ নেতৃত্ব সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকে খাজা নাজিমুদ্দীনের হস্তগত হয়। ফলে ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগে’ নাজিমুদ্দীনের মনোনীত লোকগুলোর প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকে। কলকাতা থেকে আগত ছাত্রকর্মীদের এ সংগঠনে কোণঠাসা করে রাখা হয়। কিছুদিনের মধ্যেই মুসলিম লীগে ও এর ছাত্রসংগঠনে নতুন সদস্য ভর্তি করা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে, কলকাতা থেকে আগত রাজনীতি করতে ইচ্ছুক ছাত্রনেতাকর্মীরা বিপাকে পরে যায়।

উক্ত অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য এগিয়ে আসেন বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে গঠন করা হয় আপামর বাঙ্গালি ছাত্রতরুণের প্রাণের সংগঠন  ছাত্রলীগ (বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ)। পাকিস্তানী শোষন থেকে বাঙালি জাতির মুক্তির লক্ষে এক সুগভীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা থেকে বঙ্গবন্ধু এ ছাত্রসংগঠন গড়ে তোলেন। এবং জাতির প্রয়োজনে লড়াই, সংগ্রামের সেনানায়ক হিসেবে এ ছাত্রলীগকে তৈরী করেন। পরবর্তীতে ছাত্রলীগের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাসই স্বাধীণ স্বার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসে  পরিণত হয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সদস্য ও বামপন্থী ছাত্রনেতাদের প্রচেষ্টায় ১৯৫২ সালের ২৬ এপ্রিল পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের জন্ম হয়। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ বিভক্ত হয়ে ন্যাপ প্রতিষ্ঠিত হলে, ছাত্র ইউনিয়ন তার অঙ্গসংগঠনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৬ দফা ঘোষণা করলে ছাত্রলীগ তার সঙ্গে অতিরিক্ত ১১টি দফা যোগ করে আন্দোলন শুরু করে। এ আন্দোলন ছাত্র সমাজে ছাত্রলীগের অবস্থান অধিকতর জোরদার করে।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থান ছিল পাকিস্তান আমলের সবচেয়ে সফলতম আন্দোলন। এর ফলে প্রতাপশালী সামরিক শাসক আইয়ুব খান ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানের/ দেশের আপামর জনসাধারণের এ আন্দোলনের পুরোভাগে ছিল ছাত্রসংগঠনগুলো। পূর্ব পাকিস্তানে এ আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকা ছিল মূলত ছাত্রলীগ । যার দাগ আজো আছে ছাত্রলীগকর্মী শহীদ আসাদের রক্তরঞ্জিত শার্টে, সংগ্রামী চেতনায় উদ্ভাসিত লাখো জনতার হৃদয়ে।
১৯৭১ সালে, বাঙ্গালি জাতির সর্বাপেক্ষা সফলতম ও শক্তিশালী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগকর্মীদের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। মেহেরপুরের মুজিবনগরে সরকার গঠিত হলে, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাশাপাশি প্রাথমিকভাবেই বেশকিছু ছাত্রতরুণ এতে যোগ দেয়। পরে পুরোদমে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ভারতমূখী যেসব তরুণের দল ট্রেনিং নিতে গিয়েছিল, তার সিংহভাগ ছিল ছাত্রলীগ । আগস্টের গঠিত গেরিলা বাহিনীর অগ্রসৈনিক ছিল ছাত্রতরুণরা আর ফজলুল হক মণির ‘মুজিব বাহিনী’।মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগেরই ১৭ হাজার নেতাকর্মী শহীদ হোন।

বিএনপির ছাত্রসংগঠন হিসেবে ছাত্রদল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ জানুয়ারিতে। সামরিক পন্থায় ক্ষমতা দখলকারী জিয়ার শাসনামলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সংগঠনটি সারাদেশব্যাপী ব্যাপকতরভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। ছাত্রইউনিয়নের বহুকর্মীসমর্থকসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বামপন্থী ছাত্রকর্মী এই সরকারি সংগঠনে যোগ দেয়। পরবর্তীতে বিবাহিত ও অছাত্রদের দ্বারা পরিচালিত হওয়া এবং সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করতে ব্যর্থ হয়।

আশির দশকে ছাত্র ইউনিয়ন বেশ কয়েকবার ভাঙনের মুখে পরে। ১৯৮০ সালে এ সংগঠন থেকে কিছু নেতা কর্মী বেড়িয়ে গিয়ে ‘বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী’ ও ‘বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী’ নামে দুটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন’। এভাবে বাংলাদেশে বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির ঝান্ডা কয়েকটি সংগঠনের অধিকারে চলে যায়।

১৯৯০ সাল বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্ববহ বছর। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত গুরুত্বপূর্ণ সকল ছাত্রসংগঠন এক্যবদ্ধ হয়। স্বৈরাচারী সেনাশাসকের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রদল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে। ছিনিয়ে আনে অভীষ্ট বিজয়-গণতন্ত্র।

১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় গেলে এদেশের আপামর ছাত্রজনতা আন্দোলনে ফেটে পরে। ছাত্রলীগের অগ্রঅভিযানে এদেশের অধিকাংশ গণতন্ত্রপন্থী ছাত্রসংগঠন সামিল হয়। অবশেষে, ক্ষমতা গ্রহণের ১২ দিনের মাথায় বিএনপিকে পদত্যাগে বাধ্য করে। পরবর্তীতে জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীগ বিজয়ী হলে ছাত্রলীগ পূর্ণবিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়।

২০১৩ সালের শেষের দিকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের সঙ্গে বিএনপি জোটের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। সরকার ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারিতে নির্বাচন ঘোষণা করে। বিএনপি নির্বাচন বানচালের প্রত্যয় ব্যক্ত করে। এসময় ছাত্রলীগ ছাত্রদলসহ দেশের ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করতে থাকে। ছাত্র সংগঠনগুলোর অনেক নেতাকর্মী দল পরিবর্তন করে বা নিষ্ক্রীয় হয়ে যায়। ছাত্রদল ও শিবির বিএনপি জোটের পক্ষে নির্বাচন প্রতিহতের আন্দোলনে সম্মুখ সারিতে অবস্থান নেয়। বিএনপির ডাকা অনির্দিষ্টকালীন হরতাল, পেট্রোল বোমা, ককটেলবাজী ও আগুন সন্ত্রাসে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পরে। মাসাধিক কালব্যাপী এ দুঃসময়ে ছাত্রলীগ জনগণের পাহাড়াদারের দায়িত্ব পালন করে। অতিষ্ঠ জনগণ সরকারের পাশে দাঁড়ালে দেশের পরিস্থিতি কিছুদিনের মধ্যেই শান্ত হয়ে যায়। ছাত্রলীগসহ প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ছাত্রসমাজের কাছে মৌলবাদ ও চরমপন্থার  রাজনীতি প্রত্যাক্ষ্যাত হয় ।

সম্মুখে এগিয়ে চলে প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতি।ঐতিহাসিক পরিক্রমায়, বর্তমানের বাংলাদেশ ভূখন্ডে ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস বলতেই প্রতিফলিত হয় ছাত্রলীগের ইতিহাস। বাঙালি জাতির ভাগ্যের আকাশে যখনি কালো মেঘের ঘণঘটা দেখা দিয়েছে, তখনি এগিয়ে এসেছে ছাত্রলীগ। ৫২র ভাষা আন্দোলন, ৫৪এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ এর ছয় দফা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ২০০৭ এর গণতন্ত্রের মুক্তি আন্দোলনসহ বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সকল আন্দোলনই পরিচালিত হয়েছে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে। যতদিন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অটুট থাকবে, ভূলপথে পরিচালিত হবে না ছাত্রলীগ এবং ততদিন নিরাপদ থাকবে বাংলাদেশ।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, স্যার এফ রহমান হল ইউনিট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।