অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন মুক্তিযোদ্ধা ও কুমিল্লা- ৬ আসনের সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিন

‘বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি’ হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে

প্রকাশিত :০৮.০৫.২০১৭, ৭:৫৫ অপরাহ্ণ

ইসলাম মোহাম্মদ রবি : কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকীতে দেশজুড়ে, বছরজুড়ে ‘বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি’ কার্যক্রমের এবারের আয়োজন ছিল মুন্সিগঞ্জের হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনুষ্ঠানে অংশ নেয় কলেজের প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী।

আজ সারাবেলা ও সুচিন্তা ফাউন্ডেশন আয়োজিত অনুষ্ঠানের মঞ্চ আলোকিত করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কুমিল্লা- ৬ আসনের সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিন। কার্যক্রমের প্রসংশা করে এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, আপনারা মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনতে চান, আমি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা বলতে চাই। যার জন্যেই আপনারা স্বাধীন দেশে বসবাস করতে পারছেন, পারছেন মত প্রকাশ করতে, শিক্ষার্জন করতে। তিতুমীর, মাস্টার দ্যা সূর্যসেন অনেক বড় নেতা ছিলেন। নেতাজী সুবাষ বসু বলেছিলেন, তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব। আর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। তিনি এদেশের বাঙালিদের মুক্ত করেছেন, দিয়েছেন একটি স্বাধীন দেশ, বাংলাদেশ।

তিনি আরো বলেন, তখন ছাত্র রাজনীতি করতাম, বঙ্গবন্ধুর কর্মী ছিলাম। ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। সেই থেকে শ্লোগানে শ্লোগানে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল জাতি। পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো, ঢাকা না পিন্ডি? ঢাকা ঢাকা। ঝাঁপিয়ে পড়লাম মুক্তিযুদ্ধে। কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমারসহ সমগ্র জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেই সময়। পাকবাহিনীর নিষ্ঠুর অত্যাচার মনে পড়লে এখনো গা শিউড়ে উঠে। বাহ্মণবাড়িয়ার এক পাকিস্তানী ক্যাম্পে আমরা আক্রমণ চালিয়ে ৫২ জন নারীকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলাম। নির্যাতনের জন্যে রাজাকারদের সহায়তায় ধরে আনা হত যুবতী নারীদের। ৩০ লাখ শহিদের জীবনের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীন। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ, প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার জীবন দিতে হয়েছে। বিশ্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে এতো বেশি আত্মত্যাগ কোন জাতিকে করতে হয়নি।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন, স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা হয়েছিল। আমরা যুদ্ধ করেছি সরকারের অধীনে থেকে। যে সরকারের প্রধান ছিল শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী ছিল তাজউদ্দিন আহমেদ আর সেনা নায়ক ছিল এম এ জি ওসমানী। সেই মুজিবনগর সরকারের অধীনে ১১টি সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল।

‘বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন কানতারা খান

‘বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন কানতারা খান

অনুষ্ঠানে সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও আজ সারাবেলা’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কানতারা খান বলেন, ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ২১শে ফেব্রæয়ারির আমাদের ভাইদের তাজা রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলা ভাষা পেয়েছি। আজ সারা বিশ্বে গর্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে বলতে পারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হয়েছে আমাদের জন্যে, বাংলাদেশিদের জন্যে। সারা পৃথিবীর মানুষ আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে। নানা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ৬৬’র ৬’দফা ও ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান ৭০’র নির্বাচন ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ তারপর আমাদের বিজয়।

আর এই বিজয়ের মহানায়কের জন্ম হয় ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গী পাড়ায়। ছোটবেলা থেকেই অতন্ত্য বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারী ছিলেন খোকা। বঙ্গবন্ধুর ডাক নাম ছিল খোকা। গরিব দুঃখী, অসহায়দের পাশে থেকেছেন, আন্দোলন সংগ্রামে এগিয়ে ছিল স্কুল জীবন থেকেই। সে সময় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক টুঙ্গিপাড়ার মিশনারী স্কুল পরিদর্শনে যান, ঐ স্কুলে পড়তেন শেখ মুজিবুর রহমান। ছোট্ট খোকা তার স্কুলে আসা ফজলুল হক’কে সবার সামনে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার স্কুলের ছাদ ভাঙ্গা এটি মেরামত করা প্রয়োজন এ ব্যাপারে আপনি ব্যবস্থা নিন’। এ থেকেই বোঝা যায় বঙ্গবন্ধু ছোটবেলা থেকেই সৎ সাহসী, ছিলেন অধিকার আদায়ে সোচ্চার’। শুধু নিজের নয়, পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের জন্যে নানা আন্দোলন সংগ্রামে তাকে প্রায় ১৪ বছর জেলখানায় কাটাতে হয়েছে। তারপরও তাকে দমাতে পারেনি তৎকালীন পকিস্তান সরকার, এনে দিয়েছেন স্বাধীনতা, মুক্ত করেছেন বাঙালিদের পরাধীনতার গ্লানী থেকে।

তিনি আরো বলেন, দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু যখন বাংলাদেশে ফিরবেন তখন লন্ডন, দিল্লী হয়ে দেশে ফিরতে হয়েছিল। সে সময় ঢাকার ফ্লাইট ছিল না। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ্’র বাসভবন টেন ডাউনিং স্ট্রিটে কোন অতিথি গেলে তার গাড়ির দরজা খুলে দেবে একজন সেনা কর্মকর্তা, প্রধানমন্ত্রী করমর্দন করে স্বাগত জানিয়ে ভিতরে নিয়ে যাবেন, কোন সাংবাদিক ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না- এটাই রীতি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যখন এডওয়ার্ড হিথ্’র সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তার বাসভবনে যান, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নিজে বঙ্গবন্ধুর গাড়ির দরজা খুলে স্বাগত জানিয়ে তাকে ভেতওে নিয়ে যান। বিষয়টি ব্রিটিশরা ভালোভাবে নিতে পারেনি তখন। পরবর্তীতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সমালোচনার ঝড় উঠে- প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশদের সম্মানহানী করেছেন। পরে প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ্ পার্লামেন্টে বলেন, ‘আমি ব্রিটিশদের অসম্মানিত করিনি বরং সম্মানিত করেছি। যিনি স্বপ্ন দেখেন এবং তা পূরণ করে দেখিয়েছেন। একটি জাতির স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। আমি সম্মান দেখিয়েছি তার কর্ম ও নেতৃত্বকে।’ পরে সবার ভুল ভাঙে।
বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে যেকোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইন্টারনেট ব্যবহার এবং মনযোগী হয়ে বই পরার অভ্যাস গড়ে তোলার আহবান জানান কানতারা খান।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে শির্ক্ষাথীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন- হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক মো. আব্দুল মান্নান এবং অধ্যাপক ড. এমরান চৌধুরী, প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক মো. আব্দুল মান্নানের হাতে ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও সিআরআই থেকে প্রকাশিত তিন পর্বের কমিক নভেল ‘মুজিব’ তুলে দিচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম বাহাউদ্দিন ও কানতারা খান

ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক মো. আব্দুল মান্নানের হাতে ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও সিআরআই থেকে প্রকাশিত তিন পর্বের কমিক নভেল ‘মুজিব’ তুলে দিচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম বাহাউদ্দিন ও কানতারা খান

অনুষ্ঠান শেষে ‘আজ সারাবেলা’র পক্ষ থেকে হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক মো. আব্দুল মান্নানের হাতে ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও সিআরআই থেকে প্রকাশিত তিন পর্বের কমিক নভেল ‘মুজিব’ তুলে দেন মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম বাহাউদ্দিন ও কানতারা খান।

‘বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি’ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ‘আজ সারাবেলা’র সম্পাদক জববার হোসেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার লুৎফর রহমান, হামদর্দ বাংলাদেশের ডিরেক্টর কাজী মনসুরুল হক ও এই কার্যক্রমের সমন্বয়ক রবিউল ইসলাম রবি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। আয়োজিত কার্যক্রমের সার্বিক সহযোগিতায় ছিল নীলসাগর গ্রুপ।