bangabandhu_ajsarabela
আলী হোসেন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন কানতারা খান

‘বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি’ ধানমন্ডিতে

প্রকাশিত :০৯.০৪.২০১৭, ৭:১৩ অপরাহ্ণ

ইসলাম মোহাম্মদ রবি : ‘বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি’ শীর্ষক দেশজুড়ে, বছরজুড়ে কার্যক্রমে এবারের আয়োজন ছিল ধানমন্ডি’র আলী হোসেন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। অনুষ্ঠানে অংশ নেয় বিদ্যালয়ের প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী।

প্রতিবারের মত এবারও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- একজন রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা। মিজান তালুকদার। এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান দাবি করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ অভিজ্ঞতার নানান দিক তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, কমান্ডার জিয়া উদ্দিনের নেতৃত্বে আমরা সুন্দরবনে অবস্থান করি, মঠবাড়িয়া থানার তুষখালি ইউনিয়নের একটি পাক-হানাদার ক্যাম্পে আক্রমণ করার জন্যে। সেখানে আমরা দিনের পর দিন বেঁচে থাকার জন্যে চিংড়ি আর বিভিন্ন লতাপাতা খেয়েছি। এভাবেই পার করি দিনগুলো। একদিন রাতে কাঠ বহন করা ৩টি ট্রলারে চলে যাই তুষখালি ইউনিয়নে। এক একটি ট্রলারে ৩০ থেকে ৩৫ জন। সেখানে চারিদিকে ছিল মৃত্যু আতঙ্ক। কমান্ডারের নেতৃত্বে খুব পরিকল্পিতভাবে রাতের অন্ধকারে রাইফেল আর গ্রেনেড নিয়ে পাক ক্যাম্পে হামলা চালাই। হামলার ঠিক আগ মুহূর্তে এক রাজাকার টের পেয়ে যায় আমাদের অবস্থান। মহান আল্লাহ তায়ালার কৃপা, আমাদের অদম্য সাহস আর রণাঙ্গনের নানা কৌশলের মধ্যে দিয়ে প্রায় এক ঘণ্টার সম্মুখ যুদ্ধে আমরা দখল করতে সক্ষম হই পাকসেনা ক্যাম্প। সেখানে রাজাকারসহ ১৯ জন পাকসেনাকে পরাস্ত্র করি।

bangabandhu_ajsarabela 2

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ অভিজ্ঞতার নানান দিক তুলে ধরছেন মুক্তিযোদ্ধা মিজান তালুকদার

সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও আজ সারাবেলা’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কানতারা খান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বলতে গেলে আসলে দিন শেষ হয়ে যাবে কিন্তু বলা শেষ হবে না। এই স্কুলে তোমরা সবাই মেয়ে, তাই তোমাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই- একাত্তরে অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা তাদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। একটা বিষয় আমাদের গর্বের সঙ্গে স্মরণ করা উচিত যে, অনেক নারী মুক্তিযোদ্ধা, যারা তাদের সবকিছু দিয়ে যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার জন্য অনেক নারীরা তাদের ক্ষেতের লাউ, চাল, পোষা মুরগিসহ যা পেরেছে তাই দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্ন জুগিয়ে সহযোগিতা করেছেন। আহত যোদ্ধাদের সেবা করেছেন। এটাও কিন্তু পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে নারীদের যুদ্ধ। অনেক মা-বোন রাতের পর অত্যাচার সহ্য করেছেন, হারিয়েছেন সর্বস্ব। তোমাদের উদ্দেশ্যে একজন নারী মুক্তিযোদ্ধার ঐ সময়ের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চাই। প্রতিদিন তার উপর প্রায় ১৮ থেকে ২০ জন সারারাত ধরে অত্যাচার চালাত। আর প্রতিদিন ভোরের সূর্য উঠার পর তিনি সিদ্ধান্ত নিতেন আত্মহত্যা করবেন। কিন্তু পারতেন না। কারণ রাতভর যখন অত্যাচার চলত, তখন পাক সেনারা নিজেদের মধ্যে নানা আলোচনা করত। কোথায়, কিভাবে অ্যাটাক করবে, কাকে ধরে আনবে। তিনি শুনতেন আর ভাবতেন এই খবরগুলো যেকোনো মূল্যে মুক্তিবাহিনীকে জানাতে হবে। সেই ভাবনার কারণে আত্মহত্যা করতে পারতেন না। আর সুযোগ খুঁজতেন, মুক্তিযোদ্ধাদের খবর দেবার। সফলও হতেন তিনি। এর চেয়ে আর বড় অবদান কি হতে পারে, তোমরাই বলো?

তিনি আরো বলেন, দেশ স্বাধীনের পর অনেক বীরাঙ্গনা, যাদের পরিবার গ্রহণ করেনি, স্বামীরা গ্রহণ করেনি, তাদের আশ্রয় এবং পরিচয় নিয়ে সংকট দেখা দেয়। ঠিক তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এরা আমার সন্তান। কেউ যদি এই বীরাঙ্গনাদের পরিচয় দিতে না চায়- তাহলে ওদের বাবার নামের জায়গায় আমার নাম লিখে দাও। তিনিই ছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বলেন ৩৪ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি রবিউল আলম। তিনি তার বক্তব্যে তুলে ধরেন ’৭০-এর নির্বাচনের সময় বিশাল এক নৌকা নিয়ে ঢাকা শহরে মিছিল বের হয়, সেই নৌকায় মাঝি হিসেবে নানা সাজে সাজিয়ে বসানো হয়েছিল তাকে। মিছিলটি ঢাকার বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করে শেষে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাসভবনের সামনে এসে থামে। তখনই প্রথম বঙ্গবন্ধুকে দেখেন তিনি। আর সে সময়ের কথা বলতে বলতে তার স্বর ভারী হয়ে আছে।

bangabandhu_ajsarabela 1

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফজলুর রহমানের হাতে ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও সিআরআই থেকে প্রকাশিত তিন পর্বের কমিক নভেল ‘মুজিব’ তুলে দিচ্ছেন কানতারা খান

অনুষ্ঠান শেষে ‘আজ সারাবেলা’র পক্ষ থেকে আলী হোসেন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফজলুর রহমানের হাতে ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও সিআরআই থেকে প্রকাশিত তিন পর্বের কমিক নভেল ‘মুজিব’ তুলে দেন কানতারা খান।

‘বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি’ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ‘আজ সারাবেলা’র সম্পাদক জববার হোসেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- এই কার্যক্রমের সমন্বয়ক রবিউল ইসলাম রবি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। আয়োজিত কার্যক্রমের সার্বিক সহযোগিতায় ছিল নীলসাগর গ্রুপ ও সুচিন্তা ফাউন্ডেশন।