ferdous pic_ajsarabela
চিত্রনায়ক ফেরদৌস আহমেদ

‘আজ সারাবেলা’র সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ফেরদৌস আহমেদ
আমি ফেরদৌস, কারো সঙ্গে আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই

প্রকাশিত :০৭.০৪.২০১৭, ৬:১৪ অপরাহ্ণ

ফেরদৌস, অফ ট্র্যাক হিরো। কোয়ানটিটি নয়, বিশ্বাস করেন কোয়ালিটিতে। কেন পর্দা উপস্থিতি কম, শাবনূরের সঙ্গে শীতলতা, মৌসুমী- ঋতুপর্ণার সঙ্গে সখ্যতা, কোলকাতার বাজার, ক্যারিয়ারের উঠা-পড়া, নিজের মূল্যায়ন মন খুলে আড্ডা দিয়েছেন ‘আজ সারাবেলা’র সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জব্বার হোসেনরবিউল ইসলাম রবি

আজ সারাবেলা : এই মুহূর্তে বাংলাদেশের এক নাম্বার হিরো কে?

ফেরদৌস : অবশ্যই শাকিব খান।

আজ সারাবেলা : একটা সময় রিয়াজ, ফেরদৌস, শাকিব খান প্যারালাল পজিশনে ছিল। সেখান থেকে শাকিব খান এক নাম্বার, কিন্তু আপনি সেই পজিশনে নেই। কেন নেই, কী মনে হয় আপনার?
ফেরদৌস : আমি সবসময় কাজের কোয়ালিটি বিবেচনা করেছি। একেকজনের ক্যালকুলেশন একেক রকম। কমাশিয়াল ছবি মানেই একটু ফাইট, একটু নাচ-গান, একটু লাউড অ্যাকটিং- এসব আমি প্রচুর করেছি। একটা সময় আমি নিজেই এধরনের ছবি কমিয়ে দেই। বাণিজ্যিক মিডিয়া যেহেতু, বাণিজ্যিক রেটিং তো থাকবেই। ফলে সেদিক থেকে শাকিব অবশ্যই এগিয়ে গিয়েছে। বাট, আমি কখনই এই রেটিংয়ে ঢুকতেই চাইনি।
আজ সারাবেলা :  কোলকাতায়ও তো আপনার বাজার আগের মতো নেই।
ফেরদৌস : আপনি যে বাজারের কথা বলছেন, আমি সেই বাজারে থাকতেই চাইনি। ফলে একটু অফ ট্রেক ছবি, ভিন্ন ধাচের গল্প, এক্সপেরিমেন্টাল ছবি হলে আমার কাছে আসে লোকে। আমি দুই বাংলাতেই বেছে ছবি করছি। আমি আমার কমফোর্ট জোন নিজেই বেছে নিয়েছি। আমি ফেরদৌস, কারো সঙ্গে আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই।

আজ সারাবেলা : বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, শাবনূরের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কে শীতলতা আপনার ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে?

ফেরদৌস : আমার সেটা মনে হয় না। বরং যেটা মনে হয়, নির্মাতারা জুটির মধ্যে আটকে যায়। আমি একটা বলয়ের মধ্যে আটকে গিয়েছিলাম। শাবনূর, পপি, পূর্ণিমা, মৌসুমী। এই বলয় থেকে যদি আরো আগে বেরিয়ে আসতে পারতাম, তাহলে হয়তো আরো ইন্টারেস্টিং কেরিয়ার হতে পারতো আমার।

আজ সারাবেলা : টেলিভিশন চ্যানেলের বেশ কিছু ছবি আপনি এক সঙ্গে হাতে নিয়েছিলেন। অথচ সেই ছবিগুলোর বাজেট কম ছিল, মার্কেটিং দুর্বল ছিল। বাজারের ছবিগুলো বাদ দিয়ে এই ছবিগুলো নেয়াতে আপনার কেরিয়ার অনেকটা ‘ডাউন টু আর্থ’ হয়েছে- এমনও বলেছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।

ফেরদৌস : আমি বরাবরই আমার কমফোর্ট জোন দেখি। কাজ, কাজের পরিবেশ এসব আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেদিক বিবেচনায় আমি চ্যানেল আইয়ের পরপর অনেকগুলো ছবি হাতে নিয়েছি। আমার মনে হয় ভুল করিনি। বরং বলতে চাই, চ্যানেল আই-ই একমাত্র যারা নজরুলকে নিয়ে ছবি করেছে, শরৎচন্দ্রকে নিয়ে ছবি করেছে, হূমায়ুন আহমেদকে নিয়ে ছবি করেছে। যেটা বাংলাদেশে দ্বিতীয় আর কেউ করেনি। হয়তো তাদের বাজেট কম ছিল, মার্কেটিং স্ট্রাটেজি ঠিক ছিল না। কিন্তু আমার মনে হয় না আমি ভুল করেছি। সেই সময় সেটাই আমার জন্য ভালো সিদ্ধান্ত ছিল, বাজারের আজে বাজে ছবি করার চেয়ে।

আজ সারাবেলা : কোলকাতার ছবিতে ‘ঋতুপর্ণা’য় আটকে যাওয়া কতটা ভুল, কতটা শুদ্ধ, আপনার বিবেচনায়?

ফেরদৌস : দেখুন ঋতুপর্ণার সঙ্গে আমার স্ক্রিনের কেমেস্ট্রি অনেক ভালো মনে হয়েছে নিজের কাছে। ঋতুর সঙ্গে কাছাকাছি এক সময় অনেকগুলো ছবি হয়ে যাবার পর, আর কোন দিকে যাবার প্রয়োজন মনে করিনি। আমরা যখন ছবি করি তখন প্রতিটি ছবি একই শ্রম, মেধা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা নিয়ে করি। যখন কোনটা হিট হয়ে যায় তখন লোকে বলতে যাকে খুব ভালো অভিয়ন, খুব ভালো গল্প। আসলে মানুষের ভালো লাগা খুব বিচিত্র। কখন কাকে ভালো লাগবে, ভাল লাগবে না, এটা বলা কঠিন। সো, আমার ক্যারিয়ারকে কোন সহজ হিসেবে দেখা যাবে না। আমি দেখতে চাইও না।

আজ সারাবেলা : ‘এককাপ চা’ প্রসঙ্গে আসি। শাহরুখ খান যেখানে আলিয়া ভাট, দীপিকা পাডুকোনের মতো তরুণী নায়িকাদের নিয়ে ছবি করছে সেখানে আপনি পছন্দ করলেন মৌসুমীর মতো সিনিয়র নায়িকা। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক নায়িকা কেন? কেন পরীমনি বা নুসরাত ফারিয়া নয়?

ফেরদৌস : আমি গল্প প্রাধান্য দিয়েছি। সেদিক থেকে মৌসুমী এবং ঋতুপর্ণা। এখনও আমি যে ছবিগুলোতে কাজ করছি এমন পাঁচটার অন্তত তিনটার নায়িকাই মৌসুমী। অবশ্যই সেটি গল্পের প্রাধান্যের কারণে। আমার কখনই মনে হয় না, কাউকে সিড়ি হিসেবে ব্যবহার করবো।

আজ সারাবেলা : আমাদের এখানে নায়কের ‘পর্দা স্থায়িত্ব’ খুব স্বল্পকালীন। অন্যদিকে হলিউড বা বলিউডে অনেক বয়সেও একজন নায়ক হচ্ছেন। এটা কী আমাদের নায়কদের দুর্বলতা নাকি অন্য কোন কারণ?
ফেরদৌস : এখানে নায়ক বলতে লোকে ভাবে আমি তিনটি গানে আঠারোটা শার্ট বদলাবো, উদভট পোশাক নাচবো, টিসুম টিসুম মারামারি করবো। বাট নায়ক মানেই তো এই নয়। নায়ক হলো গল্পের নায়ক। আজকে ‘অটোগ্রাফ ’ থেকে শুরু করে ‘বাইশে শ্রাবণ,’ প্রসেনজিৎ তার মতো করে ব্যবহার করা হচ্ছে। অমিতাভ বচ্চন ‘পিংক’ করেছেন। আর হলিউডের কথা বাদই দিলাম। আমাকে যদি এখন বলা হয়, আপনি কলেজে পড়েন তাহলে তো হবে না। আমাকে আমার চরিত্রের সঙ্গে মানান সই হতে হবে।

আজ সারাবেলা : কোলকাতা অনেকবারই চেয়েছে আপনাকে নাগরিকত্ব দিতে কিন্তু আপনি সেটা নিতে চাননি কেন?
ফেরদৌস : আমি কখনই সেটা চাইনি। আমি বাংলাদেশের একটা ছেলে, ইন্ডিয়ার মার্কেটে দাপটের সঙ্গে কাজ করেছি, এখনও করছি এটাই অনেক বড় পাওয়া আমার কাছে। হয়তো যখন মুম্বাইয়ে ‘মিট্টি’ করেছি, তখন খুব কম বয়স। চেষ্টা করলে হয়তো সেখানে আরো ভালো কিছু করতে পারতাম। কিন্তু আমি সেটা চেষ্টাও করিনি। তখনও সাংবাদিকতা বিভাগের গন্ধ গা থেকে যায়নি। বিদেশে এজেন্সির মাধ্যমে সব যোগাযোগ হয়। আমি নিজেই কথা বলছি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তারপরও সবকিছু মিলিয়ে আমার মনে হয় যখন যা করেছি, মন্দ করিনি।

ferdous-pic_ajsarabela

আজ সারাবেলা : পাশের দেশেও দেখা যায়, একজন হিরো কোন একটি ছবিতে অভিনয়ের জন্য ২৫ কেজি ওজন কমিয়ে নিচ্ছেন বা বাড়িয়ে নিচ্ছেন। নিজেকে কিভাবে তৈরি করছেন। এই জায়গাটিতে আমরা কতটা প্রস্তুত বা প্রস্তুতি রয়েছে আমাদের?

ফেরদৌস : দেখুন, আমরা খুব সহজে অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা দেই। কিন্তু আর্টিস্ট পেমেটের ক্ষেত্রে এই তুলনা দেই না। কোন একটি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য যেভাবে তৈরি হবার কথা বলেলন, সেটা বাইরে হয়। সে হয়তো বছরে দুটি বা তিনটি ছবি করবে। কিন্তু আমি কি সেই পেমেন্ট পাব, যা দিয়ে সারা বছর চলতে পারবো? ফলে আমাকে অনেক কাজ করতে হয়, অনেক ধরনের কাজ করতে হয়। মডেলিং করতে হয়, ডান্স প্রোগ্রামে জাজ হতে হয়, স্টেজ শো করতে হয় এমন অনেক কিছু। আমি হিরো আমাকে তো দামি গাড়ি, দামি ফ্ল্যাট মেনটেইন করতে হয়। আদারওয়াইজ আপনারাই বলবেন, ফেরদৌস কেমন হিরো? কিন্তু পেমেন্ট দেবার সময় বলেন, কম নেন। ভালো কাজ, কম টাকায় করে দেন।

আজ সারাবেলা : তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, এখানে একজন আর্টিস্ট বা হিরো যথার্থ মূল্যায়িত হন না?

ফেরদৌস : যথার্থ তো দূরের কথা, মূল্যায়িতই হন না। আজকে ঋতুপর্ণা একটি ছবি বানালে ভারতের বিভিন্ন কোম্পানি সেখানে নিজের আগ্রহে স্পন্সর করে। কিন্তু আমাকে ছবি বানাতে হলে চৌদ্দ জনের কাছে ধর্না দিতে হয়। কেন আজকে রাজ্জাক সাহেব ছবি বানান না, ববিতা মুভিজ বন্ধ, শাবানা ম্যাডাম চলে গেছেন, আপনাদের বুঝতে হবে। একটি ছবি হিট হলে ক্রেডিট সবার, ফ্লপ হলে সকল দায় আর্টিস্টের। আপনি একই সঙ্গে আমার কাছ থেকে সোশ্যাল কমিটমেন্ট চাইবেন, কম টাকা দিবেন, ফিটনেস ঠিক রাখতে বলবেন, সিক্স পেক চাইবেন, সামাজিক আন্দোলনে অংশ নিতে বলবেন, সব এক সঙ্গে কী করে হবে? আটিস্টকে আটিস্টেও মূল্য দিতে হবে।

আজ সারাবেলা : আপনার ক্যারিয়ারের ২০ বছর পূর্ণ হলো। নিজেকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ফেরদৌস : আমার মূল্যায়ন করবে অন্যরা। ২০ বছর ধরে নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, সততার সঙ্গে কাজ করে গেছি। একজন হিরো কিন্তু চাইলেই যে কোন কিছু করতে পারে না। আমারও তো ইচ্ছে করে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতে, নিজের মতো চলতে। কিন্তু আমি সেটা করিনি। করি না, কারণ আমি হিরো। আমাকে দেখে লোকে শিখবে। আমি চারবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি। ভারতেও পেয়েছি। কিভাবে আমার মেধা, জ্ঞানকে কাজে লাগানো যাবে সেটা যেন লোকে ভাবে। আমি তো একদিনের ফেরদৌস না, ফেরদৌস হয়ে উঠেছি দীর্ঘ দিনে।

 

/আসা/সা/রবি/