abu-farhad_ajsarabela
কবি আবু ফরহাদ

বাংলা নববর্ষ: সংস্কৃতির এই বিবর্তনে বাধা দেব কেন?

প্রকাশিত :১৩.০৪.২০১৭, ৭:২৬ অপরাহ্ণ

 

। আবু ফরহাদ

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস কি খুব পুরনো? যদিও চলতি নববর্ষে বাংলা সন ১৪২৪তম বছরে পদার্পন করছে, আসলে কি বাংলা নববর্ষ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো? বিষয়টি কিন্তু তা নয়। বোধকরি বাংলা নববর্ষের দিনটির যাত্রা মাত্র ৪৬১ বছর আগে। চারশত ষাট বা একষট্টি বছর খুব বেশি দিনের কথা নয় ইতিহাসের নিরিখে।

মুঘল বাদশাহ আকবর যখন বুঝলেন যে, সুবে বাঙলা বা বাঙ্গাল মুলকের খাজনা আদায়ে সমস্যা হচ্ছে, তার আমত্যরা কিংবা সুবেদার, মনসবদার বা নওয়াব, জমিদাররা খাজনা ঠিক সময় মতোন দিতে পারছেন না, তার কারণ তালাশ করতে গিয়ে তিনি বুঝলেন, হিজরী সনের নিরিখে প্রজাসাধারণ বা মূলত বাংলা মূলকের কৃষককুলের ফসল তোলার মওসুমের সমন্বয় হয় না। কৃষি পণ্যের বিক্রি না হলে কৃষকদের খাজনা প্রদান প্রায় অসম্ভব। তিনি মনে করলেন এটি সমাধানের একমাত্র উপায় কৃষকদের ফসল ওঠার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বর্ষপঞ্জিকে সাজাতে হবে। তারই সূত্রে তিনি তার সভাসদ এবং তখনকার সময়ের বিখ্যাত জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে বিষয়টি সুরাহা করার নির্দেশ দেন।

ফতেহউল্লাহ সিরাজি চিন্তা করলেন বাংলার ফসলের মওসুমকে বর্ষপঞ্জিতে কিভাবে স্থাপন করলে প্রতিবছরই একই সময়ে একই মওসুম থাকবে তার একটি বিধান বা সূত্র প্রণয়ন জরুরী। তিনি হিজরী সনের চন্দ্রবর্ষ এবং ইংরেজি সৌরসনের উপর ভিত্তি করে নতুন একটি সন পঞ্জি নির্মাণ করলেন। তাতে দেখা গেল বাংলার ঋতু চক্র, ফসলের সময় এই নতুন সন অনুযায়ী প্রতিবছর একই থাকে। বাদশাহ আকবর ফতেহউল্লাহ সিরাজির উদ্ভাবিত এই নতুন সন মেনে নিলেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ হতে নতুন এই সনের গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় বাদশাহ আকবরের সিংহাসন আরোহনের সময় কাল হতে, ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ সাল হতে।

ফসল তোলা বা ফসল কাটা এবং কৃষকদের সঙ্গেই এই নতুন সনের গণনা সম্পর্কিত বিধায় এটি ফসলী সন হিসাবে প্রথমে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে এটি এখন বাংলা সন হিসাবে দিন, ক্ষণ, গণনার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠে। বাংলার প্রজাকূলের দিল্লীর বাদশাহকে খাজনা প্রদানের বিষয়টি সহজ হয়ে যায় ফসল ওঠার সঙ্গে এই সন গণনার সম্পৃক্ততার জন্য। ফলে কৃষকগণ দ্রুত এই সন গণনায় অভ্যস্থ হয়ে ওঠে। বাংলার ব্যবসা বাণিজ্য, গার্হস্থ্য বিষয়, ধর্মকর্ম, বিয়ে শাদী ইত্যাদিও এই বাংলা সনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। যদিও বাংলা সনের ভিত্তি ছিল মুঘল হুকুমতের রাজস্ব বা আর্থিক সংস্কারকে ফলপ্রসূ করারই একটি চেষ্টা। সে উদ্যোগ পরবর্তীতে বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় বিষয়ের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। বাংলা নববর্ষ উদযাপনে কোন উৎসব ছিল কিনা সে বিষয়ে সমসাময়িক ইতিহাসে কিংবা বাংলা সাহিত্যেও তেমন উল্লেখ নেই।

মুঘল সম্রাটগণ হিজরী বর্ষ শুরুতে উৎসব করতেন। পারস্যের অনুকরণে দিল্লী, আগ্রায় নওরোজ উৎসব হতো। তবে বাংলা সনের শুরুতে সম্রাট এবং রাজপুরুষগণ মীনা বাজারে অংশ নিয়েছিলেন। মীনা বাজারের অনুকরণে জমিদার এবং নবাবগণ বিভিন্ন এলাকায় মেলার আয়োজন করতেন।

নবাব এবং জমিদারদের প্রতি সম্রাটের আদেশ ছিল চৈত্র মাসের শেষদিনের মধ্যেই পূর্বের বকেয়া সকল খাজনা আদায় করতে হবে এবং নতুন বছরের শুরুতে অর্থাৎ ১লা বৈশাখ থেকে হালখাতা বা নতুন করে হিসাব শুরু করতে হবে। জমিদার, নবাবগণ তাই বিভিন্ন এলাকায় বছরের শেষদিন পর্যন্ত খাজনা আদায়ের জন্য মেলার আয়োজন করতেন।
এইসব মেলা উপলক্ষে ব্যবসা বাণিজ্যেরও ব্যাপক প্রসার হতো। মেলায় মানুষের সকল প্রয়োজনীয় সামগ্রী সহজে পাওয়া যেত। ফলে জনগণও এই রূপ মেলার জন্য অপেক্ষা করতে থাকতো। মেলায় যেমন হতো বিনোদন তেমনি থাকতো ব্যবসা বাণিজ্যের পসরা। ফলে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এসব মেলার খবর আমরা ইতিহাস এবং লোক সাহিত্যে পাই। চৈত্র সংক্রান্তি এবং পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বর্তমান বাংলাদেশ বা পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন স্থানে এখনো মেলা একটি জনপ্রিয় আয়োজন। একসময় জমিদারদের খাজনা আদায়ের এই আয়োজনকে পুণ্যাহ বলতো। পুণ্যাহ উপলক্ষে জমিদারগণ তাদের জমিদারীতে মেলার আয়োজন করতেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে পুণ্যাহ প্রথারও বিলুপ্তি হয়। তবে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে এখনও রাজপুণ্যাহ নামে এর প্রচলন আছে।

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে মেলা আয়োজনের এই উৎসব বাংলা নববর্ষের প্রায় শুরু হতেই বাংলা অঞ্চলের সর্বত্র চালু ছিল এবং উত্তরোত্তর এই উৎসবের পরিধি বেড়েছে। আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন স্বতন্ত্র অনুচ্ছেদ এবং আলাদা বৈশিষ্ট্য। এই উৎসব বাংলার লোকজ উৎসব হিসেবেই বাংলা নববর্ষের সঙ্গে এতদিন ধরে বাংলাভাষী বিশাল অঞ্চল জুড়ে চলে আসছে।
সংস্কৃতি তো কোন ভূঁইফোড় বিষয় নয়। সংস্কৃতি সবসময় চলমান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লোকজ উৎসব বা সংস্কৃতিতে নানা বিষয় যুক্ত হতে পারে কিংবা কালপরিক্রমায় নানা বিষয় অচল হয়ে পড়তে পারে। সংস্কৃতি কোন ধর্ম নয় যে এটিতে কোন পরিবর্তন হতে পারবে না। তবে ধর্ম সংস্কৃতির উপাদান হতে পারে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১লা বৈশাখ বা নববর্ষ উপলক্ষে যে মেলা হয় তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলিখেলা (কুস্তি খেলা)। বলিখেলা চট্টগ্রাম অঞ্চলে নববর্ষের উৎসবের অংশ। চট্টগ্রাম অঞ্চলে একসময় প্রতিটি গ্রামের আনাচে কানাচে বৈশাখ মাসে বলিখেলা লেগেই থাকতো। চট্টগ্রামে ‘আব্দুল জব্বারের বলিখেলা’ এখনো চট্টগ্রাম শহরে অনুষ্ঠিত হয়। বলিখেলা এবং মেলা একসঙ্গেই চলে এবং প্রায় সপ্তাহব্যাপী এই বলিখেলা ও মেলার এই উৎসব চট্টগ্রাম অঞ্চলে বাংলা নববর্ষের একটি বৃহৎ আয়োজন।

বলিখেলার প্রচলনটি এ কারণেই হয়েছে যে, ব্রিটিশ দখলদারদের এদেশ হতে হটাতে হলে, দেশকে স্বাধীন করতে হলে মানুষের শারিরীক শক্তিমত্তারও প্রয়োজন। ফলে বলিখেলা শরীর চর্চাকে উৎসাহিত করার একটি আয়োজন মাত্র। লোকজ সংস্কৃতিতে বলিখেলার এ আয়োজনটি মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করার প্রয়াসে আমাদের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে যুক্ত হয়েছে। যা এখনো চলছে।

বাংলাদেশের কোন কোন অঞ্চলে বৈশাখী মেলা উপলক্ষে লাঠিখেলারও প্রচলন আছে। কোথাও কোথাও মোরগ লড়াই, ষাঁড়ের লড়াই এসবও যুক্ত হয়েছে। বাংলার লোকজ মেলার মধ্যে যা মূলত বাংলা নববর্ষ উপলক্ষেই আয়োজন করা হতো তাতে মল্লযুদ্ধ, কিংবা লড়াই এসব সময়ের প্রয়োজনেই যুক্ত হয়েছে।
নববর্ষ উপলক্ষে ঘরে ঘরে প্রচলন ছিল মিষ্টান্ন কিংবা ভালো খাবারের আয়োজন। তা’ছাড়া এক সময় হালখাতা জমিদার, নবাবদের খাজনা আদায়ের অঙ্গন হতে ব্যবসায়ী, মহাজনদের পাওনা আদায়ের উৎসব হিসেবেও অপরিহার্য হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানে, গদিতে ১লা বৈশাখ বা নববর্ষে শুরু করেছে হালখাতা উৎসবের প্রচলন। আগের বকেয়া হিসাব মিটিয়ে নতুন করে হিসাব শুরু। ফলে হালখাতাও বাংলা নববর্ষের উৎসবে পরিণত হয়।

ভারত বিভাগের পর সংযুক্ত বাংলার এক অংশ পূর্ব বাংলা যখন পূর্ব পাকিস্তানে পরিণত হয় তখন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা অচিরেই বুঝতে পারল যে তাদের ভাষা, স্বকীয়তা বা সংস্কৃতি হুমকির সম্মুখীন। ভাষার মর্যাদার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে সংগ্রাম,এমনকি রক্ত দিতে হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের নিজের সংস্কৃতি ও নিজস্বতাকে ধরে রাখার জন্য তাদের আরো মরিয়া হয়ে উঠতে হলো। কারণ বাঙালির যেমন নিজস্ব ভাষা আছে, তেমনি আছে নিজস্ব বর্ণমালা, যা পৃথিবীর অনেক ভাষার নেই। যেমন ইংরেজদের বর্ণমালাই নেই, তারা রোমান বর্ণমালা ব্যবহার করে। বাঙালির রয়েছে নিজস্ব বর্ষপঞ্জি, নিজেদের সন। ফলে পাকিস্তানীদের সঙ্গে নিজেদের সংস্কৃতি রক্ষা সংগ্রামে বাঙালিদের কাছে ১লা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ আরো প্রয়োজনীয় হয়ে উঠলো। তারা চাইলো শুধু বাংলা ভাষা নয়, বাংলা কবিতা, বাংলা গান, কৃষিপ্রধান বাংলার সংস্কৃতি বাঁচাতে হবে। ফলে বাংলা নববর্ষ পালনের জন্য তৈরি হল নতুন অনুষ্ঠান। এটি শুধু নাম সর্বস্ব অনুষ্ঠান নয়। এটি হলো প্রতিবাদের ভাষা।

১৯৬৫ সাল হতে ছায়ানট যখন বাংলা নববর্ষ ঘটা করে পালন করতে শুরু করে, পরবর্তীতে রমনা বটমূলে যার ব্যাপ্তি বাড়ে তা হয়ে গেলো বাঙালির প্রাণের উৎসব। সংস্কৃতি ও প্রতিবাদ একই সঙ্গে। বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি, বাংলা গানের সঙ্গে বা কৃষি প্রধান বাংলাকে, বাংলার সংস্কৃতির মূল লোকজ ধারাকে তুলে ধরার প্রত্যয়ের সঙ্গে নববর্ষ বাঙালির অঙ্গীকারের উৎসব। তাই যদি এই লোকজ উৎসবে পান্তা ভাত আসে, ইলিশ মাছ, কাঁচা লঙ্কা কিংবা পোড়া লঙ্কা আসে তাতে কি অসুবিধা? বাংলা সাল বা ফসলী সাল বা কৃষকদের সালের সঙ্গে কৃষি প্রধান বাংলাকে এই উৎসবের উপাদান করা হয় তাতে তো কোন সমস্যা থাকার কথা নয়।

সংস্কৃতির এই বিবর্তনে বাধা দেব কেন? বিবর্তন, রুপান্তর বা পরিবর্তন না থাকলে সংস্কৃতি বেগবান হবে না এবং যুগে যুগে কিংবা কালের যাত্রাপথে আমাদের সংস্কৃতির শক্তিশালী এই ধারাকে রেখে যাওয়ার জন্য বাংলা সংস্কৃতি যদি রুপান্তরের মধ্যে অতিবাহিত হয় তাতে দোষ কোথায়? আগেইতো বলেছি সংস্কৃতি কোন ধর্ম নয়- আমার যতটুকু ভালো লাগবে না তা আমি করব না। অন্যজনকে বাধা দেব কেন?

নববর্ষের উৎসব পালনের রীতি তো নতুন নয়। পারস্যের নববর্ষের ইতিহাস পনের হাজার বছরের পুরনো। ব্যবিলনে নববর্ষের উৎসব পালন করতো প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে। রোমানরা পালন করতো প্রাগ- ঐতিহাসিক কাল হতে। পৃথিবীর সকল দেশে, সকল কালেই নববর্ষের উৎসব থাকতো। আরব অঞ্চলে হিজরী নববর্ষের উৎসব পালন করে সৌদি আরবসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে। ইংরেজি নববর্ষের উৎসবতো বিশ্বজোড়াই হয়। পৃথিবীর সকল ভাষাভাষী মানুষের নববর্ষের কোন না কোন উৎসব আছে। বাংলা নববর্ষ উৎসব পালনে আমাদের নানা বিতর্ক সৃষ্টি অনভিপ্রেত।

 

লেখক: কবি ও ব্যাংক কর্মকর্তা