রাজশাহী বেতারের তিনজন শহীদ স্মরণে

প্রকাশিত :১৬.০৩.২০১৭, ৪:৩০ অপরাহ্ণ

। মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন

উত্তাল মার্চ। বাঙালির জীবনে এক অবিস্মরণীয় মাস। ঘটনাবহুল এই মাসের প্রতিটি মুহূর্ত হৃদয়ে গেঁথে আছে। তার কিছু আনন্দের, কিছু বেদনারও। জাতির পিতার আহ্বানে আমরা বাঙালিরা স্বাধীনতার জন্য যার যার ক্ষেত্র থেকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের অনেকেই শহীদ হন। শহীদদের অনেকেই বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে গেছেন।
রাজশাহী বেতারের তিনজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা কর্মচারী যথাক্রমে- আব্দুল  মতিন, হাবিবুর রহমান এবং মোহাম্মদ মহসিনের কথা রাজশাহীবাসী তথা দেশবাসীর কাছে অজানায় রয়ে গেল। রাজশাহী নগরীর কেউ এই শহীদদের সম্পর্কে তেমন জানেনও না। কারণ স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি ৭৫-এ ক্ষমতা দখল করায় বেতার কর্তৃপক্ষ এদের কোনদিন স্মরণ করেনি। যদি এদের শাহাদাৎবরণের দিনটি প্রতিবছর পালন করা হত, দোয়া মহফিল হত তাহলে সবাই জানতে পারতেন এদের ত্যাগের কথা, জীবন উৎসর্গের কথা।

১৯৭৫-এ জাতির পিতাকে স্বপরিবারে হত্যা করে, জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় বন্দী অবস্থায় হত্যা করে পাকিস্তানের দালালরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সকল অর্জন মুছে ফেলতে চেয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বকে নির্মূল করতে চেয়েছিল। ঠিক তেমনি পকিস্তানি সেনাদের গণহত্যা, খুন, ধর্ষণসহ সকল অপকর্ম ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য ক্ষমতা জবরদখলকারী জেনারেল জিয়াউর রহমান শহীদদের বিষয়টিও ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করেছিল। ফলে বঙ্গবন্ধু নির্দেশিত শহীদের তালিকা তৈরি করার কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। যতটুকু তালিকা তৈরি হয়েছিল তাও বিনষ্ট করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক পুনর্বাসিত বীরাঙ্গনাদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল। জেনারেল জিয়ার শাসনামলে যেমন জাতির পিতার নাম উচ্চারণ নিষিদ্ধ ছিল, তেমনি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী চার জাতীয় নেতা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধে সম্ভ্রম হারানো বীরাঙ্গনা, মা-বোন কিংবা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নাম উচ্চারণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।

৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ঢাকা বেতার থেকে সরাসরি প্রচার করা হবে। অন্য ছয়টি   আঞ্চলিক কেন্দ্র সম্প্রচার করবে নির্ধারিত ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানি মিলিটারি জান্তা ঢাকা বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক সৈয়দ জিল্লুর রহমানকে শেখ মুজিবের ভাষণ রেসকোর্স থেকে সরাসরি সম্প্রচার করতে নিষেধ করে দেন। সঙ্গে সঙ্গে বেতারকর্মীরা এ কথা বঙ্গবন্ধুর কানে তুলে দেয় ।

এদিকে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ  গোপনে বাণীবদ্ধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই গ্রহণ করা  হয়েছিল। স্টেজে উঠে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘শুনলাম আমার ভাষণ সম্প্রচারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। যদি আমার ভাষণ প্রচার করতে দেওয়া না হয়, কাল থেকে কোন বাঙালি কর্মকর্তা বেতারে যাবে না’। বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশ ত্বরিত গতিতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, সিলেট কেন্দ্রে পৌঁছে যায়। বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোন কাজ করবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। বিষয়টি আঞ্চলিক পরিচালক জরুরি মিলিটারি কর্তৃপক্ষের নজরে নিয়ে এলে পরদিন সকালে অর্থাৎ ৮ মার্চ সকাল ৮টায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল বাঙালির মুক্তি সনদ। বাঙালির মুক্তির দূত বঙ্গবন্ধু তার এই ভাষণে বাঙালিকে স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের জন্য অর্থাৎ জীবন উৎসর্গ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বললেন। বাঙালিকে স্বাধীনতার জন্য ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মোকাবেলা করতে বললেন। বঙ্গবন্ধু প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণাই করেছিলেন। কারণ তিনি সেদিন সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানের মতই উচ্চারণ করেছিলেন- ‘আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিতে চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরিবের যাতে কষ্ট না হয়— গরুর  গাড়ি, রেল চলবে। শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, সেমি গভর্নমেন্ট দপ্তর, ওয়াপদা কোন কিছুই চলবে না।’ ঠিক তাই হয়েছিল সবকিছুই গণমানুষের নেতা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই চলেছে- বন্ধ কিংবা বন্ধ হয়েছে। জাতির পিতা আরও বলেছিলেন, ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, রাস্তাঘাট সব বন্ধ করে দেবে। — রেডিও যদি আমাদের কথা না শুনে তাহলে কোন বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেন না।’ বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশ ঢাকাসহ মফস্বল শহরের শহীদ হাবিবুর রহমান মেনেছিলেন।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান

রাজশাহী বেতার থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্প্রচার সম্পর্কিত সকল কর্মকাণ্ডের বিষয়ে শহীদ হাবিবুর রহমান মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। শহীদ আব্দুল মতিন এবং শহীদ মোহশিন আলী তার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সহযোগিতা করেন। এদিকে ২৬ মার্চ পাকিস্তানি মিলিটারি রাজশাহী পুলিশ লাইন অবরুদ্ধ করে রাখে। আমাদের বাড়ি পুলিশলাইন সংলগ্ন হওয়াই আমি, শহীদ হাবিবুর রহমান এবং আমাদের পাড়ার মহসিন, সুফিয়ান, আব্দুর রহমানসহ শতশত মুক্তিকামী মানুষ পুলিশের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্থান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হই।

উল্লেখ্য, কয়েকদিন আগেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হাদি, সরদার আমজাদ হোসেন এমপি, সিংরার এমপি আশরাফুল ইসলাম, রাজশাহীর জেলাপ্রশাসক ও পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে পুলিশ লাইনের অস্ত্রগার থেকে আমাদের আমাদের মাঝে অস্ত্র বিতরণ করা হয়। আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হাদি রাজশাহী সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক আমাকে ইউএসএ’র তৈরি একটি ‘স্তিভেন’ বন্দুক দিয়েছিলেন। আমাদের বাড়ির অদূরে  ই.পি.আর সদর দপ্তরের অনেক ই.পি.আর. সদস্য আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এদের একজনের নাম আজও মনে আছে কারণ তিনি মারাত্মক আহত হয়েছিলেন কামরুজ্জামান ই.পি.আর. লান্স নায়েক (কম্পাউন্ডার) ছিলেন। তাকে শহীদ হাবিবুর রহমান প্রেমতলি হাসপাতালে নিয়ে সেবা করে সুস্থ করে তুলেন। পরে কামরুজ্জামান আমাদের সঙ্গে নদী পার হয়ে লালগোলা ডাকবাংলো ক্যাম্পে (সেক্টর৭, সাব-সেকটর-৪) ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহামেদ চৌধুরীর অধীন যুদ্ধ করেন।

শুরুতেই ক্যাপ্টেন রশীদ এবং বেশ কদিন পরে ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী  রাজশাহী মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন এবং পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৩ এপ্রিল রাজশাহী শহর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দখলে চলে গেলে ক্যাপ্টেন গিয়াস প্রথমে প্রেমতলি ইপিআর ক্যাম্প থেকে এবং পরে গোদাগাড়ী ডাকবাংলায় স্থাপিত ক্যাম্প থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। শহীদ হাবিবুর রহমান এসময় ক্যাপ্টেন গিয়াসের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে কাঁঠালবাড়ী আমবাগানে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আমি তখন প্রেমতলি-আমাদের গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছিলাম এবং হাসপাতালে আহত মুক্তিযোদ্ধা কামরুজ্জামানকে দেখাশোনা করছিলাম। কামরুজ্জামানের বাড়ি পাবনার নগরবাড়ি ঘাট। ১৫/১৬ বছর আগে সুস্থ সবল কামরুজ্জামান এর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বললেন খুব ভাল আছেন এবং নিজ গ্রামে ডাক্তারি করেন।

পাকিস্তান বাহিনী চাঁপাইনবাবগঞ্জ অভিমুখে রওয়ানা হওয়ার খবরে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ১৭ এপ্রিল প্রেমতলি ই.পি.আর. ক্যাম্প ছেড়ে নৌকা করে নদীর ওপারে চরে চলে যায়। যারা গোদাগাড়ী ডাক বাংলায় অবস্থান করছিল তারাও ওপারে চরে চলে যায়। আমিও প্রেমতলি ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ওপারে চরে গিয়ে বেশ কদিন পরে লালগোলায় যাই। হাবিবুর রহমান বেতারকেন্দ্র বন্ধ করার জন্য থেকে যান। তিনি ২৬ শে মার্চ থেকে চাকরিতে অনুপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সহকর্মী আব্দুল মতিন ও বেতার প্রকৌশলী মো. মহসিনের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ ছিল। ক্রিস্টাল সরিয়ে বেতারকেন্দ্র বন্ধ করার জন্য হাবিবুর রহমান ৬ই মে বেতার কেন্দ্রে গিয়ে প্রকৌশলী মো. মহসিন এবং আব্দুল মতিনের সঙ্গে গোপন আলোচনার সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে তারা ধরা পড়েন। পরে জানা যায় আঞ্চলিক পরিচালক এম সাইফুল্লাহ তাদের তিনজনকে সেনাবাহিনীর হাতে ধরিয়ে দেন। এরা তিনজনই লক্ষ্মীপুর ভাটাপাড়ায় থাকতেন এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ছিলেন। মোহসিন কুষ্টিয়া শহরের মানুষ, বেতারের কাছাকাছি লক্ষ্মীপুর ভাটাপাড়ায় ভাড়া থাকতেন  আর দুজন নিজ বাড়িতে। একসঙ্গে অফিস যাওয়া-আসা করতেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জোহা হলে এদের তিনজনকে সারাদিন শারীরিক নির্যাতনের পর গভীর রাতে অর্থাৎ ৭ই মে বধ্যভূমিতে গুলি করে হত্যা করে।

যেদিন সেনাবাহিনী বেতারের এই তিনজন কর্মচারীকে বেতারকেন্দ্র থেকে তুলে নিয়ে যায় সেইদিন বিকেলেই এদের পরিবারের সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্থানীয় মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আইনুদ্দিনের বোয়ালিয়ার বাসায় গিয়ে ওদের বাঁচাবার জন্য কাকুতি-মিনতি করেন। বিশেষ করে মোহসিনের স্ত্রী তার দুটি শিশু সন্তানকে দেখিয়ে বলেন, ‘অন্তত আমার এই দুটি সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও আমার স্বামীকে বাঁচান।’ শুনেছি আইনুদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় মিলিটারি কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে ওদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছিলেন। পরে জানিয়ে দেন- ‘এরা তিনজনই পাকিস্তানের শত্রু এবং ভারতের দালাল তথাকথিত মুক্তিবাহিনীর চর। কাজেই এদের বাঁচাবার সুযোগ নাই।’ মহসিনের স্ত্রীর কান্না, শিশু সন্তানদের মুখ ওই পাষণ্ডদের পাষাণ হৃদয়ে কোন দয়া-মায়া কিংবা করুণার উদ্রেক করেনি। পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী জানা যায় ওদের তিনজনকে ওই রাতেই ১২টার পর অর্থাৎ ৭ তারিখ গুলি করে হত্যা করা হয়।

মোহসিনের পরিবার কুষ্টিয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সহায়তায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সকল সুবিধাদি পেয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু শহীদ হাবিবুর  রহমান এবং আব্দুল মতিন এর বিষয়ে রাজশাহী জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি । বরং শহীদ হাবিবুর রহমানকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা দেওয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে একটি আবেদনপত্র ২০১২ সালে জামুকা বরাবর পাঠানো হয় যার ফটোকপি মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর স্বাক্ষর ও আদেশসহ জমা দেওয়া হয় কিন্তু আজও কোন ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে মাননীয় মন্ত্রী এবং জাতীয় নেতা এ এইচ এম কামরুজ্জামান এর নির্দেশ তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি কমিশনার আব্দুল আজিজ তাদের বাসায়  গিয়ে এই শহীদ পরিবারের সস্যদের সমবেদনা জানান এবং প্রত্যেক পরিবারকে জাতির পিতা প্রদত্ত তিনহাজার টাকার চেক এবং সমবেদনাপত্র হস্তান্তর করেন। যতদূর জানি এ ছাড়া আর কেউ কখনও এই শহীদ পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেননি বা রাখেননি।

দেশ শত্রু মুক্ত হলে মুক্তিযোদ্ধারা ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যেই রাজশাহী শহরে প্রবেশ করে। ১৯ ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহাম্মদ চৌধুরী বেতার ভবনে গিয়ে প্রথমেই আঞ্চলিক পরিচালক এম সাইফুল্লাকে বোয়ালিয়া থানার ওসির হাতে তুলে দেন এবং শহীদ হাবিবুর রহমান, শহীদ আব্দুল মতিন এবং শহীদ মহসিনকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে ধরিয়ে দিয়ে হত্যা করার জন্য সাইফুল্লাহর বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের নির্দেশ দেন। শ্রোতা গবেষণা অফিসার ফখরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং বেতারের তিনজন কর্মচারীকে হত্যার জন্য থানায় চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়। এসমস্ত কর্মব্যবস্থা গ্রহণকালীন আমি রাজশাহী বেতারে উপস্থত ছিলাম।  তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালক জনাব ফখরুল ইসলাম বেঁচে আছেন। তিনি উপমহাপরিচালক পদে চাকরিতে থাকাকালীন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এই তিনজন শহীদকে প্রত্যয়ন প্রদান করেন।

শহীদ হাবিবুর রহমান আমার বড় ভাই বিধায় আমি রাজশাহী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আসামি আঞ্চলিক পরিচালক সাইফুল্লাহর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করি। মামলা চলাকালীন ৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিক জেনারেল জিয়াউর রহমান সরকার মামলা খারিজ করে দেয় এবং এই স্বাধীনতাবিরোধী খুনিকে মুক্ত করে বেতারের আরও উচ্চপদে আসীন করেন। এ যেন স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ এবং মুক্তিযোদ্ধা হত্যার পুরস্কার। আরও বড় পদে আসীন হয়ে ক্ষমতাধর সাইফুল্লাহ বেতার সদর দপ্তরে আসন গেঁড়ে বসে। এই স্বাধীনতাবিরোধী যতদিন বেঁচে ছিল সকল মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের (দু’একজন দালাল ছাড়া) হয়রানীর মধ্যে রেখেছিল। দেখুন এই খুনি স্বাধীনতা বিরোধী দশ বছর চাকরি করে পেনশন নিয়ে ঘরে ফিরে। আর ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস আমরা শহীদ পরিবারের সদস্যরা বিচারের আশায় দিন গুনতে থাকি। যদিও জাতির পিতা ঘোষণা করেছিলেন- ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নিহত বেতারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নৌবাহিনীর শহীদদের সমান মর্যাদা পাবেন।’
প্রশ্ন হলো দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী শহীদ হাবিবুর রহমান শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা পাবেন কী?

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক, বাংলাদেশ বেতার।