আব্দুন নূর তুষার
আব্দুন নূর তুষার

হারাতে গিয়ে, তারা আসলে আমাকে জিতিয়ে দিয়েছে : আব্দুন নূর তুষার

প্রকাশিত :০৩.০৬.২০১৭, ৬:১৬ অপরাহ্ণ

নতুন টেলিভিশন চ্যানেল ‘নাগরিক’কের সিইও আব্দুন নূর তুষার। বিদগ্ধ, আলোকিতজন। বর্তমান টেলিভিশন মিডিয়ার বাজার, জনপ্রিয়তা, সাফল্য, ব্যর্থতা, মান- নানা দিক বিশ্লেষণ করেছেন দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে। ‘নাগরিক’ কবে আসছে, কেমন হবে- বাদ যায়নি সেসব প্রসঙ্গও। নিজের ব্যক্তিগত আর টেলিভিশন জীবন নিয়েও কথা বলেছেন ‘আজ সারাবেলা’র সঙ্গে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জববার হোসেন

আজ সারাবেলা: টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা যত বাড়ছে, জনপ্রিয়তা সে হারে বাড়ছে না। এই বাস্তবতাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

আব্দুন নূর তুষার: যত টেলিভিশন হবে, সব টেলিভিশনই জনপ্রিয় হবে বা সমান জনপ্রিয় হবে এমন ভাবা অযৌক্তিক। ধরে নেই, রুনা লায়লা খুব ভাল গান করেন। সবাই গান গাইলেই কি রুনা লায়লা হবেন? কিংবা প্রত্যেকেই কি রুনা লায়লার মতো গান গাইবে? জনপ্রিয়তার সঙ্গে সংখ্যার কোন সম্পর্ক নেই। আজকে যে টেলিভিশন স্টেশন হচ্ছে তাদের জনপ্রিয় হতে গেলে প্রত্যেককে একটি নির্দিষ্ট মানোত্তীর্ণ অনুষ্ঠান প্রচার করতে হবে। এটা যদি হতো তাহলে দর্শক ভাগ ভাগ হয়ে সব চ্যানেলই দেখত, হচ্ছে না বলেই টেলিভিশন দর্শকও হারাচ্ছে। আর এটা আশা করা উচিত নয়, সবাই সমান জনপ্রিয় হবে। কে জনপ্রিয়, কে জনপ্রিয় নয়- এই তুলনামূলক বিচারইবা তখন করবেন কিভাবে?

আজ সারাবেলা: এই বাজার বাস্তবতায় নতুন একটি টেলিভিশন স্টেশন ‘নাগরিক’ আসছে। কতটা চ্যালেঞ্জিং মনে করেন?

আব্দুন নূর তুষার: আমি চ্যালেঞ্জিং মনে করি না। যদি শিল্প ও ব্যবসা এই দুয়ের মধ্যে সম্পর্ক বোঝেন তাহলে একটি নির্দিষ্ট মান আপনি অর্জন করবেনই। হয়তো অনেক লাভজনক কিছু হবে না, অনেক শিল্প মানোত্তীর্ণ হবে না, কিন্তু গড় যে মান তার চেয়ে আপনার সাফল্য কিছুটা বেশিই আসবে। প্রাথমিক পর্যায়ে যে কোন প্রতিষ্ঠানের এটাই লক্ষ্য হওয়া উচিত। কোন ব্র্যান্ড যেমন একদিনেই ব্র্যান্ড হয়ে ওঠে না। কোন জনপ্রিয় মানুষ যেমন একদিনে জনপ্রিয় হন না, তার জ্ঞান, অভিজ্ঞতায় তিনি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠেন, তেমনি প্রতিষ্ঠানও তাই।
মানুষ তো টেলিভিশনের কাছে থেকে সত্যজিৎ রায়, কুরোসাত্তয়া, বা আববাস কিয়োরোস্তামির মতো প্রোডাকশন আশা করে না। মানুষ টেলিভিশনে চায় প্রতিদিনের বিনোদন, প্রতিদিনের খবর। আপনার মা ফাইভ স্টারের মতো রান্না করবে এটা তো আশা করেন না। কিন্তু প্রতিদিন তার রান্নাটাই খান। টেলিভিশনও যদি একটি নির্দিষ্ট ধাচের, মানের অনুষ্ঠান দিতে পারে লোকে সেটা দেখবে।

আব্দুন নূর তুষার

আব্দুন নূর তুষার

আজ সারাবেলা: নাগরিক টেলিভিশন নামটি কেন? আরবান কনসেপ্ট থেকে নাকি টেলিভিশনের চেয়ারম্যান মেয়র আনিসুল হক সে কারণে?

আব্দুন নূর তুষার: নাগরিক নামটি আগেই চিন্তা করেছিলাম আমরা। আনিসুল হক সাহেব মেয়র হয়েছেন পরে। নাগরিক শব্দের অর্থ নগরবাসী নয়, সিটিজেন অর্থে- এটি ছিল আমাদের ভাবনা। দেশের নাগরিকদের সুখ-দুঃখ, চাওয়া পাওয়া, জানবার আকাক্সক্ষা, সাহিত্য পিপাসা, বিনোদনের ক্ষুধা মেটাতে চায়- নাগরিক টিভি।

আজ সারাবেলা: এত এত টেলিভিশন চ্যানেলের ভিড়ে ‘নাগরিক টিভি’ নিজেকে আলাদা করবে কিভাবে?

আব্দুন নূর তুষার: আলাদা হব বা আলাদা কিছু করবো এই ঘোষণা দিয়ে আলাদা হওয়া যায় না। নিজেকে প্রমাণ করতে হয় যোগ্যতায়, কাজের মধ্যে দিয়ে। কী হবে, কী হবে না সেটা পর্দাই বলে দিবে। হাজির বিরিয়ানী নিজেকে আলাদা করে কিভাবে? মামা হালিম কেন আলাদা? মানুষ নিষ্ঠা, আন্তুরিকতা আর যতটা চায়। আমরা দশর্কের সিরিয়াসলি নিয়েছি যেটা গুরুত্বপূর্ণ আমাদের কাছে।

আজ সারাবেলা: টেলিভিশন দর্শকদের অনেক প্রত্যাশা থাকে। টেলিভিশনগুলোও অনেক প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু বেশিরভাগ সময় প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতি সমন্বয় ঘটে না। দীর্ঘ দিনের টেলিভিশন অভিজ্ঞতায় আপনার কি মনে হয়?

আব্দুন নূর তুষার: লোকে প্রতিশ্রুতি দিতে ভালোবাসে। এটা বাজার আকৃষ্ট করার একটা উপায়ও হতে পারে। তবে আমরা কোন প্রতিশ্রুতি দেইনি। গণমাধ্যম এমন একটা জায়গা যেটি দৃশ্যমান। আপনি প্রিন্ট বলেন, অনলাইন বলেন, টেলিভিশন বলেন, এখানে লুকোছাপার কিছু নেই। লোকে প্রতিদিন হিসাব করবে সে কি পেল। নিজেকে ‘বিশ্ব সুন্দরী’ বলে কোন লাভ নেই। লোকে দেখলেই বুঝবে সে বিশ্ব সুন্দরী কিনা। আপনি একটি লাইন বলেছেন, ‘দীর্ঘ দিনের টেলিভিশন অভিজ্ঞতা’। মনে করি এটা খুব জরুরি। লক্ষ্য করলে দেখবেন, দীর্ঘদিনের টেলিভিশনের অভিজ্ঞতা নিয়ে যারা টেলিভিশন করেছে তারা অধিকাংশই সফল। অভিজ্ঞতা, পরিশ্রম, অনুশীলন এসব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারা এই ব্যবসাটার সঙ্গে জড়িত তার কতজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, কতজন নয়, কতজন সফল, কতজন অসফল আপনি হিসেব করলেই সে প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন।

আজ সারাবেলা: একটা সময় টেলিভিশন মেধা বিকাশে কাজ করেছে। বিটিভির কথা বলছি। বিজ্ঞানের অনুষ্ঠান, কুইজের অনুষ্ঠান হতো। এখন প্রতিভার অন্বেষণ মানেই কোন সুন্দরী বা সুদর্শনকে খোঁজা। আপনি নিজেও কুইজের অনুষ্ঠান করেছেন। মেধা বিকাশে ব্যক্তিগতভাবে কোন উদ্দ্যোগ নিবেন কিনা?

আব্দুন নূর তুষার: একটা ক্ষয়ের যুগে প্রবেশ করেছি আমরা । মনে করি যা কিছু বিক্রয়যোগ্য তাই ভালো। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সবকিছু বিক্রয়ের জন্য নয়। টেলিভিশন সব কিছু বিক্রি করতে চায়। বির্তক, কুইজ, বিজ্ঞানভিত্তিক অনুষ্ঠান এসব কম দামে বিক্রি হবে। কারণ এসব অনুষ্ঠানের দর্শক, শ্রেণী, রুচি, চাহিদা ভিন্ন। আমরা সবকিছু বিক্রির জন্য তৈরি করছি না। ফলে কিছু অনুষ্ঠান থাকবে যাতে মেধার বিকাশ না ঘটলেও মেধাবী মানুষের চাহিদাকে অন্তত পূরণ করবে।

আরেকটা জিনিস, টেলিভিশনে এখন মেধাবী মানুষের জায়গা নেই। আমরা যে জায়গাটিতে প্রবেশ করেছি সেখানে মেধাবী মানুষের প্রথমে বলা হয়েছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হও। সত্তর আশির দশকে দেখবেন সব মেধাবী ছেলে মেয়েরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইতো। পরবর্তী দশকে এসে সবাই পড়তে চাইলো বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। উচ্চমূল্যে যদি নিজেকে, নিজের লেখাপড়াকে বিক্রি করা না যায় তাহলে লাভ নেই। এই চিন্তায় আক্রান্ত সবাই। বিক্রির চিন্তা থেকেই এখন মেধাবীরা বাংলা, ইংরেজি, পদার্থ, গণিত, ইতিহাস, ভ‚গোল- এই সব মৌলিক বিষয় পড়তে চায় না। কারণ বিক্রি কম। টেলিভিশন যদি এই জায়গা থেকে না বের হবে পারে তাহলে যা ঘটছে তাই ঘটবে। মানুষ শেখে নানাভাবে। টেলিভিশনের ভূমিকা সেখানে অনেক। একটি অনুষ্ঠান হতো ‘মুক্তধারা’ নামে, আমি শুধুমাত্র উচ্চারণ শেখার জন্য মুস্তাফা-নূর-উল ইসলাম স্যারের সেই অনুষ্ঠানটি দেখতাম। আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ যাকে দেখতাম কেবল শিখবার জন্যে। শো ম্যানশিপ- আফজাল হোসেন আসেন, আনিসুল হক আসেন, সুর্বনা মুস্তাফা আসেন, দেখে শিখলাম। টেলিভিশন, রেডিও, প্রিন্ট, অনলাইন সবখানেই যা ঘটছে তা হলো বিক্রয়যোগ্য কিছু আনো, তাকে বিক্রি করো, বাজার পড়ে গেলেই আরেকটা নতুন কিছু আনো, বিক্রি করো। এই যে প্রক্রিয়া এ থেকে সরে আসতে না পারলে আপনি যা বলছেন তা অর্জন করা সম্ভব হবে না।

আজ সারাবেলা: আপনি নিজে কী কোন শো করবেন? যেহেতু আব্দুন নূর তুষার ব্র্যান্ড সেলিব্রিটি?

আব্দুন নূর তুষার: করতেও পারি, আবার নাও পারি। এই মুহুর্তে কিছু বলা যাচ্ছে না।

আজ সারাবেলা: টেলিভিশনের বড় কর্পোরেট চাকরি, মাইনে এর ভিড়ে একজন আব্দুন নূর তুষার হারিয়ে যাবেন কিনা যে তুষার বিতর্ক- বক্তৃতার, বই পড়তে উদ্ধুদ্ধ করার, যে তুষার তরুণদের জ্ঞান, মেধা বিকাশের চর্চা ও আন্দোলনে অনেককাল?

আব্দুন নূর তুষার: মাত্র ক’দিন আগে আমি আপনাদের ‘আজ সারাবেলা’র ‘বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি’ অনুষ্ঠানে গিয়েছি, বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশনের জাতীয় বিতর্ক উৎসবে টানা দু’দিন সময় দিয়েছি। বাঁধন রক্তদান কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে গিয়েছি। দু’টো সেলফোন কোম্পানির শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বক্তৃতা দিয়েছি, সেখানেও কোন অর্থযোগ ছিল না। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কার্যক্রম তার সঙ্গে যে সম্পর্ক তা কোনভাবেই ক্ষুণœ হবার নয়। কেবল একটি মাসের কথা বললাম। ব্যস্ততা রয়েছে, থাকবে। আমি হয়তো বেছে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, কাজের গুরুত্ব বিবেচনা করছি। কিছুদিন আগে টেলিভিশন, রেডিও উপস্থাপকদের এক সঙ্গে ডেকে ‘প্রেজেন্টার প্ল্যাটফরম অব বাংলাদেশ’, একটি সংগঠন করেছি। আমি সেখানে অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি।
ত্রিশ বছর ধরে বিতর্ক করছি। বিতর্ক সংগঠন করেছি। যার বয়স প্রায় ২৫ বছর। আমাদের সংগঠন একমাত্র, যেখানে দশের কাছাকাছি সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি রয়েছে। কোন অনুষ্ঠানে না যেতে পারলেও অন্যরা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশনের মধ্যদিয়ে নতুন নতুন মানুষ ও নেতৃত্ব তৈরি করেছি। আমার সামাজিক দায়িত্ব পালন কোনভাবেই বিঘিœত হয়নি। বরং মনে করি, টেলিভিশন, রেডিও, খবরের কাগজ, অনলাইনের একটি সামাজিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ রয়েছে, যদি পারি তাহলে আরো বৃহত্তর পরিসরে সামাজিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ এসেছে এবং আমরা এই সুযোগটি নিতে চাই, কাজে লাগাতে চাই।

ab.tuser4

আব্দুন নূর তুষার

আজ সারাবেলা: যে তুষার আপনি হতে চেয়েছেন, চিকিৎসা করবেন, সেবা করবেন মানুষের, সেখানে থেকে আপনি টেলিভিশন পারসোনালিটি। জনপ্রিয় মানুষ। আফসোস হয় কখনো?

আব্দুন নূর তুষার: মানুষের জীবন আসলে আফসোসের। জীবন খুব ছোট। যদি অনেক কাজ করতে চান, সৃজনশীল কেউ হন, তার আফসোস থাকবেই। ফলে এই আক্ষেপ আমার আছে যে জীবন এত ছোট কেন? মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করেছি অনেক টাকা উপার্জন করবো এই ভেবে নয়। শিক্ষক হবো, ছাত্রছাত্রীকে পড়াবো। যে কোন কারণে সেটা হওয়া হয়নি। সে আফসোসটা হয়তো আছে। বিভিন্ন জায়গায় গেষ্ট লেকচার দেই। ক্লাস নেই। কেউ কিছু বুঝতে চাইলে ব্যক্তিগতভাবে আমি পড়াইও। মনে করি জীবন আসলে জ্ঞানের প্রবাহ ও বিস্তারের জন্যই। জ্ঞান অন্যকে দিলে তো কমে না, অন্য কেউ হয়তো আমার জ্ঞান নিয়ে আরো জ্ঞানী, মহৎ, মহান হতে পারে, তাতে আমার আনন্দ বাড়ে। আর শিক্ষক যে হতে পারিনি সেটার জন্য আমাদের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও অক্ষমতাই দায়ী। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কাউকে ভাল শিক্ষক ও ভালো চিকিৎসক হতে উৎসাহ দেয় না। তাকে কেবল টিপিক্যালি, ক্লারিক্যালি চাকরি করতে শেখায় ও নির্দেশ দেয়।

তবে যদি বলেন এ জন্য অনুশোচনায় ভুগি কিনা, তাহলে বলবো- না। এখনও টেলিভিশন স্টেশনকে জনপ্রিয় করে দিয়ে যদি সময় পেতাম, আমি চিকিৎসক হতাম। ছাত্র পড়াতাম। জীবন আসলে ৫০০ বছরের হওয়া উচিত। আরো অনেক কাজ করা যেত, তারপরও জীবন নিয়ে আমি আনন্দিত। আমি মুক্ত, স্বাধীন মানুুষ। আমি কখনো বাধ্য হয়ে কিছু করিনি। চাপ দিয়ে, জোর করে আমাকে কিছু করানো সম্ভব নয়। আমার মন যেখানে যায়, আমি সেখানে যাই।

একটা গল্প বলি। খুব অল্প বয়সে আমি জনপ্রিয় হয়েছি। টেলিভিশনের একজন মহাপরিচালক, যিনি একটি বিশেষ ভবনের নির্দেশে আমার ‘শুভেচ্ছা’ অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে দিয়েছিলেন, তিনি একদিন ডাকলেন। আমি গিয়েছিলাম। বলেছিলেন, আপনার এই অনুষ্ঠান তো জনপ্রিয় না, অজনপ্রিয়। গত কয়েক বছরে কাকতালীয়ভাবে তার সঙ্গে একই ফ্লাইটে পরপর দু’বার দেশে ফিরেছি। দু’বারই পাশাপাশি বসে গল্প করেছি। আমি প্রায়ই বই কিনতে বিদেশে যাই। ফ্লাইটেও আমার হাতে কোন না কোন বই থাকে। হাতে বই দেখে তিনি দু’বারই মন্তব্য করেছেন, তুষার আপনার অনেক পড়াশোনা, আপনি অনেক মেধাবী। আমি একটি বারের জন্যও তাকে মনে করিয়ে দেইনি, তিনি আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিলেন। বলেছিলেন, আপনি মেধাবী ছেলে বোঝেন না, কেন আপনার অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হয়? গল্পটি বলবার কারণ একই ফ্লাইটে প্রচুর শ্রমিক দেশের বাইরে থেকে ফিরছিলেন, তারা আমাকে দেখে ‘শুভেচ্ছা’র আব্দুন নূর তুষার, ‘শুভেচ্ছা’র আব্দুন নূর তুষার’ বলতে থাকেন। কেউ কেউ এসে ফ্লাইট থেকে নামার পর ছবি তুলতে চায়। ভদ্রলোক পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। অনুষ্ঠান বন্ধ হবার ১৬/১৭ বছর পর মানুষ আমাকে মনে রেখেছে। তারা হয়তো ভেবেছে আমি হারিয়ে যাব। আমি কিন্তু হারাইনি। আমি সংগ্রাম করেছি। প্রতি মুহুর্তে টিকে থাকার সংগ্রাম। আরও অনুষ্ঠান করেছি, কনসালটেন্সি করেছি, ব্যবসা করছি, স্টেজ শো করেছি, প্রোগ্রাম করেছি- হেন কাজ নেই যা করেনি, টিকে থাকবার জন্যে। তবে নিজের নৈতিকতা থেকে কখনই সরে যাইনি।

আজ সারাবেলা: অনুষ্ঠানটি তো বন্ধ হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে। এখন তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গণতান্ত্রিক সরকার। অনুষ্ঠানটি তো চাইলে আপনি আবার শুরু করতে পারেন?

আব্দুন নূর তুষার: সেটা আমি এখন আর চাই না। এক হচ্ছে, অনেক সময় চলে গিয়েছে। দ্বিতীয়, আমি সুবিধা গ্রহণ করে অভ্যস্ত নই কখনোই। সময় অনেক কিছুই প্রমাণ করে দিয়েছে। কালো তালিকাভুক্ত হওয়া, অনুষ্ঠান বন্ধ হওয়া আমাকে সামনের দিকে বাধা ঠেলে যেতে সাহায্য করেছে। জীবনকে অনেকদূর অগ্রসর করেছে। অনুষ্ঠানটি বন্ধ হওয়াতে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য কাজ করেছি তিনগুন। আমি সবসময়ই মনে করি, অসম্মান অপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয়। ফলে আমার সংগ্রাম হয়তো দীর্ঘতর হয়েছে, কিন্তু টিকে গিয়েছি। আমার আজকের অবস্থান, আমার লড়াইয়ের পুরস্কার। এখন আমার মতো করে কাজ করতে পারি স্বাধীনভাবে, যে কাজগুলো আমি করতে চেয়েছি। বির্তক বলেন, বইপড়া কর্মসূচি বলেন, বঙ্গবন্ধুর গল্প বলা বলেন- এ কাজগুলোর জন্যই তো আমি আব্দুন নূর তুষার। আমাকে হারাতে গিয়ে, তারা আসলে জিতিয়ে দিয়েছে আমাকে।

 

-অা-সা/রবি/সা