বক্তব্য রাখছেন কোচ ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক শফিকুল ইসলাম মানিক। ছবি: আজ সারাবেলা
বক্তব্য রাখছেন কোচ ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক শফিকুল ইসলাম মানিক। ছবি: আজ সারাবেলা

‘বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনি মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি’ এবার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে

প্রকাশিত :২৩.০৪.২০১৭, ৩:৩২ অপরাহ্ণ

ইসলাম মোহাম্মদ রবি : দেশজুড়ে, বছরজুড়ে ‘বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি’ শীর্ষক কার্যক্রমের এবারের আয়োজন ছিল মিরপুরের ডারল্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে।

অনলাইন নিউজপোর্টাল ‘আজ সারাবেলা’ ও সুচিন্তা ফাউন্ডেশন আয়োজিত অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুদ মাহমুদ খান, যুদ্ধ করেছেন ৯নং সেক্টরে। শিক্ষকতা করেছেন ৩৩ বছর। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে শেল’র বিকট শব্দে শ্রবণশক্তি হারান তিনি। সঞ্চালক হাতে মাইক তুলে দেবার পর, প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থীর সম্মুখে বলতে শুরু করেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা।
তিনি বলেন, ৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে ঢাকার রাজারবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানান জায়গায় যখন পাকিস্থানী হানাদারদের নৃশংস হামলার খবর জানতে পারি, তখন থেকেই একধরনের প্রতিশোধের উত্তেজনা কাজ করতে থাকে মনের মধ্যে। এর আগের বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ থেকেই এ উত্তেজনা দানা বাঁধে। তখন আমি কলেজের ছাত্র। প্রতিহত করার মত কোন অস্ত্র ছিল না তখন। কয়েকজন মিলে যোগাযোগ করি আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে। তারা জানান, কিছু রাইফেল আছে। সংগ্রহ করি ৩৫০টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল। পুলিশ এবং আর্মিদের কাছ থেকে কোনরকম রপ্ত করি রাইফেল চালানো। যশোরের ভোমরা বর্ডারের কাস্টম অফিসে ক্যাপ করি আমরা, সেখান থেকে চলে যাই ভারতের হোসাডাঙ্গা এলাকার একটি আম বাগানে। ইপিআর, আর্মিরা ট্রেনিং দেয় আমাদের। ক্যাম্পের তাবুতে, রাত তখন আড়াইটা, ট্রাকে উঠলাম ভোমরা বর্ডার বেড়িবাঁধের কাছে নামলাম, সময় তখন রাত ৩টা। খবর পেলাম সাতক্ষীরা থেকে পাকবাহিনী আসছে বাঙ্কারের ভেতর দিয়ে আমাদের ধরে নিয়ে যাবার জন্যে। খালের পাড় ঘেষে বেশ খানিকটা এগিয়ে এসেছে। শব্দ পেয়ে সতর্ক হয়ে গেলাম, গুলি চালাতে শুরু করলাম রাইফেল আর মেশিনগান দিয়ে- এপারে আমরা ওপারে পাকবাহিনী।

বক্তব্য রাখছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুদ মাহমুদ খান। ছবি: আজ সারাবেলা

বক্তব্য রাখছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুদ মাহমুদ খান। ছবি: আজ সারাবেলা

মুক্তিযোদ্ধা আরো বলেন, ইয়া আলী বলে হুঙ্কার দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে এসে গুলি করতে লাগল, সে সময় বেশ কয়েকজন পাক সেনাকে আমরা হত্যা করি। গুলি লেগে এক পাক সেনা বাঁধের উপর থেকে গড়িয়ে পড়ে। আমাদের মধ্য থেকে একজন হঠাৎ করে ঐ পাক সেনার লাশ আনার জন্য এগিয়ে যায়, কিন্তু লাশের কাছাকাছি যাবার পর পাক সেনাদের ছোড়া গুলিতে আহত হয় সেই মুক্তিযোদ্ধা, ওর নাম ছিল নাজমুল। তারপর ঐ অবস্থায় পাক সেনার লাশ নিয়ে আমাদের কাছে চলে আসে নাজমুল। কিন্তু আর বেশি সময় জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে পারেনি নাজমুল। নাজমুল শহিদ হয়। সারাদিন যুদ্ধ চলে, আমাদের এক পর্যায়ে গুলি শেষ হয়ে যায়। বিকাল তখন ৫টা। কমান্ডারের নির্দেশে পিছু হটে এসে একটি জিপ গাড়িতে করে শহিদ নাজমুল আর পাক সেনার লাশ নিয়ে ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা হই। ন্যাম প্লেট দেখে জানতে পারি তার নাম ছিল ক্যাপ্টেন এজাজ। তখন ক্যাম্পের পথে হাজার হাজার মানুষ আমাদের দেখে জয় বাংলা শ্লোগান দিতে থাকে। সকলে মিলে দাফন করি নাজমুলকে। পাক সেনার লাশটি পাঠিয়ে দেয়া হয় কলকাতায়। এভাবেই চলতে থাকে নয় মাসের যুদ্ধ। বলতে বলতে গলা ধরে আসে মুক্তিযোদ্ধা মাসুদ মাহমুদ খানের।
অনুষ্ঠানের আরেক আকর্ষণ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ও কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক। ঢাকার শুক্রাবাদে জন্ম ও বেড়ে উঠার কারণে বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় তার। ৩২ নম্বরের লেকে মাছ ধরতে গিয়ে অতি সাধারণ এক প্রেসিডেন্টকে দেখার দুর্লভ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন শিক্ষার্থীদের মাঝে। বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর সন্তান বলে আখ্যায়িত করেন এই কোচ ও সাবেক খেলোয়াড়।

ajsarabela

বক্তব্য রাখছেন ডারল্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রিন্সিপাল মির্জা মেহেদী হাসান। ছবি: আজ সারাবেলা

অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য রাখেন- ডারল্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রিন্সিপাল মির্জা মেহেদী হাসান। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘তিন-ব’ অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও বাঙালি। এই ‘তিন-ব’কে বিশ্বাস করে বুকে ধারণ করতে হবে। বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়ে গেছেন তা আজ বাস্তবতা।
শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার জন্যে বই পড়ার অনুরোধ করেন প্রিন্সিপাল মির্জা মেহেদী হাসান।

‘বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি’ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ‘আজ সারাবেলা’র সম্পাদক জববার হোসেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- এই কার্যক্রমের সমন্বয়ক রবিউল ইসলাম রবি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। আয়োজিত কার্যক্রমের সার্বিক সহযোগিতায় ছিল নীলসাগর গ্রুপ।