শেখ হাসিনা কাঁদলেন এবং কাঁদালেন!

প্রকাশিত :০৪.০৬.২০১৭, ৫:৪৩ অপরাহ্ণ
  • মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন
    ১৭ মে, বুধবার ২০১৭ ছিল শেখ হাসিনার ৩৭তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ৩৬ বছর আগে এই দিনে তিনি বুকভরা কান্না, হাহাকার আর আর্তনাদ নিয়ে দেশের মাটিতে পা রাখেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্মিত মানিক মিয়া এভিনিউয়ের স্টেজে সেদিন তার সেই বুকফাটা কান্না আর হৃদয়ের আকুতি লাখো মানুষকে কাঁদিয়েছিল।

    হয়ত সেদিন খোদার আরশ কেঁপে উঠেছিল। সে কারণে হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয়েছিল ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টি। লাখো মানুষ সেদিন ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে তার সামনে উপস্থিত থেকে জানান দিয়েছিল- ‘হে বঙ্গবন্ধু কন্যা তুমি ফিরেছ তাই আমরা ধন্য’। এবার গণভবনে সহকর্মীদের উপস্থিতিতে নির্বাসনের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কথার মাঝে তিনি বার বার কাঁদলেন এবং সবাইকে কাঁদালেন। ৭৫ এর ১৫ আগস্টকে ঘিরে ঘরে-বাইরে ষড়যন্ত্রের বিষয়গুলো খোলামেলা তুলে ধরলেন। তিনি বললেন- ‘সবাই আমাদের আপন লোক ছিল।’ আপন লোক বলতে তিনি আত্মীয় স্বজনের কথা বলেননি। কিন্তু সবসময় ৩২ নম্বরের বাড়িতে যারা আসত, যেত, খেত, উঠত, বসত তাদের কথা বললেন।’ যাদের জন্য আমাদের বাড়ির অবারিত দ্বার ছিল, তারাই আমার বাবা-মাকে হত্যা করল।’

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে- খন্দকার মোস্তাক, জিয়াউর রহমান (স্বস্ত্রীক), মেজর নূর, মেজর ডালিম, তার স্ত্রী, শ্যালিকা এবং শাশুড়ির ৩২ নম্বরে নিত্য যাতায়াতের কথা স্মরণ করেন এবং বলেন- ‘ভাবতেই পারি না এরাই আমার পিতা-মাতা-ভাই-ভাবী হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল।’

১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়। কেমনভাবে হত্যা করা হয়েছিল সে বর্ণনা নতুন করে নাই বা দিলাম। কারণ -তা ছিল ভীষণ হৃদয়বিদারক। কিন্তু এইদিন জাতির পিতাকে কারা হত্যা করেছিল? কেন হত্যা করেছিল? এ নিয়ে বহু কথা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে, লেখালেখি হয়েছে, গবেষণা হয়েছে। এ হত্যার পেছনে যে গভীর এবং সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল তাও মার্কিন গোপন দলিল থেকে জনসমক্ষে প্রকাশিত। এই দলিলে যুদ্ধে পরাজিত মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিঞ্জারের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ দৃশ্যমান।

মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরই চীন এবং সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। অর্থাৎ চীন এবং সৌদি আরবের অবস্থান ১৯৭-এর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিশেষত বঙ্গবন্ধুর বিপক্ষে এবং পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। এই দুটি রাষ্ট্রের সরাসরি আর্থিক এবং সামরিক মদদে মাওবাদী সিরাজ শিকদারের সর্বহারাদল, কমরেড আব্দুল হকের ইপিসি এম. এল, কমরেড তোহার কমিউনিস্ট পার্টি, পাকিস্তানের সরাসরি অর্থপুষ্ট মেজর জলিল এবং আসম আব্দুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের গণবাহিনী সারাদেশে হত্যা, খুন আর লুটপাটের মাধ্যমে যুদ্ধবিদ্ধস্ত সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে এক ভয়াবহ অরাজক অবস্থার সৃষ্টি করে। শান্তিপ্রিয় সাধারণ জনজীবনকে এরা ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে। মানুষ ভয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে পালিয়ে বাঁচতে চেষ্টা করে। বিদেশি আদর্শে এবং অর্থেপুষ্ট এই বিপথগামীদের বারবার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও এরা বঙ্গবন্ধুর কথায় কর্ণপাত না করে খুন-খারাবি চালিয়ে যেতে থাকে। এই লুটেরা, খুনিদের দেশপ্রেমিক বলে অনেকেই খোঁড়া যুক্তি দিয়ে থাকেন।

এই প্রেক্ষাপটে দেশ এবং জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করে বঙ্গবন্ধু সাময়িকভাবে একটি জাতীয় দল গঠনে উদ্যোগী হন। কিন্তু অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীদের কর্মকান্ড তাতে থেমে থাকেনি। সদ্য স্বাধীন দেশে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে তারা বাংলাদেশের স্থপতিকে হত্যা করেছে। এই হত্যার পেছনের কারণ গুলি কি তা আজ আর অজানা না থাকলেও আমাদের দেশের নোংরা রাজনীতির ধারক-বাহকরা হত্যার কারণ হিসেবে কতগুলো সাধারণ যুক্তি হাতড়ে বঙ্গবন্ধুর দোষত্রুটি খুঁজে বের করতে প্রয়াসী হয়। কেউ কেউ মেজর ডালিমের সঙ্গে শেখ কামালের ব্যক্তিগত ঝগড়ার কথা বলে। কেউ আবার আত্মীয় স্বজনদের জড়িয়ে কাল্পনিক, বানোয়াট গল্প ফেঁদে মিথ্যা দোষারোপ করে থাকে যা কেবলই বালখিল্য এবং রুচিহীনতারই পরিচায়ক।

মনে রাখতে হবে খুনি চক্র শুধুমাত্র টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেয়া শেখ মুজিবকে হত্যা করেনি। হত্যা করেছে বাংলাদেশের স্থপতিকে। স্বাধীনতার ফসল- অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে। বঙ্গবন্ধু যখন বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তুলতে ব্যস্ত তখন খুনি চক্র দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বঙ্গবন্ধু পরিবারের নামে নানানভাবে বদনাম রটনায় ব্যস্ত। এ সম্পর্কে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলাম তার ‘Making of a Nation Bangladesh’ বই তে লিখেছেন- ‘The rum ours and newspaper reports about inappropriate behavior  or misdeeds of his relatives pained him. In this context, I recount an incident. Sheikh Kamal- his eldest  son- participated  in student politics very actively. Reports  about  kamal were too close to his person and were smearing his reputation. I suggested  that kamal should  be  sent abroad for higher studies so that he could be away from this tense environment, and at the same time he could prepare for a career, perhaps a political one. Sheikh Mujib agreed that it was desirable but that he had no resources to finance such a venture.’ (page 179). অর্থাৎ বর্ণিত ইংরেজি শব্দগুলোর বাংলা করলে মোটামুটি যা দাঁড়ায় তা হলো-‘বঙ্গবন্ধুর আপনজনদের বিরুদ্ধে তখনকার খবরের কাগজের মিথ্যা রিপোর্ট এবং মিথ্যা প্রচারণা বঙ্গবন্ধুকে ভীষণ কষ্ট দিত। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা তিনি স্মরণ করেন। বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। এবং কামালের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কারণেই তার সুনাম ক্ষুন্ন হত। এই উত্তেজনাকর অবস্থা থেকে শেখ কামালকে দূরে রাখতে তিনি তাকে বিদেশে লেখাপড়ার জন্য পাঠিয়ে দিতে বললেন। বঙ্গবন্ধু একমত হয়েও বললেন- ছেলেকে বিদেশে পড়াবার মত আর্থিক সঙ্গতি তার নেই। বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবার অগাধ সম্পদের অধিকারী বলে যখন অপপ্রচার চলছে তখন প্রকৃতপক্ষেই তিনি ছিলেন কপর্দকহীন।

গত ১৪ মে ২০১৭ রোববার রাত ১০টায় ডিবিসি টেলিভিশনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে কথা বলছিলেন। অনুষ্ঠানে একা থাকার কারণে নানা সত্য-মিথ্যা বলে প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে ধুয়ে দিচ্ছিলেন। উপস্থাপিকা নবনীতা চৌধুরীর এক প্রশ্নের উত্তরে অপ্রাসঙ্গিকভাবে পুরাতন এক মিথ্যাচারের অবতারণা করে বললেন- ‘অতীত নিয়ে কথা বললে তো ১৯৭২-৭৫ আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের কথা বলতে হয়- দুর্ভিক্ষও হয়েছিল।’ এই যে মিথ্যাচার, এটা হলো বিএনপি’র রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ক্ষমতা দখলের পর সামরিক শাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের এজেন্ট এবং পাকিস্তানের দালালরা অর্থের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু পরিবার এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে-মিথ্যা, বানোয়াট এবং কাল্পনিক গল্প ফেঁদে দেশের সর্বত্রে গোয়েবলীয় কায়দায় অপপ্রচার করতে থাকে। যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশ, দু’লক্ষ মা-বোনের আর্তচিৎকারে কাতর, ধ্বংসপ্রাপ্ত সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশ। খাদ্যশূন্য, টাকশালশূন্য। মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই, ধ্বংসপ্রাপ্ত হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট। গোটা বাংলাদেশ যেন একটা ধ্বংসস্তূপ! এই ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে কপর্দকহীন জাতির পিতা যখন শুন্য হাতে দেশ পুনঃনির্মাণের জন্য টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ছুটে বেড়াচ্ছেন ঠিক তখনই স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানী দালালরা তাকে হত্যার পরিকল্পনা এঁটেছে।

দুঃখের বিষয়, আজও শেখ মুজিবের প্রকাশ্য শত্রু পাকিস্তান এবং তার সহযোগী দালাল ওই খুনি-লুটেরা স্বগোত্রীয় উগ্রবামদের মির্জা ফখরুলরা চিনতে পারে না কিংবা চিনেও নাচেনার ভান করে। একথা সত্য, বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে মার্কিন-পাকিস্তানী দালাল খন্দকার মোস্তাক, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, শাহ মোয়াজ্জেম, কে.এম. ওবায়দুর রহমান, মেজর ডালিম, কর্নেল ফারুক, কর্নেল রশীদ এবং মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান গং সরাসরি জড়িত ছিল এবং এরা সকলেই বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের লোক ছিলেন। খন্দকার মুস্তাক যেমন জড়িত ছিল, তেমনি জেনারেল জিয়াও এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য খন্দকার মুস্তাকের কথা ফখরুল সাহেবরা গলা ফাটিয়ে বললেও জিয়াউর রহমানের নাম কেউ মুখে নিলেই তারা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেন। আরে বাবা ঘটনা তো তোমাদের জন্মের আগের। তখন জিয়াউর রহমান তার বেগম সাহেবাকে নিয়ে মাঝে মাঝেই ৩২ নম্বরে যেতেন। কারণ- খন্দকার মুস্তাকের মত জিয়াউর রহমানও বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষ ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানকে পরাজিত করে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ গঠন এবং বাঙালির প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতাই যে, জাতির পিতাকে হত্যার একমাত্র কারণ তা তো সত্যি। পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে সে কথা তো কারো অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশ-বিদেশের কোটি কোটি মানুষ শেখ মুজিবের হত্যাকারীদের পরদিনই চিনতে পেরেছিল। পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাঁস হয়ে যাওয়া গোপন দলিল থেকে এর প্রমাণও মিলেছে। তারপরও এইসব অন্ধ, একপেশে মানুষগুলো আজও নানাভাবে সত্যকে ধামাচাপা দেবার জন্য লেখালেখির মাধ্যমে মানুষকে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত করে চলেছে।

সম্প্রতি ফাঁস হওয়া মার্কিন গোপন দলিল বলছে- ‘১৯৭৪ সালে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে শেখ মুজিব যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করছিলেন তখন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান তার বাসভবনে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ফারুক রহমান- খন্দকার রশীদ (পরস্পর আত্মীয়) কে নিয়ে মিটিং করছিলেন। দেশীয় মীরজাফরদের যোগসাজশে ১৯৭৪ সালের বিজয় দিবসের আগেই বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাতের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে জানা যায়। তখনকার প্ল্যানিং কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর নুরুল ইসলাম তার লেখা ‘Making of a Nation’ বইতে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সম্পর্কে কী বলেছেন চলুন দেখি- The most memorable  meeting of course, took place prior to my departure from planning commission. My departure not yet officially confirmed. Though widely rumored. One of those days the late Ziaul hoq, a mutual friend, came with a request that Zia very much wanted to meet with me informally to discuss a few matters of common interest. I was quite curious to know what Zia had to say. The meeting with Zia took place in HuqÕs house which was cleared of every one including Huq himself and his family. The main theme of a rather short meeting was that he had heard about my desire to leave and was eager to persuade me not to do so. He recognized that I was not able to do my best or what was appropriate in the interest of the economy. He understood that the economy was in dire straits. However, he was confident that in the not too distant a future, the situation would improve and the prevailing drifts and uncertainty would disappear. Therefore, I should not despair and should be able to devote my energies to the task of planning and development with full commitment and strong support from the top leadership. He strongly urged that I should reconsider my decision to depart and stay on my job.

I was surprised by the tenor of his talk and the confidence with which he spoke about the restoration of political and economic stability. Clearly it was a sign of abnormality of the times that an army General was so intensely interested in the  political and economic development as to seek out and peruse contact with people engaged in managing the economic and political life of the country. It was an expression of his deep interest that led him to engage in a serious discussion about current state of the country with the head of the planning  commission and to confidently predict-rather assure me about the  future political development and my prospective role on it.  বাংলায় মোটামুটি অর্থ হলো- ‘প্লানিং কমিশন ছেড়ে যাবার আগে- নিশ্চুই সেটা ছিল এক অবিস্মরণীয় মিটিং। চলে যাবার খবর জানাজনি হলে জেনারেল জিয়া তার ভাষায় আমাদের দুজনের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে আমার সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনার জন্য দেখা করতে আগ্রহী বলে আমাদের উভয়ের বন্ধু জিয়াউল হক তার বাসায় বসার জন্য অনুরোধ জানায়। আমারও জানার ভীষণ আগ্রহ হলো, জিয়া কী বলবেন? হক এবং তার পরিবারের সদস্যদের বাদ দিয়ে মিটিং হলো। মিটিং এর সার সংক্ষেপ হলো- ‘জিয়া জানতে পেরেছেন আমি স্বাধীনভাবে যথাযথ কাজ করতে পারছি না বলেই চলে যাচ্ছি। জিয়া বললেন, দেশে অর্থনৈতিক দূরাবস্থা আছে। তবে আমি নিশ্চিত নিকট ভবিষ্যতে তা থাকবে না এবং শীঘ্রই সব দুর্যোগ কেটে যাবে। তখন আপনি দেশের প্রধান নেতৃত্বের কাছে প্রয়োজনীয় সকল সহযোগিতা পাবেন। কাজেই আপনি যাবার বিষয় পুনর্বিবেচনা করবেন এবং চাকরিতে থাকবেন’। ‘রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা নিশ্চিতভাবে স্থিতিশীল হয়ে যাবে’- জিয়ার মুখে একথা শুনে আমি বিস্মিত হলাম। একজন সেনাবাহিনীর জেনারেল দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়ে গভীর আগ্রহ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলা যা স্বাভাবিক ছিল না। পরিকল্পনা কমিশনের প্রধানকে আশ্বস্ত করে খুব আস্থার সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণী করা ‘দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতভাবে ঠিকঠাক হয়ে যাবে’ তাও অস্বাভাবিক ছিল’। পাঠক এর পরও কী বলবেন জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না?
শেখ মুজিব ছিলেন বঙ্গবন্ধু, আমাদের স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি মহাপুরুষ, মহামানব। তার আদর্শ ছিল এদেশ, এদেশের মাটি আর মানুষ এবং অর্থনৈতিক সমতার ভিত্তিতে সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা। কাল মার্কস কিংবা মাওসেতুং নয়। তাই মার্কস কিংবা মাওসেতুং এর অনুগামীদের রাজনীতি স্বাধীনতা উত্তরকালে দেশের ভালোর জন্য, গণমানুষের মঙ্গলের জন্য ছিল বলে আমার অন্তত মনে হয়নি কখনও।

নতুন প্রজন্মের আবগতি ও উপলব্ধির জন্য তখনকার সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ সাময়িকী ‘নিউজউইক’ কী বলেছে তার কিছু অংশ তুলে ধরছি, যাতে মিথ্যা প্রচারকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হয়-

১. ‘কবিরা যে দেশকে ‘সোনার বাংলা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন বা প্রশংসা করেছেন সেই দেশটি আজ বসবাসের জন্য নরকে পরিণত হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দেশটিতে মৌসুমি বন্যার মতো দুর্ভিক্ষ, রোগ-ব্যাধি এবং গৃহযুদ্ধ লেগেই ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যে দুর্দশা বাঙালিদের উপর পতিত হয়েছে অতীতে এদেশের জনগণ তা প্রত্যক্ষ করেনি। একটি প্রলয়ংকরী সাইক্লোন বয়ে গেছে দখলদার পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে এবং সর্বশেষ একটি নৃশংস যুদ্ধ। …যুদ্ধের ফলে বাংলাদেশ যেন ধ্বংসস্তূপের জাতিতে পরিণত হয়েছে…এর অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে…কোষাগার শূন্য। নতুন বাংলাদেশের গর্ব এবং জাতীয় বীর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার পরিচালিত হলেও দেশের পর্বত প্রমাণ সমস্যা মোকাবেলা করতে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে।…এটা হতবুদ্ধিজনক যে, সামগ্রিকভাবে বিশ্বের সব দেশ বাংলার নতুন সমস্যা উপলুব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এটা বাঙালিদের জন্য হুমকিস্বরূপ।’

২. ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষ পরিবর্তনের শিকার’- এই মন্তব্য করে ঢাকায় জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রমের পরিচালক সুইজারল্যান্ডের টনি হেগেন বলেন, ‘এটি পরিমাপের কোন মাপকাঠি নাই। অতীতে বিশ্বে এধরনের ভয়াবহতা লক্ষ্য করা যায়নি।’ এরপরও যুক্তরাষ্ট্র বলছে বড় ধরনের কোন বিপর্যয়ের আশংকা নেই। তাই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত মানবিক সাহায্যের ৬০ শতাংশ বাতিল করেছে। একারণে জন এফ কেনেডি মার্কিন প্রশাসনের উপর প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হন এবং বলেন- ‘প্রশাসনের এই নীতি সত্যকে বুঝতে অস্বীকার করে।’ এর কয়েকদিন আগে ‘নিউজউইক’-এর সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে কেনেডি বলেন- ৩. ‘প্রশাসন প্রতিদিন ত্রাণ বরাদ্দ আটকে রাখছে। এর অর্থ প্রতিদিনই সদ্যজাত দরিদ্র দেশটির মানুষের দুর্দশার মাত্রা বাড়ছে। ১.২.৩. (নিউজউইক ২৭ মার্চ ১৯৭২)।

প্রিয় পাঠক, সেদিন মুক্তিযুদ্ধে আমাদের নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে পাকিস্তানকে অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য করেই মার্কিন প্রশাসন ক্ষান্ত হয়নি। স্বাধীনতার পর দেশে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে প্রায় ২২ হাজার মানুষকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিতেও এরা কোন দ্বিধাবোধ করেনি- মির্জা ফখরুলরা খন্ডিত চিত্র দেখিয়ে, এই কথাগুলোর চর্বিত চর্বণ করে আত্মতৃপ্তি পেতে চেষ্টা করে।

 

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ বেতার।