ড. জাকির হোসেন।

চিকিৎসকেরা মুখোশ খুলে দিতে পারে!

প্রকাশিত :০৯.০৩.২০১৭, ৫:৩৯ অপরাহ্ণ

ড. জাকির হোসেন –

 
ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় ছয় বছর আগের। তখন বেসরকারি একটি হাসপাতালে চাকরি করতাম। জরুরি বিভাগে কর্মরত ছিলাম। কোন এক সন্ধ্যায় হঠাৎ একজন তরুণী মেয়ে, মধ্য বয়সী এক মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে আমার রুমে প্রবেশ করে। মেয়েটি দেখতে সুন্দরী।

বয়স্ক মহিলাটি অজ্ঞান অবস্থায় ছিল। আমার রুমে কর্মরত ওর্য়াড বয় তাকে রোগীর বিছানায় শুইয়ে দিল। মেয়েটি খুব কাতর সুরে বলল, ডাক্তার সাহেব আমার রোগীকে একটু তাড়াতাড়ি দেখেন প্লিজ। আমি রোগীর পাশে গিয়ে সমস্ত শারীরিক ভাইটাল সাইন দেখে তার জ্ঞান ফেরালাম। রোগী একটু একটু কথা বলতে শুরু করল। মেয়েটি আমাকে এসে বলল, ডাক্তার সাহেব, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, রোগীর জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন। এখন তো উনি একটু একটু কথা বলছেন, আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ কী? আমি তাকে বললাম, কথা বলছে ঠিক তবে তাকে আমি ভর্তি করে একটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চাই। উনি বললেন, আপনার যা করার করেন কোন সমস্যা নেই।
ইনডোরে যাওয়ার পর চিকিৎসক তাকে অনেকগুলো পরীক্ষা করতে বলল। এর মধ্যে এক তরুণ ছেলে টাকা নিয়ে এলো। মেয়েটি রোগীর পরীক্ষার টাকা জমা দিয়ে, আমাকে জিজ্ঞেস করল, ডাক্তার সাহেব উনাকে কতদিন হাসপাতালে থাকতে হবে? বললাম, কিছু প্রয়োজনীয় পরীক্ষা দিয়েছি, রিপোর্টগুলো আমাদের হাতে এলে, ভাল দেখলে আজই ছেড়ে দিব। আর যদি সমস্যা খুঁজে পাই তবে হয়তো দু-তিনদিন হাসপাতালে থাকতে হবে।

আমি মনে করেছি রোগী তার লোক, কিন্তু তা নয়। আমার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার আগে বলে গেল, গরিব মানুষ, আপনি দয়া করে একটু খোঁজ রাখবেন। আমি তাকে আস্বস্ত করলাম। উনি চলে গেলেন। চলে যাওয়ার ঘণ্টা দুয়েক পরে আরেকজন পঞ্চাশোর্ধো মহিলা এসে আমার ইর্মাজেন্সি রুমে হাজির। এসে পরিচয় দিলেন নিজের, বুঝলাম শিক্ষিত পরিবার। জানতে চাইলেন, রোগী কোথায় আছেন। জানবার পর তিন তলায় রোগীর কাছে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে রোগীর অজ্ঞান হওয়ার কারণ জানতে চাইলেন। তখনও অজ্ঞান হবার কারণ নির্ণয় করা যায়নি। বললেন, কারণ না জেনেই আপনারা রোগী ভর্তি দিয়ে দিলেন। রোগী অজ্ঞান অবস্থায় এসেছেন। আমি তার জ্ঞান ফিরিয়েছি, রোগী এখনও খুব দুর্বল, সে ঠিক করে কথাই বলতে পারছে না , তাকে জানালাম সবকিছু। শুনে বললেন, ঠিক আছে আপনারা যেহেতু কারণ খুঁজে পাননি তাই রোগীর মানসিক রোগ আছে এই কথা লিখে ডিসচার্জ করে দিন। কিন্তু তার কোন মানসিক রোগ নেই। কেন এমন লিখতে হবে? খুব বিস্মিত হই আমি। রিপোর্ট পাবার পর সব বোঝা যাবে, জানাই তাকে। শুনে, তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে যান তিনি।
মিনিট দশেক পর আবার ফিরে এলেন। এসেই বললেন, খিচুনী রোগ আছে এই কথা লিখে রোগীকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। বুঝতে পারলাম এই ভদ্র চেহারার পিছনে আরেকটা কুৎসিত চেহারা লুকিয়ে রয়েছে।

বললাম এটা লিখে দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। রেগে গেলেন তিনি! তাকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম, হাজারো কারণে মানুষ জ্ঞান হারাতে পারে ফিজিক্যালি এ্যাসল্ট হলেও জ্ঞান হারাতে পারে। তিনি বুঝতে চাইলেন না কিছুতেই। বললাম, আপনি হাসপাতালের নিয়ম কানুন বোঝার চেষ্টা করেন। নতুবা আপনাকে পুলিশ ফেস করতে হবে। তিনি কিছুতেই আর রোগীকে রাখতে চাইলেন না। বন্ড সই দিয়ে নিজ দায়িত্বে রোগী নিয়ে বের হয়ে গেলেন। সন্দেহ হলো আমার। এর পেছনে অন্য কিছু রয়েছে। মানুষ কত অমানবিক ও কদর্য হতে পারে তা হয়তো চিকিৎসক না হলে বুঝতাম না।

কত রোগী আসে। তার পেছনে কত ঘটনা। মানবিক-অমানবিক। চিকিৎসকেরা জানেন, সাক্ষী সেসব ঘটনার, অমানবিকতার। একটু যদি আইনি ব্যবস্থা প্রয়োগের ক্ষমতা থাকত চিকিৎসকদের তাহলে সমাজে অনেক অপরাধ আর অপরাধীর মুখোশ উন্মোচিত হত।

 

লেখক: চিকিৎসক ও কলামিস্ট।