বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর, ভুলে যাওয়ার নয়

প্রকাশিত :০৭.০৩.২০১৭, ২:৩১ অপরাহ্ণ

আমানুল্লাহ নোমান

বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর একটি আদর্শ, একটি ইতিহাস। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ক্ষণজন্মা এই মুক্তিসেনানী বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় ১৯৪৮ সালের ৭ মার্চ জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আবদুল মোতালেব হাওলাদার। মাতার নাম সাফিয়া খাতুন। তিনি ১৯৬৪ সালে মুলাদীর মাহমুদজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন এবং ১৯৬৬ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে আই.এস.সি পাস করেন। এর পরে উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি ১৯৬৬ সালের ৩০ আগষ্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হন। তার রোল নম্বর ছিল এসএম ১৯৬ ভর্তি পরীক্ষার রোল নং ছিল ০৯। তিনি ১৯৬৭ সালে ১৫তম শর্ট সার্ভিস কোর্সের জন্য প্রশিক্ষণার্থী ক্যাডেট হিসেবে উত্তীর্ণ হন। সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য ১৯৬৭ সালের ৩ অক্টোবর ঢাকা ত্যাগ করে পাকিস্তান একাডেমী (পিএমএ) তে যোগদান করেন, তার জেন্টেলম্যান ক্যাডেট নম্বর ছিল ৭৪৬০। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি গজনভি কোম্পানীর ৬ নম্বর প্লাটুনে অন্তর্ভূক্ত হন।

মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ১৯৬৮ সালের ২ জুন কমিশন প্রাপ্ত হন। একই বছরের ৩ ডিসেম্বর সেকেন্ড লেফটেনেন্ট পদে পদন্নতি পান। ১৯৭০ সালের ৩০ আগষ্ট ক্যাপ্টেন পদে পদোন্নতি পান।
১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তিনি পাকিস্তানে ১৭৩ নম্বরর ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটেলিয়ানে কর্তব্যরত ছিলেন। মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য তিনি ছুটে এসেছিলেন পাকিস্তানের দুর্গম এলাকা অতিক্রম করে, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে। ৩ জুলাই পাকিস্তানে আটকে পড়া আরো তিনজন অফিসারসহ তিনি পালিয়ে যান ও পরে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার মেহেদীপুরে মুক্তিবাহিনীর ৭নং সেক্টরে সাব সেক্টর কমান্ডার হিসাবে যোগ দেন। বিভিন্ন রণাঙ্গনে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখানোর কারণে তাকে রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ দখলের দ্বায়িত্ব দেয়া হয়।

রণাঙ্গনে অকুতভয় যুদ্ধের কারনে সাথীরা তাকে টাইগার বলে সম্বোধন করতো। তিনি রণাঙ্গনে টাইগার হলেও ব্যক্তি জীবনে ছিলেন খুব সাদাসিধে। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের দায়িত্ব পড়লো ৭নং সেক্টরের মোহিদপুরের সাব সেক্টরে। চাপাই নবাবগঞ্জ পূর্ণ স্বাধীন করা মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর তার সাথীদের নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ দখল করতে এগিয়ে যান সামনের সামনের দিকে। তখন ১৪ই ডিসেম্বর সকাল ১০টা যুদ্ধ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মুক্তিবাহিনী চাঁপাইনবাবগঞ্জ দখলের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর তার সৈনিকদের সাহস যোগাচ্ছেন। তাদের নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার বহুদিনের স্বপ্ন ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ স্বাধীন করা। সামনের একটি বাড়ির দোতলা থেকে মেশিনগানের গুলি আসছিল অনবরত। গুলির ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। মেশিনগান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বর্তমান অবস্থা দেখা যাচ্ছিল বলে মনে হচ্ছিল। ফলে সামনে অগ্রসমান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিহত করতে পারছিল শত্রু পক্ষ। মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছিল। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর বুঝলেন এই মেশিনগান ধ্বংস না করতে পারলে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না এবং তার সৈন্য বাহিনীর প্রচুর ক্ষয় ক্ষতি হবে।

ইতোমধ্যে প্রফেসর শাহজাহান যিনি পরিকল্পনা অনুযায়ী জাহাঙ্গীরের বামদিকে নদীর পাশ দিয়ে তার প্লাটুন নিয়ে অগ্রসর হতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। তখন তার সহযোদ্ধারা তাকে চিকিৎসার জন্য পিছিয়ে নিয়ে যান। তখন জাহাঙ্গীরের মনে হলো হয়তো চাঁপাইনবাবগঞ্জ দখল অনিশ্চিত হয়ে যেতে পরে। এসব কথা ভেবে সহযোদ্ধা অন্য কাউকে আদেশ না করে নিজে মেশিনগানটি ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেন। ধীর স্থিরভাবে বাম হাতে এস এম জি ও ডান হাতে একট গ্রেনেড নিয়ে ক্রলিং করে দ্রুত রাস্তা পার হলেন। মেশিনগান যে বাড়িতে ছিল সে বাড়ির কাছে মুহুর্তেই চলে যান। উপরের দিকে মেশিনগান পজিশনের দিকে গ্রেনেড নিক্ষেপ করলেন। গ্রেনেডটি প্রচণ্ডভাবে বিস্ফোরিত হয় এবং মেশিনগান পোস্টটি ধ্বংস হয়। প্রায় একই রাস্তার মসজিদের পাশে আর একটি দু’তলা বাড়ি থেকে শত্রু স্লাইপার এর গুলি এসে জাহাঙ্গীরের কপালের একপাশ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। গুলির আঘাতে সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে বিজয় সুনিশ্চিত করেই শহীদ হন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। আমাদের দিয়ে যান লাল সবুজের একটি পতাকা, একটি মানচিত্র।

এ পতাকা আমাদের অস্তিত্ব। এ মানচিত্র আমাদের মা। এ সব রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যা করা আমাদের একান্ত কর্তব্য।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও সেক্রেটারি, বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ফাউন্ডেশন।