11111111

নতুন সংগ্রামের ডাক রমনা বটমূলে

প্রকাশিত :১৪.০৪.২০১৭, ৩:০৩ অপরাহ্ণ

সারাবেলা ডেস্ক : সমাজে সাম্প্রদায়িক অন্ধকারের নতুন সঞ্চার রুখতে বঙ্গাব্দ ১৪২৪ এর প্রথম প্রভাতে নতুন ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের’ ডাক এসেছে ঢাকার রমনা বটমূল থেকে।

বর্ষবরণে এখনকার উৎসব বেসুরো: সনজীদা খাতুন
ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুন বলেছেন, এই সংগ্রাম হবে বাঙালির আত্মপরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আর সত্য ধর্ম নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সংগ্রাম। অস্ত্র নয়, এই সংগ্রামের হাতিয়ার হবে সংস্কৃতি।

পৃথিবীর আবর্তনে প্রতিদিন যে সূর্য ওঠে, শুক্রবার তা ভিন্ন তাৎপর্য নিয়ে এসেছে বাংলাদেশে। এ সূর্য যে ভোর নিয়ে এসেছে, তাতে বাংলা পঞ্জিকায় সূচনা ঘটেছে নতুন বছরের।

চিরনতুনের ডাক দিয়ে আসা পহেলা বৈশাখ রঙ ছড়িয়েছে বাঙালির মনে। নারী-পুরুষের রঙিন সাজে, শিশুর মুখের হাসি আর বর্ণিল পোশাকে তারই প্রকাশ।

নানা আয়োজনে, নানা আঙ্গিকে সারা দেশে চলছে বর্ষবরণ। নিদাঘের ‘অগ্নিস্নানে’ শুদ্ধ হয়ে ওঠার প্রত্যাশার সঙ্গে এবার বৈশাখী আবাহনে মিশেছে প্রতিবাদের সুর।

অগ্রগতির বিপরীতে যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে উগ্রপন্থা; শুভবোধের বিপরীতে যখন শোনা যাচ্ছে সাম্প্রদায়িক হুঙ্কার, তখন বাংলার হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক শক্তিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার আহ্বান এসেছে বর্ষবরণ উৎসবে।

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজরূপা চৌধুরীর রাগালাপে রমনা বটমূলে শুরু হয় ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।
ছায়ানটের ছোট ও বড়দের দলের সম্মিলিত পরিবেশনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারা’ যেন এবারের বর্ষবরণ আয়োজনেরই মূল সুর।

এরপর শিল্পী ইফফাত আরা দেওয়ান পরিবেশন করেন রবীন্দ্রসংগীত ‘প্রভু বল বল কবে তোমার’। নজরুলের ‘ভোরের হাওয়া এলে’ গেয়ে শোনান শাহীন সামাদ।

একক সংগীত পরিবেশন করেন মহিউজ্জামান চৌধুরী, সুমন মজুমদার ও মো. সিফায়েত উল্লাহ।

সম্মিলিত গানের পর্বে বড়দের দলটি শোনায় ‘তোমার আনন্দ ওই এলো দ্বারে’, পরে ছোট ও বড়দের মিলিত দল শোনায় ‘আনন্দেরই সাগর হতে’।

ছায়ানটের সদ্যবিদায়ী সাধারণ সম্পাদক খায়রুল আনাম শাকিল মঞ্চে আসেন নজরুলের গান নিয়ে। তিনি পরিবেশন করেন ‘ধূলি পিঙ্গল’ গানটি। ‘হে মহা মৌনী’ গানটি শোনান শারমিন সাথী ইসলাম; বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী শোনান ‘সৃজন ছন্দে আনন্দে নাচো নটরাজ’।

আবৃত্তি পর্বে কবি দিলওয়ারের ‘শ্রদ্ধেয় পিতা ক্ষমা করবেন’ আবৃত্তি করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এরপর তিনি আবৃত্তি করেন অতুলপ্রসাদ সেনের ‘সবারে বাসো ভালো’।

ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা শোনান রবীন্দ্রসংগীত ‘তোমারি তরে মা’। ‘আনন্দধ্বনি জাগাও গগনে’ গানটি পরিবেশন করে ছায়ানটের বড়দের দল।
নাসিমা শাহীন ফ্যান্সি শোনান নজরুলের গান ‘এ কী অপরূপ রূপে মা তোমায়’। ফারহানা আক্তার শ্যালি শোনান ‘তোমার বুকে আমি’।

দুটি সম্মিলিত গানের পর আবার আবৃত্তি পর্ব; সৈয়দ হাসান ইমাম শোনান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ধর্ম মোহ’ ও কাজী নজরুলের ‘সাম্যবাদী’।

বড়দের দলের সম্মিলিত গানের পরে চন্দনা মজুমদার শোনান ‘বোধ মনেরে আর’। বিমান চন্দ্র বিশ্বাস শোনান ভব পাগলার গান ‘বারে বারে আর আসা হবে না’।

‘আমি টাকডুম টাকডুম বাজাই’ গানটি পরিবেশন করে ছায়ানটের ক্ষুদেদের দল।

বিগত বছরগুলোর মতো এবারও অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার। কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশনও পুরো অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করে।

সব মিলিয়ে ঘণ্টা দুয়েকের গান ও পাঠাবৃত্তির সজ্জা শেষ হয় জাতীয় সংগীতে।

ছায়ানটের অনুষ্ঠানের ঐতিহ্য অনুসারে জাতীয় সংগীতের আগে শুভেচ্ছা কথন নিয়ে আসেন সভাপতি সনজীদা খাতুন।
বক্তব্যের শুরুতেই সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ এবং উপলব্ধির কথা তিনি তুলে ধরেন। বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে ‘মিশ্র অনুভূতি’ তৈ্রি হয়েছে।

সনজীদা খাতুন বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ধর্মীয় সন্ত্রাস দমনে সাফল্য এবং দেশের নানা উন্নয়ন মানুষের মনে শক্তি এনেছে। কিন্তু ধর্ম ব্যবসায়ীদের সন্ত্রাস সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি। ফলে জাতি নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকে মুক্ত হতে পারেনি।

“পাঠ্যপুস্তকের বিষয় নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক বিবেচনা আর ভাস্কর্যকে ‘মূর্তি’ আখ্যা দিয়ে সেগুলো ভেঙে ফেলবার হুমকি (এসেছে)। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য আমাদের নিজেদের কাজ করবার আছে।”

পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাঙালির রাজনৈতিক যুদ্ধের সেইসব দিনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ১৯৬১ থেকে ১৯৬৭ হয়ে এ পর্যন্ত ছায়ানট এবং এ দেশের সাংস্কৃতিক কর্মীরা বাঙালি সংস্কৃতির গঠনমূলক কাজে নিরত আছেন। মিছিলে নয়, স্লোগানে নয়, নানাভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে চান তারা।

তবে ইন্টারনেট আর বিশ্বায়নের এই যুগে সেই চেষ্টার ধরনে যে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, সেই উপলব্ধির কথাও বলেন ৮৫ বছর পেরিয়ে আসা এই শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মী।

নতুন প্রজন্ম এখন খুব বেশি করে ইন্টারনেটমুখী। বিশ্বায়ন চলছে। ভেবে দেখা গেল, এই বিশ্বায়নের ব্যাপারটিতে আমরা কেন পিছিয়ে আছি? আমরা কেন ইন্টারনেটে যাই না? আমরা কেন বাঙালির শ্রেষ্ঠ যে সমস্ত নিদর্শন সংস্কৃতির, সেগুলোকে এখানে দিই না? এগুলো দিতে হবে আমাদের।

“আমি শুধু ছায়ানাটের কথা বলছি না, সমস্ত সাংস্কৃতিক কর্মীদের, সমস্ত সাংস্কৃতিক সংগঠককে বলছি, তাদের যা কিছু ভালো জিনিস, সেগুলো তারা দিন ইন্টারনেটে। তাতে যা হবে, আমাদের সন্তানরা সব কিছুর নিদর্শন দেখবে। তাতে যেটা সুবিধা হবে, তারা জানবে, বাঙালিরও কিছু দেখাবার মত জিনিস আছে।”

সনজীদা খাতুন সাংস্কৃতিক কর্মীদের নগরকেন্দ্রিক ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংস্কৃতির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান। গান দিয়ে, আবৃত্তি দিয়ে, নাটক দিয়ে বাংলাদেশের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বাঙালিত্বের বোধ, দেশপ্রেম এবং সত্য ধর্মের পরিচয়’ সবার কাছে তুলে ধরতে বলেন।
“সবাই মিলে যেন আমরা যেতে পারি সাধারণ মানুষের কাছে। কারণ, আপনি আমি আলোকিত হলে দেশে আলোকিত হবে না। সমগ্র দেতশকে জাগাতে হলে, তাদের প্রাণে স্বাধীনাতর বোধকে জাগিয়ে দিতে হলে আমাদের সবার উচিৎ সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়া। এই কথাটি বহুদিন আমরা ঠিক উপলব্ধি করতে পারিনি, এটা করতে হবে।”

ছায়ানট সভাপতি বলেন, “আমরা এ কথা বুঝি, যে আমাদের নতুন করে স্বাধীনতা সংগ্রাম করবার সময় এসেছে । আমরা যেন স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি আবার। অস্ত্র দিয়ে নয়, সংস্কৃতি নিয়ে।”

তিনি বলেন, গ্রামের দরিদ্র মানুষকে অর্থ দিয়ে কিনছেন ধর্ম ব্যবসায়ীরা। সাংস্কৃতিক কর্মীদের সেই অর্থ নেই। কিন্তু তারা মন দিয়ে, সংস্কৃতি দিয়ে, মনের সৌন্দর্য দিয়ে মানুষকে স্পর্শ করবার চেষ্টা করতে পারেন। আর এখন তা খুব জরুরি।

“আমি এই ১৪২৪ সালের নববর্ষে সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, আসুন আমরা সবাই, নতুন স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রবৃত্ত হই।

“সে সংগ্রাম সাধারণ মানুষের সাথে মিলবার সংগ্রাম। এই মিলবার চেষ্টাটাই এ বছরে আমাদের সবচেয়ে বড় কথা।”

সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে সনজীদা খাতুন বলেন, “আসুন আমরা এক হই। আমরা দেশের জন্য সত্যিকারের কিছু কাজ করি।”

তার বক্তব্যের পর সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় রমনা বটমূলে।

ছায়ানটের ৫০ বছর পূর্তির বিশেষ আয়োজনের অংশ হিসেবে পরে পরিবেশন করা হয় দিলু বয়াতি ও তার দলের পালাগান ‘দিওয়ানা মদিনা’।