অভিনয় শিল্পী মনোজ কুমার
অভিনয় শিল্পী মনোজ কুমার

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অভিনয় করে যেতে চাই: মনোজ কুমার

প্রকাশিত :২৯.০৫.২০১৭, ৮:২২ অপরাহ্ণ

শ্রোতের বিপরীতের অভিযাত্রী মনোজ কুমার। অভিনয় যার ধ্যান, জ্ঞান। টেলিভিশন বিজ্ঞাপন, নাটক, সিরিয়ালে কাজ করে যাচ্ছেন একের পর এক। শৈশবের স্মৃতি, মঞ্চ, অভিনয়, শিক্ষকতাসহ নানা বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন ‘আজ সারাবেলা’র সঙ্গে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সালেহীন দিপু

আজ সারাবেলা: ঈদকে সামনে রেখে ইদানীং ব্যস্ততা কেমন যাচ্ছে আপনার?

মনোজ কুমার: ঈদে’র জন্য কিছু কাজ চলছে, তবে সিরিয়ালের জন্য রেগুলার মাফিক শুটিং করছি। কয়েকটা সিরিয়াল প্রচারিত হচ্ছে মাছরাঙা ও জিটিভিতে। বিটিভির ‘গল্প নয় সত্যি’ নামে একটা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছি, যার কাজ রেগুলার করতে হচ্ছে। সম্প্রতি কিছু বিজ্ঞাপনেরও কাজ করেছি, মা দিবসের একটা বিজ্ঞাপন, এছাড়া বাংলালিংক ও গাজী সিঙ্ক এর একটা বিজ্ঞাপন প্রচারিত হচ্ছে টেলিভিশনগুলোতে।

আজ সারাবেলা: অভিনয় জীবনের শুরুর দিককার গল্পটি যদি বলেন পাঠকদের জন্যে…

মনোজ কুমার: সাধারণত অভিনয় শিক্ষার শুরুটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ থেকেই। এছাড়া আমার বাবা যাত্রাদলে অভিনয় করতেন, আমার মা যাত্রাদলে গান গাইতেন এবং আমার নানাও ছিলেন যাত্রার বিখ্যাত অভিনেতা। হয়ত ছোটবেলায় পরিবার থেকে কিছুটা রপ্ত করতে পেড়েছিলাম। একটা কাহিনী বলি, আমাদের বাসায় আগে ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল, সে সময় বিভিন্ন নাটকের ক্যাসেট পাওয়া যেত। আমার মনে আছে বাসায় যখন বাবা থাকত না তখন আমি ‘সাহেব’ নাটকের ডাইলগগুলা শুনতাম আর নিজে নিজে বলতাম মজা করার জন্যে। আরেকটা বিষয় তখন মহালয়া হতো টেলিভিশনে, আমরা দেখতাম। গ্রামে মহালয়া থিয়েটার এ পারফর্ম করা হতো, আমরা যারা ছোটরা ছিলাম কেউ দুর্গা, কেউ গণেশ, কেউ শিব’র চরিত্রে মহালয়ে আমরা পারফর্ম করতাম। ভুলত্রুটি হলে বকাও খেতাম। সাইন্স এর ছাত্র ছিলাম সবাই স্বাভাবিক ভাবেই ভাবতো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এসবের কিছু একটা হবো। কিন্তু আমি এসব থেকে সরে এসে মন স্থির করলাম ইউনিভারসিটিতে পড়বো।

দেখলাম জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির নাট্যতত্ত্ব নামে একটা সাবজেক্ট রয়েছে। আমি জানতাম না নাটক নিয়ে এইভাবে একাডেমিক্যালি পড়াশোনা করা হয়। তখন মনের ভেতর একটা চিন্তা কাজ করলো যে এখানে পড়ব। কাউকে না বলে একটা ফর্ম তুলে রাখলাম রাজশাহী ইউনিভার্সিটির তখন ১ম নাট্যকলা বিভাগ খুলেছে, আমরা ছিলাম ফার্স্ট ব্যাচ। পরে চ্যান্স পেয়ে ভর্তিও হয়ে গেলাম। জানাজানির পর বাসায় বকাবকি, সবাই বলল এর ভবিষ্যৎ শেষ। এভাবেই শুরু বলা যায় অভিনয় জীবনের।

monoj kumar 1

আজ সারাবেলা: জীবনের ১ম মঞ্চে অভিনয় করেছেন কবে?

মনোজ কুমার: জীবনের ১ম মঞ্চে অভিনয় করেছি ২০০১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। এটা খুবই স্মরণীয় ছিল, কারণ ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর জানুয়ারিতে আমাদের ক্লাশ শুরু হয় এবং ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখে ‘করব’ নাটকে মঞ্চস্থ করি। এর আগে কখনো অভিনয় করা হয়নি আমার। খুব লজ্জা লাগতো আমার। ছোট বেলার একটা গল্প বলি, আমার বাবা কলেজ এর প্রিন্সিপাল ছিলেন, তার কলেজের এক অনুষ্ঠানে আমাকে ‘খোকন হাসে ফোকলা দাঁতে’ কবিতাটি আবৃত্তি করার জন্য বলেছিল,আমি বাসায় খুব প্র্যাকটিস করেছিলাম কিন্তু কলেজে গিয়ে অনেক মানুষ দেখে ভয়ে স্টেজেই উঠতে পারিনি।

আজ সরাবেলা: ১ম মঞ্চ অথবা ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

মনোজ কুমার: ওই যে বললাম, আমি একটু লাজুক প্রকৃতির ছিলাম। কথাবার্তা কম বলতাম। নাট্যকলায় পড়বো এটা আমার বাবা মা বিশ্বাসীই করতে পারেনি। ১ম শো’র এক্সপেরিয়েন্স হচ্ছে আমি নাট্যকলায় ভর্তি হয়ে একটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফেলেছি, কারণ পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, সো আই হ্যাভ টু ডু ইট। এরকম একটা প্যাশনের ভেতর নিজেকে ফেলে দিয়েছিলাম। এরপর থেকে তেমন কোন জড়তা ছিল না। না মঞ্চে, না ক্যামেরার সামনে।

আজ সারাবেলা: মঞ্চ ও টিভি দুইটার মধ্যে পার্থক্য কতটুকু রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

মনোজ কুমার: সাধারণত মঞ্চ আর ক্যামেরার ভিতর আমার কাছে পার্থক্য একটায় সেটা হলো দুইটার টেকনিকটা আলাদা। মঞ্চ কিছু কন্ডিশন মেনে চলে আর ক্যামেরা কিছু কন্ডিশন মেনে চলে। মঞ্চে যেটা হয়, পুরো ঘটনাটাকে একবারে দেখানো হয়। আর ক্যামেরায় ছোট ছোট সট নিয়ে সেকেন্ড সেকেন্ড ধরে একটা জিনিস দেখানো হয়। এইটায় মূল পার্থক্য বলে মনে হয় আমার কাছে।

আজ সারাবেলা: এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি, শৈশবের কোন স্মৃতিগুলো বেশি মনে পড়ে?

মনোজ কুমার: গ্রামের বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, দল বেধে নদীতে সাঁতার কেটে গোসল করা, গরু চড়ানোর সময়গুলো, কাঁচা রাস্তা, কাদামাটি নিয়ে খেলা করা খুব মনে পড়ে আমার। যদিও এর অনেক কিছুই গ্রামে আর অবশিষ্ট নেই। শৈশবের কথা আসায় বলে রাখি আমার গ্রামের নাম রাধানগর যেটা নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর থানায় অবস্থিত।

আজ সারাবেলা: এবার যদি একাডেমিক জীবনে আশা য়ায়…

মনোজ কুমার: ছোটবেলায় ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত গ্রামে ছিলাম, গ্রামের হাই স্কুলটা দূরে হওয়ায় রাজশাহী শহরে চলে আসি, সিরোইল গভারমেন্ট হাই স্কুল এ ভর্তি হই। এরপর রাজশাহী সিটি কলেজ এবং পরবর্তীতে রাজশাহী ইউনিভার্সিটি, রাজশাহীময় একটা জীবন বলা যায়।

আজ সারাবেলা: অভিনয়ের পাশাপাশি এখন আর কি করছেন?

মনোজ কুমার: অভিনয়ের পাশাপাশি আমি একটা চাকরি করি। ময়মনসিংহ, ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, ফিল্ম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ এর লেকচারার হিসেবে চাকরি করছি।

আজ সারাবেলা: শিক্ষকতা ও অভিনয় দুইটার ভেতর কোন কাজটা বেশি উপভোগ করেন?

মনোজ কুমার: আসলে আমি দুইটায় সমানভাবে উপভোগ করি। উপভোগ না করলে কোনটাই করতাম না। কারণ দুইটা কাজ করার জন্য আমাকে অনেক বেগ পেতে হয়। টাইম ম্যানেজমেন্ট যাওয়া আসা এগুলোর জন্যে প্রচুর শ্রম দিতে হয় আমাকে। স্টুডেন্টদের সামনে দাঁড়িয়ে ক্লাশ নেওয়াটা যেমন এক্সাইটিং লাগে, তেমনি অভিনয় এর ক্ষেত্রে নতুন একটা স্ক্রিপ্ট নিয়ে ভাবতেও রোমাঞ্চকর লাগে আমার কাছে। তাই দুইটার কোনটাকেই ছাড়তে পারি না।

আজ সারাবেলা: আবার অভিনয়ে ফিরে আসা যাক, কী ধরনের চরিত্র বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

মনোজ কুমার: আমার বেশিরভাগ রোমান্টিক কাজ করা হয়েছে। অ্যাকশানও কয়েকটা করেছি। আসলে ক্যামেরায় লুকটা অনেক মেটার করে রোল এর ক্ষেত্রে। আর একবার কোন চরিত্রে কাউকে ভালো লেগে গেলে সবাই ঐ চরিত্রেই দেখতে চায়। আমি এটা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই এবং ডিফরেন্ট ডিফরেন্ট চরিত্রে অভিনয় করতে চাই। ভারসাটাইল অ্যাক্টর হতে চাই।

আজ সারাবেলা: দর্শকের চাহিদা ও নিজের পছন্দের ভেতর কোনটাকে বেশি গুরুত্ব দেবেন?

মনোজ কুমার: আসলে আমাকে কোন রোলে কাস্ট করা হবে তা আমার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই একই টাইপের রোল পরপর আসলে প্রত্যেকবার নতুনভাবে করার এবং নতুনত্ব আনার চেষ্টা করি। আবার যদি এভাবে ভাবি যে, কাজই করবো না নতুন, বা ভিন্নধর্মী কাজ না পেলে। তাহলে অনেক ভালো কাজ ছেড়ে দিতে হতে পারে। তাই চেষ্টা করি নতুনত্ব আনার। ভাল কাজ করার।

আজ সারাবেলা: এখন পর্যন্ত করা নিজের কোন কাজটাকে সেরা বলে মনে হয় আপনার কাছে?

মনোজ কুমার: প্রথমেই বলব ‘ক্লোজআপ কাছে আসার গল্প’ এরপর ‘কাটুশ কুট্টুস’ একটা শর্টফিল্ম। এছাড়া নাটকের ক্ষেত্রে ‘এপার্টমেন্ট ফাইভ ডি’ নামে একটি নাটক করেছিলাম। ওটায় ডুয়াল পার্সোনালটির একটা ক্যারেক্টার ছিল, ঐ রোলটার প্রতি ভালবাসা রয়ে যাবে আজীবন।

আজ সারাবেলা: আপনার কাজের আলোচনা ও সমালোচন কিভাবে গ্রহণ করেন?

মনোজ কুমার: আসলে সত্যিকার অর্থে এখন যেটা উপলব্ধি করছি সেটা হলো, আমার কোন কাজের উপর কারো ইতিবাচক বা নেতিবাচক মন্তব্য খুব একটা প্রভাব ফেলে না। কারো জাজমেন্ট নিতে পারি না। আসলে আমি নিজেই বুঝতে পারি কোন কাজটা ভাল হলো বা খারাপ হলো। সেই জায়গা থেকে প্রস্তুত করে নেই নিজেকে।

আজ সারাবেলা: কখনো ডিপ্রেসড হলে কী করেন?

মনোজ কুমার: ডিপ্রেসন দূর করার জন্য সবচেয়ে ভালো বুদ্ধি হল বেশি বেশি কাজ করা। কাজের মধ্যে থাকা। চেষ্টা করি সব সময় কাজের মধ্যে থাকতে।

আজ সারাবেলা: দশ বছর পর নিজেকে কোন পর্যায় দেখতে চান?

মনোজ কুমার: আমি আসলে গোল সেট করে কোন কাজ করি না। একজন অভিনয়শিল্পী আর একজন শিক্ষক, আমি শুধু কাজ করে যেতে চাই… মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অভিনয় করে যেতে চাই।

 

আ-সা/রবি/সা