আর কত জ্বলবে ইটের ভাটা!

প্রকাশিত :২১.০৫.২০১৭, ৩:০৮ অপরাহ্ণ

আমানুল্লাহ নোমান

 

শিল্পায়নের ফলে দেশে ইটের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই ইটের প্রচুর চাহিদা। নির্মাণ শিল্পের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ইটের চাহিদাও বেড়ে চলছে।

সেই সাথে বেড়ে চলছে ইটভাটা। ইটভাটাগুলো অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় আমাদের পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ইটভাটায় ইট তৈরিতে আমরা বহুমুখী

সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। প্রথমত আমরা কৃষি জমি হারাচ্ছি। দ্বিতীয়ত আমরা উর্বর মাটি হারাচ্ছি।
সরকারি হিসাবমতে, সারাদেশে বর্তমানে ৭০০০ হাজারের অধিক ইটভাটা রয়েছে, যেখানে ইট প্রস্তুতের জন্য কমপক্ষে ১২৭ কোটি সিএফটি মাটির প্রয়োজন হয়।

এই মাটির বেশিরভাগই ভূ-পৃষ্ঠের উপরিভাগ অর্থাৎ কৃষি জমির ‘টপ সয়েল’ থেকে উত্তোলন করা হয়ে থাকে। এমনিতেই বর্তমানে অপরিকল্পিত কৃষি কাজের জন্য

মাটির গুণাগুণ দিনে দিনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মাটির স্বাস্থ্য আজ হুমকির সম্মুখীন। কৃষি কাজের উপযোগী একটি আদর্শ মাটিতে শতকরা ৫ ভাগ

জৈব পদার্থের উপস্থিতি থাকার কথা। কিন্তু আমাদের দেশের বেশিরভাগ মাটিতে এর পরিমাণ স্থানভেদে গড়ে শতকরা একভাগেরও কম রয়েছে। আর এ জৈব পদার্থই

ফসল উৎপাদনের পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে থাকে। জৈব পদার্থের এ পরিমাণ শুধুমাত্র মাটির উপরাংশে বিদ্যমান থাকে। যতই নিচের দিকে যাওয়া যায় ততই

জৈব পদার্থের পরিমাণ আস্তে আস্তে কমতে থাকে। ইটভাটার জন্য যে মাটি উত্তোলন করা হয় সেগুলোর সবটাই মাটির উপরিভাগ থেকে নেয়া হয়, যার কারণে

পতিত জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে।
আর এর সাথে পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতিতো আছেই। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় বেশি ক্ষতি হয় বয়স্ক ও শিশুদের। এতে ফুসফুসের

সমস্যা, শ্বাসকষ্ট ও ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগসহ অ্যালার্জি দেখা দেয় । কৃষি উৎপাদন ও গাছপালার স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। আমাদের দেশে দ্রুতগতিতে

নগরায়ণের ফলে এসব ইটভাটা হতে প্রতিবছর কমপক্ষে দেড়হাজার কোটি পিস ইটের প্রয়োজন হয়।
তথ্যমতে, বিগত ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল অবধি চার বছরে এর পরিমাণ প্রতিবছর ২-৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ ইটভাটায় ইট পোড়াতে ২২

লাখ টন কয়লা ও ১৯ লাখ টন কাঠ পোড়ানো হয়ে থাকে, যেখান থেকে বছরে ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টন গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়ে থাকে। কাঠ পুড়িয়ে

শুধু যে ক্ষতিকর ধোঁয়া উৎপন্ন করে পরিবেশ নষ্ট করে থাকে তাই নয়, এতে জ্বালানির এই কাঠ সংগ্রহের জন্য উজার করা হচ্ছে বনজঙ্গল। কাজেই এখানেও

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় মোট ভূভাগের শতকরা যে ২৫ ভাগ বনভূমির প্রয়োজন হয়, সেটা ধ্বংস করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দেশের আইনে কয়লা দিয়ে ইট

পোড়ানের নিয়ম আছে। কিন্তু এ নিয়মটি সঠিকভাবে পালন হচ্ছেনা। তাছাড়া কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে।

উন্নত দেশগুলোতে ইটের ব্যবহার নেই। খোদ আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতেও ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কঠোর। বিশ্বায়নের এ সময়ে পরিবেশ রক্ষায় ইটের

বিকল্প নিয়ে ভাবেত হবে। উন্নত বিশ্বে ইটের বিকল্প হিসেবে কনক্রিট ব্লক ব্যবহার হচ্ছে। আমাদের দেশে কনক্রিট ব্লক ব্যবহার ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। কিন্তু এ

বিষয়টি সর্বসাধারনের অনেকেরই অজানা। কনক্রিট ব্লক ব্যবহার করলে এতে লোনা ধরে না, ডাম্প হয় না সর্বোপরি এটি স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব।
তাছাড়া এটি অগ্নি,তাপ ও শব্দ প্রতিরোধক। আমরা অনেকেই ইটভাটার ভয়াবহতা উপলদ্ধি করছি না। নিজেদের ইচ্ছামাফিক যা খুশি তাই করছি। এমনটা আর কতদিন!

দিনে দিনে আমাদের পরিবেশ চলে যাচ্ছে বিপর্যয়ের দিকে। এখনই সময় নজর দেয়ার। সরকারের উচিৎ পরিবেশের কল্যাণে উন্নত বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে ইটভাটা

বন্ধ করে কনক্রিট ব্লক ব্যবহারে জনগণকে সচেতন করতে উদ্যোগী হওয়া।
লেখক : সমাজকর্মী ও সাংবাদিক