মোহাম্মদ এ আরাফাত।

বঙ্গবন্ধু ও ৭ই মার্চের ভাষণ

প্রকাশিত :১১.০৩.২০১৭, ২:২৪ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ এ আরাফাত

 

৭ই মার্চের ভাষণকে ঘিরে বহুবিধ বই সম্পাদিত হয়েছে। এই বইগুলোতে ৭ই মার্চের ভাষণটি রাজনীতি, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, গণযোগাযোগ, নৃ-তত্ত্ব, ভাষাবিজ্ঞান, সমরশাস্ত্র ও অর্থনীতি ইত্যাদি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তত্ত্বানুসন্ধান এবং বিশ্লেষণ হয়েছে।

৭ই মার্চের ভাষণের ভাষা, পরিবেশনা, শব্দগুচ্ছ এবং নির্বাচিত বাক্যাংশ সেই মুহুর্তের পরিস্থিতির শর্তগুলোর সঙ্গে ছিল সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই ভাষণটি তৎকালীন বাংলার মানুষের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র নির্মাণের তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে করেছিল প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত এবং বাংলার সমস্ত মানুষের মনস্তত্বে তুলেছিল বিপুল আলোড়ন। এই ভাষণ পরিবেশনাকালে বঙ্গবন্ধুর সামনে যে ক্ষেত্র ছিল তার আয়তন ছিল ৫৬ হাজার বর্গমাইল, যে লক্ষ্য ছিল তা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র।

আমার দৃষ্টিতে ৭ই মার্চের ভাষণ বাংলা সাহিত্যের এক সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এটি শুধুমাত্র একটি ভাষণ নয়, এটি বাঙালি জাতিস্বত্ত্বার রূপ নির্ণয় এবং অস্তিত্ত্ব পুনরুদ্ধারের মহাকাব্য। এটি বাংলা ও বাঙালির বঞ্চনা, হতাশা এবং সেখান থেকে জন্ম নেয়া ক্রোধ ও সর্বোপরি আত্মপ্রত্যয়ের ছোট গল্প। এটি বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের ভবিষ্যৎ চিন্তার উপন্যাস। এই মহাকাব্যের কবি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি জীবন বাজি রেখে পরাধীন বাঙালির জন্য নিজের রক্ত দিয়ে যে কবিতাটি লিখেছেন, তার নাম ‘স্বাধীনতা’।৭ই মার্চের ভাষণ সেই স্বাধীনতার বলিষ্ঠ উচ্চারণ।

প্রত্যক্ষদর্শী সরদার ফজলুল করিমের ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে দর্শনশাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা একটি বিবরণীতে পাওয়া যায়, “‌কিন্তু সেদিন (৭ মার্চ) শেখ মুজিব যা বলেছিলেন, তা তাঁর পক্ষে সেদিনেই মাত্র বলা সম্ভব ছিল, আর সে ভাষণের তাৎপর্য আজ কেবল তার শব্দের পুনর্বাজনার মাধ্যমে ধরা কারো সম্ভব নয়। তাঁর জন্য প্রয়োজন লাখো মানুষের জমায়েত ভরা সেদিনের সেই রেসকোর্স, তার মধ্যে স্থাপিত সেই মঞ্চ, শেখ মুজিব এলেন একটু বিলম্বে, তিনি উঠলেন মঞ্চে, চারদিকে তিনি দৃষ্টি ফেললেন, দেখলেন লোকে-লোকারণ্য, শুনলেন আকাশে জঙ্গি বিমানের গর্জন এবং সেই গর্জনকেও অতিক্রম করে উঠছে উদ্বেল লাখো মানুষের সংগ্রামী আওয়াজ। দেখছেন লোক তখনো আসছে আর আসছে। আর এমনই দৃশ্য দেখতে দেখতে শেখ মুজিব বদলে যেতে লাগলেন নিজের অজান্তে। এমনই হয়। জনতার মধ্যে জন এমনইভাবে বদলায়। জনতার বাইরে জন তথা ব্যক্তির এক রূপ, ক্ষুদ্র, শঙ্কিত, সীমিত। জনতার অংশ হিসেবে জনতার মধ্যে তাঁর অপর এক রূপ: তেজে কম্পমান, শক্তিতে দুর্বার আর সম্ভাবনায় অসীম”।

ব্যক্তিগতভাবে আমি এই ভাষণটিকে আমার প্রজন্মের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি। আমি অনেক বিশ্লেষকের বিশ্লেষণ পড়েছি যাদের কম বেশি সকলেই ৭ই মার্চের সময় রমনা রেসকোর্স মাঠে উপস্থিত ছিলেন অথবা সেই উত্তাল সময়ের স্বাক্ষী। আমার সেই ভাষণ সরাসরি অবলোকন বা শ্রবনের সৌভাগ্য হয়নি। আমার প্রজন্ম ৭৫ থেকে ৯০ পর্যন্ত এই ভাষণের কথা শুনতেই পায়নি। আমি ব্যক্তিগতভাবে ৮০’র দশকের মাঝামাঝি এই ভাষণের বিষয়টা জানলাম। এর পরে ৯০’এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তি সময় এবং ৯১ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবার ঠিক পূর্বে বাংলাদেশ টেলিভিশনে হঠাৎ করে একদিন বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের সর্বশেষাংশ প্রচারিত হলো। এইবার এটি প্রথমবারের মতো দেখলাম।

“রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দিব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” যেমন শব্দচয়ন, তেমনি বাক্য ছুড়ে দেয়ার ঢং, তেমনি অভিব্যক্তি, চেহারা ও শরীরের অভিব্যক্তি তথা দেহ ভাষা-যার মধ্যে ছিল নিজের প্রতি অবিচল আস্থা, দৃঢ়তা ও শক্ত ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ। কি এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করলাম। মনে হচ্ছিল, আমি আমার অস্তিত্ব, যা এতদিন আমি শুধু অনুভবই করেছি, তার রূপ আজকে দেখলাম। মনে মনে আমি গর্ববোধ করলাম এই ভেবে যে, আমি এত উচ্চতায় বাস করি, যা আগে কখনো বুঝিনি।

bangabandhu_ajsarabela

ভাষণের বিভিন্ন পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে জাতিকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। তাঁর প্রতিটি নির্দেশনার মধ্য দিয়ে তিনি একটু একটু করে বাঙ্গালীর উপর তাঁর অধিকার এবং কর্তৃত্ব স্থাপন করছিলেন। প্রতিটি নির্দেশনার মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কার্যত সরকার প্রধান। ভাষণের একটি পর্যায়ে তিনি বললেন, “আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি…।” প্রমিত ভাষারীতিকে উপেক্ষা করে বাংলার জনমানুষের যোগাযোগসক্ষম স্থানীয় বাংলা শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় এই বাক্যাংশে। এর মধ্য দিয়ে তিনি বাঙালিকে আপন করে নিলেন, বানালেন আত্মার আত্মীয়। একই সঙ্গে বাঙালিকে বার্তা দিলেন কোন আপোষ চলবে না, এমনকি তিনি নিজেও স্বশরীরে উপস্থিত না থাকলেও প্রতিরোধ চলবে।

তিনি জানতেন যে, পাকিস্তানি সরকার তাঁকে গ্রেফতার করতে পারে বা হত্যা করতে পারে। ৪ঠা মার্চের একটি ভাষণে তিনি বলেছিলেন “জানি না আপনাদের সামনে আবার বক্তৃতা করতে পারব কি পারব না। যদি আমার মৃত্যুও হয় তবুও বেইমানি করব না”।বঙ্গবন্ধু তাঁর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের শুরুতেও বলেছিলেন “হয়তবা এটাই আমার শেষ ঘোষণা…।” একটা বিষয় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলেন। তাঁর জীবনের উপর অনেক হুমকি ছিল কিন্তু তিনি তা তোয়াক্কা করেননি।

এই ভাষণের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, এই ভাষণটি যতবার বাজানো হয়েছে পৃথিবীর আর কোন ভাষণ এতবার বাজানো হয়নি। পৃথিবীর আর কোন ভাষণ মানুষ এতবার শোনেওনি। এই ভাষণটির পুরোটা না হলেও চুম্বক অংশগুলো, যেমন, “রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দিব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”- বিশ্বের প্রতিটি বাঙালির চেতনায়ও অন্তরে গেঁথে আছে।

এই ভাষণটিতে বঙ্গবন্ধুকে কোন পাণ্ডুলিপি থেকে পড়তে দেখা যায়নি। একেবারেই স্বতঃস্ফুর্তভাবে মনের অন্তঃস্থল থেকে উচ্চারিত হয়েছিল প্রতিটি শব্দ। সমস্ত বাঙালির সামষ্টিক রূপকে ধারণ করে বাঙালির মনে কথাই যেন বলছিলেন তিনি। পরাধীন বাঙালির সামনে মুক্তির ত্রাণকর্তা হিসেবে দাঁড়িয়ে বাঙালিকে শোনাচ্ছিলেন স্বাধীনতার বাণী।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ আকুল আকাঙ্ক্ষায় তাকিয়ে ছিলেন এক মহামানবের আগমনের অপেক্ষায়। তিনি বলেছিলেন কবে আসবে সেই মহামানব যে বাঙালিকে করবে শৃঙ্খ্লমুক্ত। ৭ই মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে সেই বিশাল জনসমুদ্রে বাঙালি দেখলো রবীন্দ্রনাথের আকাঙ্ক্ষার সেই মহামানব। উপস্থিত হলেন লাখো মুক্তি পাগল জনতার সামনে, শোনালেন মুক্তির মহাকাব্য। আমরা জানলাম আমাদের কেউ আর ‌‌‌দাবায়া রাখতে পারবে না।

 

লেখক : অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং প্রধান উপদেষ্টা, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। চেয়ারম্যান, সুচিন্তা ফাউন্ডেশন।