বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

প্রকাশিত :২০.০৬.২০১৭, ৫:৩৫ অপরাহ্ণ
  • মাহমুদুল হাসান তুষার

বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’। বাঙালি জাতির স্বাধীনতা অর্জনের জন্য রোপিত প্রথম বীজ এটি। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মাত্র ১৪ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করে। হাটি হাটি পা পা করে জাতির পিতার সন্তানতুল্য এই সংগঠনটি আজ দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বাপেক্ষা কর্মতৎপরতম ও বৃহত্তম ছাত্রসংগঠন।

জাতির সেবা, প্রতিকূল পরিবেশে হাল ধরা, দুর্যোগ-দুর্দিনে গণমানুষের সহায়তা দানের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ছাত্রলীগ।

যুগে যুগে বাঙালি জাতির ভাগ্যে যখনই নেমে এসেছে দুর্যোগের ঘনঘটা, দুর্দিনের কালো মেঘ, তখনই এগিয়ে এসেছে ছাত্রলীগ। দুর্যোগ, সে প্রাকৃতিক হোক আর মানবসৃষ্ট, সামাজিক হোক আর রাজনৈতিক- সর্বাবস্থায় ছাত্রলীগ আগে। ঘরপোড়া কৃষকের অশ্রু মুছেছে ছাত্রলীগ, পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো তরুণের লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিল করেছে ছাত্রলীগ, ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারানো লাশের দাফন করেছে ছাত্রলীগ।

১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ে দশ লাখ লোকের দাফন, লাশের পঁচা গন্ধ, লাখে লাখে স্বজন হারানো বুভুক্ষু বাঙালির রোনাজারিতে দেশের দক্ষিণাঞ্চল মহামারীতে ভুগছিল, পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তখনও বিদেশ সফরে ব্যস্ত। সাত দিন পরে সরকারের ত্রাণের আকাড়া পৌঁছে। ইতিহাসের এই ক্রান্তিলগ্নে, গণমানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ আর ছাত্রলীগের কর্মীরা। জনগণ তার প্রতিদান দিয়েছিল নির্বাচনে।

১৯৮৮ সালের দীর্ঘস্থায়ী বন্যা চলাকালীন সময়ে দেশের শতশত স্কুল-কলেজে তিনবেলা নিজ হাতে রুটি তৈরি করে ক্ষুধার্ত বুভুক্ষের মুখে খাবার তুলে দিয়েছে বঙ্গবন্ধুর এই সৈনিকেরা। ১৯৯১ ও ২০০৪ এর সাইক্লোন, ১৯৯৮, ২০০৪, ২০০৭, ২০১১ এর বন্যা থেকে শুরু করে দেশের ছোট বড় ও মাঝারি আকারের প্রতিটি দুর্যোগে জনগণের দুঃসময়ে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বীর সৈনিকেরা।

জরুরি মুহূর্তে রক্ত সংগ্রহের কাজে ছাত্রলীগ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। গত জানুয়ারিতে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একদিনে ৪০০ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করা হয়েছিলো।

২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে পড়লে সেখানকার উদ্ধার কাজেও ছাত্রলীগের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করার মত। আহত রোগীদের জন্য জরুরি রক্তের সিংহভাগের যোগান দিয়েছে ছাত্রলীগকর্মীরা।

চলতি বছর হাওরের দুর্গতদের পাশে আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবকলীগ ও যুবলীগের পাশাপাশি ছাত্রলীগ টিমের অংশগ্রহণ ছিলো চোখে পড়ার মত।
অতিবৃষ্টির ফলে চলন বিলের ধান ডুবে যাবার উপক্রম হলে কাস্তে হাতে কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছে মুজিব-সৈনিকেরা। মাঠে ধান কেটে মাথায় বহন করে কৃষকের বাড়ি পৌঁছেছে। চিন্তিত কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে ছাত্রলীগ।

‘ঘূর্ণিঝড় মোরা’ মোকাবেলায় প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মেডিকেল টিম। উখিয়া, টেকনাফ, কুতুপালংয়ের শতশত মানুষ ফ্রি ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছে সম্প্রতি।

গত সপ্তাহে প্রলয়ঙ্কারী পাহাড় ধসে মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হলে সেখানেও ছুটে যায় ছাত্রলীগের ত্রাণ সহায়তা টিম।

দীর্ঘস্থায়ী দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসকল্পে ও পরিবেশ রক্ষার অংশ হিসেবে ছাত্রলীগ ‘বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচি শুরু করেছে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি- সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশে কুড়িগ্রাম থেকে এই বৃক্ষরোপণ প্রোগ্রাম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ছাত্রলীগ একটি সম্ভাবনার উৎস। দেশের জরুরি মুহুর্তে স্বেচ্ছাসেবা প্রদানের জন্য রয়েছে ৬ লাখ পদাধিকারীসহ প্রায় এককোটি কর্মী সমর্থক। বাংলাদেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রয়েছে ছাত্রলীগের শক্তিশালী কমিটি। তৃণমূলে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলায় রয়েছে সুসংগঠিত ইউনিট কমিটি। আছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশেষ ইউনিট ও কেন্দ্রীয় সংসদ।

আমি দুর্যোগ ব্যবস্তাপনা ইনস্টিটিউটের ছাত্র হিসেবে মনে করি, দেশের সামগ্রিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের এতগুলো সংঘবদ্ধ তরুণ নিঃসন্দেহে একটি অনেক বড় শক্তি। দেশের যেকোন দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় শক্ত হাতে জাতির হাল ধরতে সক্ষম এই সংঘবদ্ধ শক্তি। কাজেকর্মে ছাত্রলীগ তার এই সক্ষমতার পরিচয়ও দিয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে।

গণমানুষের দুর্দিনে স্বেচ্ছাসেবার যে নজির ছাত্রলীগ রেখে চলছে তা যেকোন রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ববহ।

দুর্যোগপূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে বর্ষাকালে সাঁকো নির্মাণ, সাইক্লোনের পূর্বমুহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকি সাথে নিয়ে সাইরেন বাজিয়ে জনগণকে সতর্কতা প্রদান, দুর্যোগে অবরুদ্ধ রাস্তাঘাট পরিষ্কারে কোদাল কাঁধে বেরিয়ে পড়াসহ দুর্যোগ মোকাবেলায় ছাত্রলীগ যেভাবে অবদান রেখে আসছে, অন্য কোন সংগঠনের ক্ষেত্রে তা চোখে পড়ে না।

বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ম শেখ হাসিনার ‘ভিশন-২১’ মাইল ফলক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। আর বিদ্যানন্দিনী দেশরত্ম শেখ হাসিনার ‘ভিশন-২১’ ও ভিশন-৪১ বাস্তবায়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে ছাত্রলীগ। দুর্যোগ মোকাবেলায় ছাত্রলীগের প্রচেষ্টা এই বৃহত্তর কর্মকাণ্ডেরই অংশ। ছাত্রলীগের এহেন কর্মকাণ্ডই নির্দেশ করে জাতির জনক যে মহান উদ্দেশ্য ও আদর্শ নিয়ে তার পুত্রপ্রতিম এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ছাত্রলীগ সেটা ধারণ করেই সম্মুখে এগিয়ে চলছে।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, স্যার এএফ রহমান হল ইউনিট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।