ড. কামাল হোসেন
ড. কামাল হোসেন

সেই দিনের অভিজ্ঞতা

প্রকাশিত :২৬.০৩.২০১৭, ২:৪৮ অপরাহ্ণ

। ড. কামাল হোসেন.

পহেলা ১ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু বলে দিলেন, এদের সঙ্গে কোন রকম সহযোগিতা করা যাবে না, এরা অবৈধভাবে ক্ষমতা ধরে আছে। ফলে অসহযোগ আন্দোলন চলবে। ইয়াহিয়া খান এসেছিলেন, তিনি বললেন, হ্যা আমি দেখি আপনাদের যে দাবিগুলো আছে এ ব্যাপারে আলোচনা হয় কিনা। তখন বঙ্গবন্ধু নীতিগতভাবে বলবেন, আমরা ছয় দফার ভিত্তিতে যে দাবিগুলো তুলে ধরেছি তার মধ্যে মার্শল তুলে নাও, ক্ষমতা হস্তান্তর কর জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিকে- এবিষয়গুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বঙ্গবন্ধু, নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ ও আমাকে নিয়োগ করলেন আলোচনার জন্য। আমার তখন তরুণ বয়স। বঙ্গবন্ধুকে বললাম তাদের সঙ্গে আমি কেন? আমি তো অনেক জুনিয়র। আমাকে সঙ্গে রাখা হয়েছিল কেননা বেশ কিছু আইনের বিষয় ছিল।

সময় পার হচ্ছিল। কিন্তু তার কিছুতেই বঙ্গবন্ধুর কথা শুনছিল না। পরিবেশটা অস্থির হতে থাকে। মানুষের মধ্যে বাড়তে থাকে অস্থিরতা। সে অবস্থার মধ্যে আমরা ২৪ তারিখে প্রেসিডেন্টের বাস ভবন, যেখানে পুরানো গণভবন সেখানে আলোচনা করতে যাই।

প্রেসিডেন্ট ভবনে আমাদের পক্ষে আমি বললাম, দেখেন আলোচনা পুনরাবৃত্তি করে কোন কাজ হবে না, দ্রুত এটা চূড়ান্ত করে আমরা বঙ্গবন্ধুকে দেই এবং আপনারা জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে দেন। তারা এটা দেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘোষণা করে দেন। তা না হলে বাহিরের অবস্থার আরো অবনতি ঘটতে থাকবে। তাদের প্রতিনিধি আমাকে জিজ্ঞাসা করল, কবে ঘোষণা করা উচিত? আমি বললাম তিনদিন আগে হলে ভাল হতো। আমি চাইলাম ড্রাফট চ‚ড়ান্ত করে সেই রাতেই তা বঙ্গবন্ধুর কাছে পৌঁছে দিতে। তখন জেনারেল মীরজাদা বলেন, না না থামেন, আগে আমাদের নিজের মধ্যে আলোচনা হতে হবে তারপরে তিনি আমাকে টেলিফোনে বলে দিবেন কখন আসতে হবে। বৈঠকটা তিনি থামিয়ে দিলেন।
সারাদিন অপেক্ষা করলাম আমরা, তাদের কোন ফোন কল আসল না। বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন আসতে থাকল। যেখানে যেখানে ক্যান্টনমেন্ট আছে, যশোর, চিটাগাং, ঢাকা মনে হচ্ছে সব জায়গাই পূর্ব প্রস্তুতি চলছে। আমাদের কি করা? আমি বললাম, বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চই তো ঘোষণা দিয়েছেন। ওরা অবৈধভাবে আমাদেরকে বঞ্চিত করেছে, নির্বাচনের পর আমাদের সংসদে বসতে দিল না। ওদের সঙ্গে অসহযোগ তো চলবেই। যদি তারা আক্রমণের দিকে যায় তখন তো আর বলার বাকি থাকে না, আমরা তখন আক্রমণ প্রতিহত ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যুদ্ধ করবই। আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে তাদের প্রতিহত করব। একথা টেলিফোনে বহু জায়গায়, বহুবার বলা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত দিলেন তাজউদ্দিন ভাই, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম এবং আমি যেন অসহযোগের কাজের মধ্যে থাকি। বলা হলো, যেন কেউ বাসায় না থাকি। পুরনো শহরের কোন একটা নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার নির্দেশ আসল। আমাদের নগরের প্রেসিডেন্ট ফজলুল করিম সাহেবের একটা বাড়ি ছিল ইংলিশ রোডে, কথা হলো তিনি আমাদের থাকার ব্যবস্থা করবেন।

২৫ তারিখে আমরা ধরে নিয়েছি সকাল ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে বের হয়ে যাব। সাড়ে আটটায় ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম একটা গাড়ি নিয়ে এসে বলল ওঠে যান, ওঠে জান তাজউদ্দিন ভাইকে নিয়ে পুরানো শহরে যাব। এর মধ্যে একটার পর একটা টেলিফোন আসছিল। তারমধ্যে আবার লোকজন আসা শুরু করল। সানাউল হক সাহেব এডিশনাল চিফ সেক্রেটারি, পুরা প্রশাসনের যিনি নেতৃত্ব দিতে, তিনি বললেন, আমরা ঐ সরকারের কোন আদেশ পালন করব না, আপনারা যেটা দিবেন সেটাই পালন করব।
এর মধ্যে ওয়াশিংটন পোস্টের এক বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, কি বুঝতে পারছেন? আমি বলেছি, দেখুন এদের যদি সুস্থ মানসিকতা থাকে তাহলে মিলিটারি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার চিন্তা করবে না, কিন্তু যদি পাগল হয়ে যায় তাহলে তো আক্রমণ করবেই।

সলিমুল্লাহ হলের সামনে যেতেই দেখি গাছ কেটে ব্যারিকেট দেওয়া। পরিচয় দেওয়াতে ব্যারিকেট সরিয়ে সরিয়ে দিল। ধানমন্ডির দিকে যখন অগ্রসর হলাম তখন তাজউদ্দিন ভাইকে নেওয়ার আগে ভাবলাম বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসি। সকাল নয়টা থেকে সাড়ে নয়টায় ৩২ নম্বরে ঢুকলাম। ঢুকে ভিতরের দিকে খাবার ঘরের দিকে যাচ্ছি, আমাদের দেখেই বঙ্গবন্ধু এগিয়ে আসলেন। দেখলাম ভেতরে কমান্ডার মোয়াজ্জেমসহ অন্যান্যরা খাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু দেখেই বললেন, আর দেরি করা ঠিক হবে না। আমাদের প্রায় ঠেলে গাড়িতে তুলে দিলেন।
যখন বের হচ্ছিলাম তখন কুমিল্লার এমপি মোজাফ্ফর সাহেবের সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন, ভাই আপনারা ওদিকে যাবেন না, নিউমার্কেটের সামনে ইপিআর সব পজিশন নিয়ে বসে আছে। ওটা পার হয়ে আপনারা কিভাবে পুরনো শহরে যাবেন। তখন তাজউদ্দিন ভাই বললেন, আজকে আমরা এ পাড়ায় থেকে যাই। এক বাড়িতে না থেকে একেক জন একেক বাড়িতে থাকি। তখন আমি বললাম, কাছেই আমার এক ভাগনার বাড়ি আছে, আমাকে ওখানে নামিয়ে দিন। পরে সকালে আমরা মিলিত হব। কিন্তু তা আর ঘটলো না। কেননা, সে রাত থেকেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।

সে রাতেই ক্যান্টনমেন্ট থেকে ট্যাঙ্ক বের হয়ে পড়ে। এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। তারপর গুলি করতে করতে শহরের ভিতরে ঢুকে পড়ে। প্রথমে গেল বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাসভবনে। ১২টার কিছুক্ষণ পরেই শুনলাম উনাকে অ্যারেস্ট করেছে। এরপরে তারা গেল ঢাকা ইউনির্ভাসিটির ক্যাম্পাসে। জগন্নাথ হল, ইকবাল হলের ছাত্রদের টেনে টেনে বের করে হত্যা করে। ২৫ মার্চের রাত থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত একই ঘটনা চলল। গোলাগুলির শব্দ। আকাশ আর রাজপথ দুই-ই লাল হয়ে গেল।

(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে)।

 

লেখক : সংবিধান প্রণেতা ও রাজনীতিবিদ