মুক্তিযোদ্ধা,মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন
মুক্তিযোদ্ধা,মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন

কিছু তথ্য কিছু সত্য ও বিএনপির মুখোশ

প্রকাশিত :০১.০৪.২০১৭, ৮:৪২ অপরাহ্ণ

। মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন –

স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের পবিত্র মাতৃভূমি এবং তার শান্তিপ্রিয় নাগরিকরা স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির কবল থেকে মুক্ত হতে পারেনি। যদি এই অপশক্তির কবল থেকে দেশ ও জনগণ মুক্ত হতে পারত তাহলে এই দেশ আজ মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরের মত উন্নত হত। কিন্তু পরিতাপের বিষয় আজ স্বাধীনতার ৪৬ বছরে আমরা দেখি রাজনীতির নামে অপরাজনীতি, জঙ্গিদের প্রত্যক্ষ সাহায্য সহযোগিতা আর আশ্রয়-প্রশ্রয়দান। নির্দোষ-নিরাপরাধ বিদেশি নাগরিক হত্যা, এমপি খুন, রাজনীতিবিদ খুন, হত্যা-ধর্ষণ, আগুন দিয়ে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া, লুঠ করা। এই নির্দয় পাষণ্ডদের হাত থেকে নারী-পুরুষ, শিশুকিশোর কেউ বাদ যাচ্ছে না। খুনি, ধর্মান্ধ, ইসলাম বিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী ও গণবিরোধী বিদেশি দালালদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে সামরিক শাসকের ঔরসে জন্ম নেয়া আমাদের দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। হয়ত অনেকেই ভাবতে পারেন আমি লোকটি আওয়ামী লীগের সমর্থক  তাই এমন বলছি। কিন্তু আপনি যদি দেশকে ভালবাসেন, দেশের মানুষের জীবন মানের উন্নতি চান, দেশে শান্তি চান, নিজে পরিবার পরিজন নিয়ে বিপদমুক্ত থাকতে চান, তাহলে আপনি কি জঙ্গিদের পক্ষে একটি কথাও বলবেন?

জঙ্গিবাদ আওয়ামী লীগ সরকারের সৃষ্টি বলে বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রতিনিয়ত বেতার, টিভি, দৈনিক পত্রিকাসহ বিভিন্ন সোশাল মিডিয়ার সাংবাদিকদের সামনে ভাঙ্গা রেকর্ড বাজানর মত ঘেনর ঘেনর করে মিত্থ্যাচার করেই চলেছে।

অথচ দেশের মানুষ কিন্তু ভাবে উল্টোটা। কারণ বেশী দিনের কথা নয় যে, মানুষ ভুলে গেছে! ক’বছর আগে ২০০১-২০০৫ পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে মানুষ কি দেখেছে? দেখেছে জঙ্গি সিদ্দিকুল্লাহ ওরফে বাংলাভাই বাঘমারা-রাজশাহী অঞ্চলসহ সারাদেশে এক ভয়াবহ ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে। কারও হাত কেটে নিয়েছে, কারও পা-কেটে নিয়েছে, কারও চোখ উপড়ে ফেলেছে। জামায়াত-বিএনপি’র মন্ত্রী ছত্রছায়ায় বাংলাভাই এক ভয়ঙ্কর ত্রাশের রাজত্ব কায়েম করে। আমরা দেখছি রাজশাহী শহরে বিএনপির মন্ত্রী, ব্যারিস্টার আমিনুল হক এবং মেয়র মিজানুর রহমান মিনুর নেতৃত্বে খুনি, হত্যাকারী, জঙ্গি বাংলাভাই মিছিল করে আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়েছে, মহড়া দিয়েছে। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার পুলিশ এই মিছিলের সামনে এবং পেছনে থেকে বাংলাভাইকে সুরক্ষা দিয়েছে। অথচ স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের নেতা, খালেদা জিয়ার মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী প্রচার করলেন বাংলাভাই সাংবাদিকদের সৃষ্টি, বাস্তবে নাই। আমরা চোখের সামনে যার নৃশংস কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করছি নিজামী সেই বাংলাভাই মিডিয়ার সৃষ্টি বলছে। পাঠক ভাবুন তাহলে, ইসলামের ধ্বজাধারী, ভণ্ড মুসলমান নিজামীদের মিথ্যাচার কোন পর্যায়ের ছিল?

বিএনপি আজ বলে ‘আমরাই বাংলা ভাইয়ের বিচার করেছি, ফাঁসি দিয়েছি।’ প্রশ্ন হল-কবে? কখন? কেন? আন্তর্জাতিক চাপে বেসামাল হয়ে ২০০৫ সালে  বিএনপি বাধ্য হয়েছিল জঙ্গি, খুনি বাংলাভাইকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করতে। তার আগে চৌষট্টি জেলায় একই সময়ে বোমা বিস্ফোরণ, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন আদালতে বোমা বিস্ফোরণ করে অাইনজীবী হত্যা এবং বিচার কাজে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় দুজন বিচারককে এজলাসে বোমা মেরে হত্যা করা হয়। উদ্ভুত এই পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ ফুঁসে উঠেছিল বিএনপি-জামায়াত খুনি সরকারের বিরুদ্ধে। দেশি-বিদেশি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ এড়াতে না পেরে  বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ৩ বছর পর বাধ্য হয় ওই খুনিকে গ্রেপ্তার করতে।

মানুষ আজও দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বিএনপি-জামায়াত সরকারের নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট এর ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলার কথা স্মরণ করে। খালেদা-নিজামীর  জঙ্গিরা বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনাসহ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সকল কেন্দ্রীয় নেতাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে এই গ্রেনেড হামলা যে করেছিল তা দেশের সকল মানুষ বিশ্বাস করে। শেখ হাসিনা অক্ষত অবস্থায় বেঁচে গেলেও নেত্রী আইভি রহমানসহ পায় ২৩ জন নেতাকর্মী সেদিন নিহত হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ঢাকার প্রাক্তন মেয়র মহাম্মদ হানিফ। সেদিন শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে মানব ঢল রচনাকারী কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে মারাত্মক আহত হন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। প্রায় আঠারোটি স্প্লিন্টার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি শরীরে বয়ে বেড়িয়েছেন।

বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ সৃষ্টির পেছনে কে বা কারা দায়ী তা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে-  নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী জামায়াতকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পবিত্র ভূমিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত   করে রাজনীতি করার সুযোগ করে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান (পরে সামরিক পোশাকে ক্ষমতা জবরদখলকারী রাষ্ট্রপতি)? কেন তিনি এটা করলেন? যারা আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সরাসরি পাকিস্তানীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, আমাদের মুক্তি যোদ্ধাদের  হত্যা করেছে, আমাদের মা বোনদের নির্যাতন করেছে, দেশকে মেধাশুন্য করার জন্য ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে সেইসব খুনিদের পাকিস্তান থেকে ফেরত এনে কেন তিনি রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করলেন?

বর্তমান প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভয়াবহতা দেখেনি। আর তাই হয়ত তারা কল্পনাও করতে পারছে না যে এই অপরাধীরা কত ভয়ঙ্কর অপরাধ করেছিল। কিন্তু আপনি,আমি যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছি বা দেখেছি, বাবা,ভাইকে হারিয়েছি এবং আমরা যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তারা জেনারেল জিয়ার এই অপরাধ কে ক্ষমা করি কেমন করে? আজ বিএনপির অনেকেই জেনারেল জিয়ার এই গুরু অপরাধকে লঘু করার জন্য নির্লজ্জ মিথ্যচার করে এবং বলে বঙ্গবন্ধু নাকি এদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। নির্লজ্জ মিথ্যাচার বলছি একারণে যে সাধারণ মানুষ যা জানে তার বিপরীতে ওরা কথা বলে। বঙ্গবন্ধু যদি ক্ষমা করেই থাকবেন তাহলে তখন ওই রাজাকার আলবদর বাহিনীর নেতারা পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিল কেন? বঙ্গবন্ধু’র সময় খুনিরা পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরেনি কেন? আর বঙ্গবন্ধুর সময় যেসব স্বাধীনতাবিরোধী এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত আলবদর রাজাকার আল-সামসদের বিচার হচ্ছিল এবং বিচারে যাদের জেলজরিমানাসহ বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি হয়েছিল তারা কারা? জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় বসে আমাদের চোখের সামনে এই খুনি অপরাধীদের ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জেলখানা থেকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন তা ভুলি কেমন করে। আমার ভাইয়ের হত্যাকারী সাইফুল্লাহ কে রাজশাহী জেল থেকে মুক্ত করে চাকুরীতে পুনর্বহাল করেছিলেন জেনারেল জিয়া এই কষ্ট আমার হৃদয়কে এখনও কাঁদায়।

বর্তমান প্রজন্ম না হলেও তার  আগের প্রজন্ম অর্থাৎ আজ যাদের বয়স চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ তাদের একটি অংশ স্বাধীনতা বিরোধীদের গোয়েবলিয় কায়দায় অনবরত মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত হয়েছে তা নিশ্চিত করে  বলতে পারি। কারণ সুবিধাভোগী  স্বাধীনতা বিরোধীরা পাকিস্তানী টাকায় পুষ্ট হয়ে ৭৫ থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত ফাঁকা মাঠে গোল দেবার মত হোটেল- রেস্তেরায়, পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে, স্কুল-কলেজে, মাদ্রাসায়-মসজিদে অপপ্রচার করে সরল সহজ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। এরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাল্টে দিতে চেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এবং তার পরিবারের নিহত সদস্যদের খাট করার জন্য কাল্পনিক, বানোয়াট এবং অলীক গল্প প্রচার করেছে। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের দুই  প্রজন্মের ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সের নারী-পুরুষের কেউই টের পেল না মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা কী ছিল। মানুষগুলোর  অবস্থা বা কেমন ছিল। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের অবগতি এবং উপলব্ধির জন্য তখনকার সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ সাময়িকী নিউজউইক কি বলেছে আজ তার কিছু অংশ তুলে ধরছি যাতে মিথ্যা প্রচার কারীদের মুখোশ তাদের সামনে উন্মোচিত হয়  -“কবিরা যে দেশকে ‘সোনার বাংলা’বলে আখ্যায়িত করেছেন বা প্রশংসা করেছেন সেই দেশটি আজ বসবাসের জন্য নরকে পরিণত হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দেশটিতে মৌসুমি বন্যার মতো দুর্ভিক্ষ, রোগ-ব্যধি এবং গৃহযুদ্ধ লেগেই ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যে দুর্দশা বাঙ্গালিদের উপর পতিত হয়েছে অতীতে এদেশের জনগণ তা প্রত্যক্ষ করেনি: একটি প্রলয়ংকরী সাইক্লোন বয়ে গেছে দখলদার পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে এবং সর্বশেষ একটি নৃশংস যুদ্ধ ।… যুদ্ধের  ফলে বাংলাদেশ যেন ধ্বংসস্তূপের জাতিতে পরিণত হয়েছে…এর অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে…কোষাগার শূন্য। নতুন বাংলাদেশের গর্ব এবং জাতীয় বীর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার পরিচালিত হলেও দেশের পর্বত প্রমান সমস্যা মোকাবেলা করতে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে।…এটা হতবুদ্ধিজনক যে, সামগ্রিকভাবে বিশ্বের সব দেশ বাংলার নতুন সমস্যা উপলুব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এটা বাঙ্গালিদের জন্য হুমকিস্বরূপ ।”

‘সাড়ে সাত কোটি মানুষ পরিবর্তনের শিকার’,  এই মন্তব্য করে ঢাকায় জাতিসংঘের ত্রান কার্যক্রমের পরিচালক সুইজারল্যান্ডের টনি হেগেন বলেন, “এটি পরিমাপের কোন মাপকাঠি নাই। অতীতে বিশ্বে এধরণের ভয়াবহতা লক্ষ্য করা যায়নি।” এর পরও যুক্তরাষ্ট্র বলছে বড় ধরনের কোন বিপর্যয়ের আশংকা নেই। তাই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত মানবিক সাহায্যের ৬০ শতাংশ বাতিল করেছে। একারণে জন এফ কেনেডি মার্কিন প্রশাসনের উপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন এবং বলেন ‘প্রশাসনের এই নীতি সত্যকে বুঝতে অস্বীকার করে।’  এর কয়েকদিন আগে নিউজউইক-এর সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে  কেনেডি বলেন ‘প্রশাসন প্রতিদিন ত্রান বরাদ্দ আটকে রাখছে। এর অর্থ প্রতি দিনই সদ্যজাত দরিদ্র দেশটির মানুষের দুর্দশার মাত্রা বাড়ছে’ নিউজউইক ২৭ মার্চ ১৯৭২।)

প্রিয় পাঠক সেদিন আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের  নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে পাকিস্তানকে অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য করেই মার্কিন প্রশাসন ক্ষান্ত হয় নাই। আমাদের স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে প্রায় ২২ হাজার মানুষকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিতেও এরা কোন দ্বিধা করেনি। ক্ষুধার্ত এই প্রিয় মানুষদের মৃত্যুর জন্য বঙ্গবন্ধু সংসদে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করার সময় হু হু করে কেঁদেছেন ।

 

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক পরিচালক,বাংলাদেশ বেতার।