মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন
মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন

বর্ণচোরা পাকিস্তানি দালালরা এখনও সক্রিয়!

প্রকাশিত :০৩.০৫.২০১৭, ৫:০৮ অপরাহ্ণ

। মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন

ভাগ্যবানের বোঝা ভগবান বয় বাক্যটি কত যে সত্য তা পর্যালোচনা করলে খুব সহজেই উপলব্ধি করতে পারব। স্বাধীনতাবিরোধীরা কত শক্তিশালী এবং ক্ষমতাধর সেটা জেনে আমার বয়সের সাধারণ পাঠক, যারা ষাটের দশকে রাজশাহীতে ছাত্র রাজনীতি করত তারা হয়ত একটু অবাক হবেন কিংবা খানিকটা বিস্মিত হয়ে অতীত স্মরণ করতে চেষ্টা করবেন। অনেকে স্বগত উচ্চারণ করে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করবেন- ‘তাইতো, তাইতো এটা কেমন করে সম্ভব হল?’ হয়ত বেদনাহত হয়ে একটু আফসোসও করবেন। আর তরুণ যারা, যাদের ‘ইয়াং জেনারেশন’ বলা হয়, তাদের মনে দাগ কাটলেও কাটতে পারে।

আমরা যারা তখন ছাত্র রাজনীতি করতাম, যারা বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধ করেছি, যাদের পরিবারের দু’চারজন সদস্য মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, যারা জাতির পিতার সাহায্য-সমবেদনা ছাড়া কোন সরকারের পক্ষ থেকেই সাহায্য তো দূরে থাক কোন সমবেদনাও পাননি, আমরা সেইসব শহীদ পরিবারের সদস্যরা এ বেদনা ভুলি কেমন করে?

হ্যাঁ বলছিলাম অধ্যাপক ‘আতফুল হাই শিবলি’র কথা। বাবা প্রফেসর আব্দুল হাই ছিলেন আইয়ুব-মুনায়েম খানের দালাল। কট্টর স্বাধীনতাবিরোধী, পাকিস্তানে বিশ্বাসী। ষাটের দশকের প্রথম দিকে বাংলার মানুষ যখন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে তখন বাংলাদেশ বিরোধী প্রফেসর আব্দুল হাইকে রাজশাহী কলেজের প্রিন্সিপাল করে পাঠানো হয়। কলেজে যোগদান করে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নকে মোকাবেলা করার জন্য সরকারি টাকায় আইয়ুব-মোনায়েম খানের এই দালাল প্রফেসর আব্দুল হাই একটি দালাল ছাত্র সংগঠন ‘এন.এস.এফ’ অর্থাৎ ‘ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফেডারেশন’ গঠন করেন। যার নেতৃত্বে ছিলেন- কাজী হাটার জাফর ইমাম (জেনারেল এরশাদের আমলে ডাকসাইটে ক্রীড়া সংগঠক), দরগা পাড়ার মতিন খান-শাকুর খান দুই ভাই, হেতেম খান এর আফতাব উদ্দিন মৃধা (প্রয়াত খোদাবক্স মৃধার বড় ভাই, পরে রাজশাহী বিশ্ব বিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক), নুরুন্নবি চাদ, আনফর, মতিন (পরে আনফর ছাত্রলীগের সমর্থক) হেতেম খানের এ.কে.এম.হাসানুজ্জামান (পরে সরকারি কলেজে বাংলার অধ্যাপক) এবং দালাল প্রিন্সিপাল আব্দুল হাই এর জ্যেষ্ঠ পুত্র আতফুল হাই শিবলি, ১৯৬৬ সালের পর থেকে এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক (স্বাধীনতার পর স্বল্পকালীন ঢাকার বনানীতে আত্মগোপনে থেকে সুযোগ সুবিধা বুঝে নতুন ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর মাজহারুল ইসলামের সময় খুবই সন্তর্পণে চাকরিতে ফিরে এসে স্বাধীনতার পক্ষের শিক্ষকদের সঙ্গে মিশে গিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থক (খুবই নগণ্য) শিক্ষকদের সহযোগিতায় নিজ অবস্থান নিষ্কণ্টক করতে সমর্থ হয়। পরে জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ এবং বেগম খালেদা জিয়ার আমলে স্বভাবতই বাধাহীনভাবে, দাপটের সঙ্গে নির্বিঘ্নে চাকরি করে সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়য়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অর্থাৎ এই স্বাধীন দেশে একজন স্বাধীনতাবিরোধী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সর্বোচ্চ পদটি দখল করার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। আরও অবাক হবার মত ব্যাপার হলো, কোন এক অদৃশ্য যাদুর কাঠির ছোঁয়ায় স্বাধীনতাবিরোধী আব্দুল হাই এর জ্যেষ্ঠ পুত্র পাকিস্তানপন্থী এনএসএফ নেতা আতফুল হাই শিবলি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার আমলেই তার দপ্তরের অধীন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান পদে একবার নয় দু’দুবার অর্থাৎ আট বছরের বেশি সময় আসিন থেকে রাজত্ব করে গেলেন।

আমি নিশ্চিত বঙ্গবন্ধু কন্যা, এই বর্ণচোরা পাকিস্তানি দালালকে চিনতেন না। শুনছি তিনি নাকি এখন সিলেটে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হয়ে নিজের জেলায় ফিরে গেছেন। অর্থাৎ এই স্বাধীনতাবিরোধীদের অবসর নাই। রাজশাহী কলেজে এই এনএসএফ ক্যাডাররা রাম রাজত্ব কায়েম করেছিল। এরা প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন, ছাত্র ইউনিয়ন এবং ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের উপর হকিস্টিক নিয়ে আক্রমণ করত, নির্দয়ভাবে পেটাত। প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন গুলির নেতাকর্মীরা প্রায় সকলেই ছিল রাজশাহী শহরের বাইরের। যাদের বেশির ভাগ হোস্টেলে থাকত আর কিছু পরিচিতজন বা আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে লজিং থাকত। প্রায় রাতে হোস্টেলে আক্রমণ করে বাইরে থেকে লেখাপড়া করতে আসা ছেলেদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করত। স্থানীয়রা, বিশেষ করে কলেজ সংলগ্ন দরগাপাড়া, পাঠানপাড়া এবং হেতেম খানের মানুষ সে সময় খুববেশি একটা কলেজে পড়ালেখা করার কথা ভাবত না। এদের বেশিরভাগ সাহেব বাজারে ছোটখাটো ব্যবসায়ী ছিল।

দরগাপাড়া কসাইপাড়া নামে খ্যাত ছিল। এদের অধিকাংশ সাহেব বাজারে গরু-ছাগলের মাংস বিক্রি করত। এরা চাকু-ছুরি চালাতেও পটুছিল। রাজশাহী কলেজের আশপাশের বেশির ভাগ মানুষ পাকিস্তানপন্থী হওয়ায় ‘এনএসএফ’ এর দৌরাত্ম্য ছিল অনেক বেশি। স্বাধীনতাবিরোধী আব্দুল হাই প্রিন্সিপাল অনৈতিকভাবে এই গুন্ডা-পান্ডাদের পেছনে কাঁড়ি কাঁড়ি সরকারি অর্থ খরচ করত। ছাত্রলীগ কিংবা ছাত্র ইউনিয়ন করে এমন পরিচিত নেতাকর্মী কলেজ ক্যাম্পাসে এসে অক্ষত ফিরে যেতে পারেনি। মনে আছে ১৯৬৭ সালের ১৭ আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা বন্ধুবর রুহুল আমিন প্রামানিককে হাই সাহেবের গুন্ডারা মারতে মারতে অর্ধমৃত অবস্থায় পৌরসভার সামনের রাস্তায় ফেলে রেখেছিল। রুহুল আমিনকে সাধারণ মানুষ হাসপাতালে নিয়ে জীবন বাঁচায়।বর্তমান শহর আ.লীগ নেতা, শফিকুর রহমান বাদশা ৬৬ সালে ছিল এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র। কেবল ভর্তি হয়েছে। ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠন করার দায়ে বাদশাকে ‘ফোরস টিসি’ দিয়ে কলেজ থেকে বিদায় করা হয়। ৭০ সালের শেষ দিকে রাজশাহী ছেড়ে ঢাকার বনানীতে তার নিজের বাড়িতে কিছুটা আত্মগোপনে ছিলেন প্রফেসর আব্দুল হাই। তখন প্রফেসর হাই এর ছোট তিন ছেলে (এদের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকায় পড়ত। বনানীর বাড়ির সাড়ে সাত কাঠা জায়গা মোনায়েম খান প্রিন্সিপাল হাই সাহেবকে গিফট করেছিলেন বলে আমরা তখন শুনেছি। শুধু ডিআইটি থেকে রেজিস্ট্রি করে নেবার খরচটা তার লেগেছিল।

বঙ্গবন্ধুর এই দেশে এই রক্ত চোষারা, এই বর্ণচোরারা, যারা সত্যি সত্যি বঙ্গবন্ধুকে কোনদিন সম্মান করেনি, ৩০ লাখ শহীদের প্রতি সম্মান দেখায়নি, দু’লাখ নির্যাতিত মা-বোনদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেনি, তারা কেমন করে এত সহজেই এত গুরুত্বপূর্ণ পদে আসিন থেকে নির্বিঘ্নে চাকরি করে গেল। কে জানে একদিন হয়ত দেখব এই স্বাধীনতাবিরোধীরা দেশের সর্বোচ্চ পদক ‘স্বাধীনতা পদক’ বঙ্গবন্ধু কন্যার হাত থেকে গ্রহণ করছে। কারণ তিনি তো এদের অনেককেই চেনেন না। আর যারা চেনেন তারা যে চেপে যাবেন, তা এক্ষেত্রে নিয়মিত ছাত্র রাজনীতি করা নেতা বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের চেপে যাওয়া থেকে অনুমান করা যায়। তার চেপে যাওয়ার কারণ এও হতে পারে তিনি সিলহটি। কিন্তু এক সময়ের সাহসী ছাত্র নেত্রী, অগ্নিকন্যা নামে পরিচিত বেগম মতিয়া চৌধুরী এবং রাশেদ খান মেনন কেন চেপে গেছেন বোধগম্য নয়। এরা তো ছাত্র রাজনীতি করতে গোটা দেশ চষে বেড়িয়েছেন। তবে কী মন্ত্রিত্ব হারাবার ভয় ছিল? এদের কথা বাদ দিলেও রাজশাহীর স্থানীয় পর্যায়ের নেতা জিনাতুন্নেসা তালুকদার, নুরুল ইসলাম ঠানডু, কিংবা মাহবুব জামান ভুলু, মুখে কুলুপ এঁটে বসে ছিলেন কেন তা আমাদের বিস্মিত করে বৈকি। অবশ্য গোলাম আরিফ টিপু ভাই বয়সের ভারে কিছুটা স্মৃতিভ্রষ্ট, নইলে তো প্রশ্ন তোলার কথা।

এনএসএফ এর দোলন গ্রুপ ঢাকায় জনাব তোফায়েল আহমেদ এর নিকট আত্মসমর্পণ করে ছাত্রলীগে যোগদানের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ঢাকাতেও ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়ন কম মার খায়নি আইয়ুব-মোনায়েমের এই গু-াদের হাতে। আমি নিশ্চিত আমাদের জাতির পিতা, সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান আমাদের মাঝে আজ বেঁচে থাকলে এইসব দালাল কোনদিনই সরকারের উচ্চপদে আসিন হতে পারত না। কারণ বঙ্গবন্ধু এদের সবাইকে হাড়ে হাড়ে চিনতেন। এদের ইন্ধনে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন, আব্দুস সালাম অ্যাডভোকেট (বঙ্গবন্ধু রাজশাহী গিয়ে যার বাসায় খেতেন) এর দুই কলেজ পড়ুয়া ছেলেকে ২৫ শে মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানের হায়েনা বাহিনী তুলে নিয়ে হত্যা করে। সালাম ভাই বেঁচে যান, কারণ তিনি ২৫ শে মার্চ ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে রাজশাহী ফিরতে পারেননি। আমি নিশ্চিত বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে দৈহিকভাবে উপস্থিত থাকলে আজও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের যে সব পরিবার অবহেলিত, তাদের খুঁজে বের করে সাহায্য সহযোগিতা করতেন, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করতেন। স্বাধীন এই দেশে, স্বাধীনতা বিরোধীদের স্থান আরও সঙ্কুচিত হতো, এতে কোনই সন্দেহ নাই।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা এবং সাবেক পরিচালক বাংলাদেশ বেতার।