স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও কেউ কথা রাখেনি

প্রকাশিত :২৫.০৩.২০১৭, ৫:৪৭ অপরাহ্ণ

স্বপন কুমার দেব, মৌলভীবাজার : মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের ভাটগাঁও  গ্রামের ছগির মিয়াকে স্থানীয় রাজাকাররা গুলি করে হত্যা করে। কবর দিতে দেয়নি গ্রাম্য কবরস্থানে। বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দুরে শুকনাছড়া নদীর পাড়ে সরকারি খাস জমিতে তাকে মাটিচাপা দেয়া হয়। যেটি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছগির মিয়ার কবর হিসেবে পরিচিত। সেই কবরের এক তৃতিয়াংশ নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। বাকিটাও কি তাহলে নদীগর্ভে বিলীন হবে? এমন প্রশ্ন এলাকাবাসীর। স্বাধীনতার ৪৬ বছওে কোন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছগির মিয়ার কবর রক্ষায় তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি। বর্তমান এমপি আব্দুল মতিন নিজের একজন মুক্তিযোদ্ধা কিন্তু তিনিও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছগির মিয়ার কবর রক্ষায় কোন উদ্যোগ নেননি।
সরেজমিন ভাটগাঁও গ্রামে গেলে পার্শ্ববর্তী গনিপুর গ্রামের বাসিন্দা ও  মুক্তিযোদ্ধা ইলিয়াস আলী চৌধুরী রেকু মিয়া এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছগির মিয়ার ছোট ভাই মছদ্দর আলী (৭৫) জানান, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছগির মিয়া ছিলেন একজন দু:সাহসী গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি ভারতের কৈলাশহরে  প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। যেদিন তিনি মারা যান, সেইদিনটি ছিলো শনিবার। ছগির আলী ও তাঁর সহকর্মী মনরাজ গ্রামের বশিরকে সাথে নিয়ে মা বাবাকে দেখতে আসেন। রাত আনুমানিক ৩টায় স্থানীয় ইউনিয়নের তজমুল মেম্বার এসে ছগির মিয়ার মাকে ডাকেন। মা দরজা খুলে দিতে ছগির মিয়া মেম্বারের সাথে কথা বলতে বাইরে বেরিয়ে আসেন। সাথে সাথেই স্থানীয় রাজাকার লিডার ফুল মিয়া ও তার সহযোগিরা ঘেরাও করে ফেলে। সাথে থাকা অস্ত্র নিতে ঘরে প্রবেশ করতে চাইলে,  ফুল মিয়া গুলি করার নির্দেশ দিলে শানু রাজাকার ছগির মিয়ার পেছন দিকে গুলি করে। পেছন থেকে শরীওে ঢুকে গুলি বুক ঝাঁঝরা করে গিয়ে ঘরের দেয়ালে লাগে। ছগির মিয়ার সহকর্মী বশির গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। কিন্তু পরদিন মনরাজ গ্রামে তাঁর বাড়ির পাশের একটি খাল থেকে অর্ধমৃত অবস্থায় পাকিস্তানী বাহিনী বশিরকে নিয়ে যায়। আর কোন খোঁজ মেলেনি বশিরের।
এদিকে শনিবার রাতে ছগির মিয়া শহীদ হওয়ার খবর জানাজানি হলে পরদিন স্থানীয় একজন হাফিজ (যিনি এখনও জীবিত) এসে ঘোষণা দেন, নিহত ছগির মিয়া একজন সমাজ ও রাষ্ট্র বিরোধী মানুষ। তাকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা যাবে না। এই হুজুরের আদেশে ৩দিন উঠানেই পড়েছিলো শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছগির মিয়ার লাশ। শেষতক ৩দিন পরম মঙ্গলবারে বাড়ি থেকে আধাকিলোমিটার দুরে শুকনা ছড়া নদীর পাড়ে সরকারি খাস জমিতে মাটিচাপা দেয়া হয় ছগির মিয়ার লাশ।
স্থানীয় লোকজন জানান, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছগির মিয়ারা ছিলেন ৫ ভাই। বর্তমানে সবার ছোট মছদ্দর আলী বেঁচে আছেন। তিনি বিয়েসাদি করেননি। এছাড়া ছগির মিয়ার ছোট ছবর মিয়ার স্ত্রী,  ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বিয়েসাদি করেননি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছগির মিয়াও। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছগির মিয়ার পৈত্রিক সম্পত্তি প্রতারণা করে জবর দখল করে স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। পরিবারের জীবিতদের ভাগ্যে জুটেনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছগির মিয়ার আত্মত্যাগের কোন সুফল। এখন পরের ভিটায় আশ্রিত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছগির মিয়ার ভাই ও তাদের বংশধররা।
ভাটগাঁও ও গনিপুর গ্রামবাসীর দাবি, দেশের জন্য শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছগির মিয়ার যে আত্মত্যাগের নিদর্শণ এই কবরটাই। এটাকে সংরক্ষণ করে এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার। যাতে আরও ৪৫ বছর পর মানুষ জানতে পারে, এদেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছগির মিয়া।
মুক্তিযোদ্ধা ইলিয়াস আলী চৌধুরী রেকু মিয়া আরও জানান, পৃথিমপাশা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নবাব আলী নকি খান একবার নিজ উদ্যোগে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছগির মিয়ার কবরের চার দেয়াল নির্মাণ করে দেন। এখন সেই দেয়াল ভেঙে পড়ছে। কবরটা নদীগর্ভে বিলীন হতে চলেছে। স্বাধীনতার পর আজ পর্যন্ত স্বাধীনতারস্বপক্ষের অনেক এমপি ছিলেন। তাদের অনেকেই প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছগির মিয়ার কবর সুরক্ষার কিন্তু পরে সেইসব এমপিরা তাদের প্রতিশ্রæতির কথা ভুলে গেছেন বেমালুম।
কুলাউড়া উপজেলা ডেপুটি কামান্ডার আতাউর রহমান আতা জানান, মাইকে অনেকেই ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে কেউ কোন পদক্ষেপ নেননি। এনিয়ে অনেক লেখালেখিও হয়েছে। কিন্তু কোন সুফল হয়নি। বর্তমান এমপি আব্দুল মতিন একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনিও ছগির মিয়ার ব্যাপারে অবগত আছেন কিন্তু কোন উদ্যোগ নিচ্ছেন না।