মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন
মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন

খালেদা জিয়ার সহায়ক সরকার ও কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা!

প্রকাশিত :১০.০৭.২০১৭, ৮:০৭ অপরাহ্ণ
  • মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন
    ক’দিন আগে বিচারপতি লতিফুর রহমান মারা গেলেন। কি হয়েছিল জানি না। পত্রপত্রিকায় তেমন কিছু লেখেওনি। হতে পারে বয়সের কারণে স্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু তার আপনজনদের মাঝ থেকেও তেমন শোকবার্তা চোখে পড়েনি।

বিচারপতি লতিফুর রহমান ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তার সন্দেহজনক কর্মকান্ড প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার একপেশে আচরণে ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এবং প্রকাশ্যে প্রধান উপদেষ্টার সমালোচনায় মুখর হয়।

অন্যদিকে বিএনপি বিচারপতি লতিফুর রহমানের কর্মকান্ডে যারপরনাই প্রীত হয় এবং সকল নিয়ম ভেঙ্গে তার পক্ষে বক্তব্য প্রদান করতে থাকে। জনগণও অবাক বিস্ময়ে প্রধান উপদেষ্টার অদ্ভুত পক্ষপাতমূলক কর্মকান্ড অবলোকন করে।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সরকার এবং দেশ পরিচালনার পর সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তথাকথিত নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এই ক্ষমতা হস্তান্তর ছিল নজিরবিহীন। অথচ ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন থেকেই কোন কালক্ষেপণ না করেই বিচারপতি লতিফুর রহমান বেগম খালেদা জিয়ার সহায়ক সরকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বাংলাদেশ বেতারের উপ-মহাপরিচালক এবং তখন নিয়োগপ্রাপ্ত তার প্রেস সেক্রেটারি মোহাম্মদ মুহাদ্দিস এর পরামর্শ মোতাবেক পূর্ব নির্ধারিত ছক অনুযায়ী তিনি নিজ দপ্তর সাজালেন। একই ছক অনুযায়ী রাতারাতি এক ডজনেরও বেশি সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তার দপ্তর বদল করা হলো। কয়েকদিনের মধ্যে সারা বাংলাদেশের প্রশাসন ওলটপালট করে দেয়া হলো। ভয়াবহ এই পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে সারাদেশের প্রশাসন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল।

কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যেন একেকজন বিএনপি কর্মী হয়ে উঠল। মুহাম্মদ মুহাদ্দিস, লতিফুর রহমানের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে যোগদানের দিনই বেতার সদর দপ্তরের চেহারা বদলে গেল। দোতলায় গিয়ে দেখলাম আপেল মাহমুদের দৃপ্ত পদচারণা (দৃশ্যত প্রতিমন্ত্রী কোণঠাঁসা করে রেখেছিলেন)। মনে হলো মহাপরিচালক থেকে শুরু করে সবাই যেন বিএনপির কর্মী।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি এম মুহাদ্দিস প্রত্যেক দিন বেতার সদর দপ্তরে দুপুরের খাবার খেতে আসতেন। আপেল মাহমুদ এর বিশাল কক্ষে রাজকীয় খাবারের ব্যবস্থা হত। প্রধান ফটক থেকে শুরু করে বেতার সদর দপ্তর চত্বর তার আগমনের অপেক্ষায় সদা প্রস্তুত থাকত।

নির্বাচন হলো। যথারীতি লতিফুর রহমানের সহায়ক সরকারের সহায়তায় বিএনপি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলো। শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বললেন- কারচুপি হয়েছে। কিন্তু তাতে কী? কারচুপির হোতাদের টিকিটি ছোবার ক্ষমতা কার? বরং এই মহাকারচুপির মাস্টারমাইন্ড এম মুহাদ্দিস প্রাথমিক পুরষ্কার হিসেবে নতুন প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার প্রেস সেক্রেটারির পদ অলংকৃত করলেন। তিনি এ পদে যে খুব বেশিদিন থাকবেন না তা আমাদের জানা ছিল। কারণ তার জন্য আরও আর বড় পুরস্কার অপেক্ষা করছিল। এম. মুহাদ্দিস তিন মাস পর ঠিকই বেগম খালেদা জিয়ার আশীর্বাদে সেই কাক্সিক্ষত পুরস্কার ‘প্রেস মিনিস্টার হয়ে’ ওয়াশিংটন ডিসি তে পোস্টিং পেলেন। অবশ্য সঙ্গী বন্ধু মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) এম.আই. চৌধুরি এবং উপ-মহাপরিচালক (বার্তা) এ,কে ফেরদৌসিও বিএনপি সরকারের আশীর্বাদ থেকে বাদ পড়লেন না। কদিনের মধ্যেই এম.আই চৌধুরী হলেন তথ্য সচিব এবং ফেরদৌসি হলেন বেতারের মহাপরিচালক।

বাংলাদেশ বেতারে আমার সিনিয়র সহকর্মী উপমহাপরিচালক মোহাম্মদ মুহাদ্দিস রেডিও পাকিস্তানে ‘টকস অফিসার’ পদে চাকরিতে যোগদান করেন। এটি ছিল ‘ব্লক’ পদ। পাকিস্তান ফেরত এম. মুহাদ্দিস সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের কল্যাণে, বিশেষ আদেশবলে সহকারী পরিচালক পদে আত্মীকৃত হন। তাই তিনি জেনারেল জিয়া এবং বেগম জিয়া তথা বিএনপি’র একনিষ্ঠ সেবাদাস, মুক্তিযুদ্ধ বিদ্বেষী এবং প্রচন্ড আওয়ামী লীগ বিরোধী ছিলেন। শুধু তিনি না তার চাচাত ভাই বেতার কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোজাক্কেরও (এনটিভি তে কর্মরত) ঘোর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এবং আওয়ামী লীগ বিরোধী সকলেই জানেন। টের পেতাম এবং বুঝতাম এরা মুক্তিযোদ্ধাদের মানে আমাদের ঘৃণা করে। অথচ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ এর সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত বিএনপি’র এই শক্তিশালী ক্যাডাররা (দৃশ্যত আপেল মাহমুদ ছাড়া) বেতারে রাম রাজত্ব করে এবং সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা ভোগ করত।

মহাপরিচালক এম আই চৌধুরী, উপ-মহাপরিচালক (অনুষ্ঠান) মোহাম্মদ মুহাদ্দিস, উপ-মহাপরিচালক (বার্তা) এ কে ফেরদৌসিসহ বেতার সদর দপ্তরের ৮০ ভাগ কর্মকর্তা আওয়ামীবিরোধী ছিল। কর্মচারীদের মধ্যে পাকিস্তান ফেরত ক’জন ছাড়া সকলের চাকরি ৭৫ পরবর্তী সামরিক শাসনামলে। বাকি শুন্যপদ যা ছিল বিএনপি ১৯৯১-১৯৯৬ সময়ে নিজেদের লোকদের দিয়ে পূরণ করে। ইদানীং শুনছি- আওয়ামী লীগের এমপিরা টাকা খেয়ে বিভিন্ন বিভাগে শুন্যপদে জামায়াত-বিএনপি ক্যাডারদের চাকরি দিচ্ছে। কিন্তু বিএনপির আমলে একজন আওয়ামী লীগ কর্মী তো দূরে থাক সমর্থকও চাকরি পেয়েছে বলে মনে হয় না।

এ প্রসঙ্গে একদিনের কথা মনে পড়ে। ২০০২ সাল। আমার এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ে দেখা হলে আমাকে খানিকটা জোর করে ধরে নিয়ে মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের এপিএস নুরুজ্জামানের (তখন সিনিয়র সহকারী সচিব বর্তমানে সম্ভবত যুগ্ম সচিব) রুমে বসিয়ে মন্ত্রীর রুমে ঢুকে গেল। যাবার আগে আমাকে চা খাওয়াবার জন্য নুরুজ্জামানকে বলে গেল। চা খাচ্ছি। একজন এসে নুরুজ্জামানকে বলল স্যার রাজশাহীর এসপি’র টেলিফোন। সালাম বিনিময়ের পর নুরুজ্জামান যা বলল তার সারমর্ম টাকা খান পয়সা খান অসুবিধা নাই কিন্তু পুলিশে মন্ত্রী মহোদয় একজন আওয়ামী লীগের কর্মী তো দূরে থাক সমর্থক কেও দেখতে চান না। এজন্য প্রয়োজনে আমাদের ইউনিয়ন থেকে থানা লেভেলের নেতা কর্মী সার্টিফিকেট দেবে। ওদের মন্ত্রী মহোদয় বলে দিয়েছে সার্টিফিকেট দেবে, টাকা খাবে কিন্তু আওয়ামী লীগ একটা যাবে না। গেলে সবাইকে ধরা হবে। আর আপনি অর্ধেক টাকা নেতা কর্মীদের জন্য ছাড় দিবেন। আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীরা, বিভিন্ন অফিস আদালতে চাকরিরত দলের একনিষ্ঠ কর্মী সমর্থকদের চেনেন না, চিনতে চান না। ক্ষমতায় বসে চোখ উল্টে যায়। তখন খুঁজেন আত্মীয়-স্বজন কিম্বা পিয়ারের দোস্তদের। আদর্শিক দ্ব›দ্ব যতই থাক আত্মীয়-বন্ধু বলে কথা। অন্যদিকে বিএনপি’র নেতা/মন্ত্রী নিজেদের সমর্থকদের খুঁজে বের করে।

পাঠক এপ্রসঙ্গে বিএনপি আমলের একটি এবং আওয়ামী লীগ আমলের একটি ঘটনা উল্লেখ করলেই বুঝা যাবে বিষয়টি। আমাদের এক সহকর্মী (উপ-পরিচালক) হামিদা খানম ১৯৯১ সালে চাকরিতে তড়িঘড়ি অবসর নিয়ে বাংলাদেশ সমবায় সমিতির নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান পদে যোগদান করলেন। এক বন্ধুর কাছে জানলাম- হামিদা আপার স্বামী বিএনপি নেতা তাই এই পদে তার যোগদান। হামিদা আপা বহাল তবিয়তে রাজকীয় সুযোগ সুবিধা ভোগ করে চাকরিতে ছিলেন ২০০০ সাল পর্যন্ত। আওয়ামী লীগ তার টিকিটি ধরতে পারেনি। অন্যদিকে ১৯৯০ সাল থেকেই অধ্যাপক আবু সাইয়িদ আমাকে চিনতেন। কারণ আমি আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল ভাইয়ের কাছে মাঝে মাঝেই ১৫ নং রোডস্থ আওয়ামী লীগ অফিসে যেতাম। একদিন জলিল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে আসছি আবু তৈয়ব তথ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা (আমার ছোট ভাইয়ের মত, বর্তমানে বসুন্ধরা গ্রুপ অব কোম্পানিজ এর কর্মকর্তা) সেতাব ভাই বলে ডাক দিল, আমাকে অধ্যাপক আবু সাইয়িদ এর কক্ষে একরকম জোর করেই নিয়ে গেল এবং পরিচয় করিয়ে দিল। বঙ্গবন্ধু ওকে পাবনার গভর্নর করেছিলেন তাই নাম জানতাম। অধ্যাপক সাহেব বসতে বললেন এবং চা অফার করলেন। ধন্যবাদ দিয়ে বললাম জলিল ভাইয়ের ওখানে একটু আগেই চা খেয়েছি। আমি উঠবো। তিনি অনুরোধ করলেন বেতারের বার্তা বিভাগ থেকে নিয়মিত প্রকাশিত ‘নিউজ লেটার’ এর একটি করে কপি কোনভাবে তাকে ব্যবস্থা করে দেবার জন্য (তখন তার পিয়ারের দোস্ত মো. ফারুককে একাজের জন্য তিনি খুঁজে পাননি)। বললাম আমি নিয়মিত কপি পাই। কিন্তু আপনাকে দেব কেমন করে? বললেন প্রত্যেক সপ্তাহে আমার লোক আপনার কাছে গিয়ে ৭ দিনেরটা নিয়ে আসবে। তারপর নিয়মিত নিউজ লেটার পাঠাতাম।

সেদিন শুক্রবার অফিস বন্ধ, ঈদের ছুটি, পরদিন ঈদ, সন্ধ্যায় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে আমার একটু জ্বরও। অধ্যাপক সাহেব টেলিফোন করলেন। গতকালের নিউজ লেটার তার দরকার। বললাম আমি বাসায় অসুস্থ, অফিস বন্ধ, গাড়ি ঘোড়া নাই, কীভাবে আপনাকে নিউজ লেটার দেব? তারপরও তিনি অনুরোধ করতে থাকলেন। বললাম ঠিক আছে লোক পাঠান দেখি কি করা যায়। সঙ্গে সঙ্গে বললেন তার ছেলেটি ঈদের ছুটিতে বাড়িতে গেছে। আমি বেবি ট্যাক্সি নিয়ে অফিসে গিয়ে প্রধান ফটক খুলিয়ে, আমার ঘরের দরজা খুলে নিউজ লেটার বের করে একই বেবী ট্যাক্সিতে ১৫ নং এ গিয়ে তার হাতে নিউজ লেটার দিয়ে ফিরে আসি। সেই তিনি ১৯৯৬ সালে প্রতিমন্ত্রী হয়ে আমাকে পদোন্নতি বঞ্চিত করেন। অথচ তিনি নিজ উদ্যোগে বিএনপির কট্টর সমর্থক, বিএনপি নেতা ড. মঈন খানের বোন জামাই, মো. ফারুককে সকল নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে দুটি পদোন্নতি প্রদানের ব্যবস্থা করেন। এই সুযোগে কর্তৃপক্ষ বিএনপির কট্টর সমর্থক আমার কনিষ্ঠ চারজন কর্মকর্তাকেও পদোন্নতি দিয়ে দেয়।

পাঠক হয়ত বলবেন, মন্ত্রী তো পদোন্নতি দেয় না। কিন্তু সত্য হলো- মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এদেশে পদোন্নতি যেমন হয় তেমনি বন্ধও হয়। বিএনপি সরকারের আমলে এই কুব্যবস্থা চালু হয়। নজমুল হুদা বেলাল মহাম্মদ এর পদোন্নতি বন্ধ করে তার কনিষ্ঠ আপেল মাহমুদ কে পদোন্নতি দেন। দুজনই মুক্তিযোদ্ধা। আর ১৯৯৪ সালে আমার কনিষ্ঠ মো. সালেম, ফিরোজ ইসলাম, ইমাম উদ্দিন এবং বাসার খান কে উপ-পরিচালক পদে আমাকে ডিঙিয়ে পদোন্নতি দেয়। ৭৫ পরবর্তী সময়ে আমি একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা এবং শহীদ পরিবারের সদস্য (পিতা এবং একমাত্র ভাই শহীদ) যার সামনে বেতারের কোন কর্মকর্তা কর্মচারী বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতাকে অসম্মান করে কথা বলার সাহস পেত না। আমরা যারা মুষ্টিমেয় ক’জন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং জাতির পিতার আদর্শের নির্ভীক সৈনিক, তাদের প্রতি কেন যেন অধ্যাপক সাহেবের বিমাতাসুলভ আচরণ অনুভব করতাম। আমি অনু ইসলাম, আশরাফুল আলম, আবু নওশের প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধারা মন্ত্রী মহোদয়ের সুদৃষ্টির বাইরে রয়ে গেলাম। বরং মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যারা বিএনপিপন্থী ছিল মো. ফারুক (ড. মঈন খান এর বোনের স্বামী), মো. ইমাম উদ্দিন (মান্নান ভুঁইয়ার বন্ধু) মো. সালেম, বাসার খান, ফিরোজ ইসলাম (তখন সকলেই সহকারী পরিচালক) প্রমুখ আওয়ামীবিরোধী মুক্তিযোদ্ধারা অধ্যাপক আবু সাইয়িদের সুনজরে ছিলেন। মো. ফারুক ছাড়া সকলেই চাকরিতে আমার এবং আশরাফুল আলমের জুনিয়র হওয়া সত্তে¡ও অধ্যাপক সাহেবের কল্যাণে তারা সকলেই আবারও পদোন্নতি পেয়ে গেলেন। এদের পদোন্নতি প্রদানের আগে আমি মন্ত্রী মহোদয়ের বাসায় গিয়ে দেখা করে বললাম- মো. ফারুক ছাড়া সকলেই আমার জুনিয়র হওয়া সত্ত্বেও বিএনপি আমলে ৯৪ সালে ওদের উপ-পরিচালক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে কিন্তু আমাকে পদোন্নতি দেয়া হয়নি। জুনিয়র হওয়া সত্ত্বেও পরিচালক পদে পদোন্নতি দেয়া হলে পুনরায় আমি ক্ষতিগ্রস্ত হব। আপনি কাগজপত্র দেখুন, সরকারি আদেশ দেখুন, জ্যেষ্ঠতার তালিকা দেখুন, যদি সব ঠিক ঠাক থাকে আমাকে দেবেন নইলে দেবেন না। আমি কোন বিশেষ সুবিধা চাচ্ছি না। আমি ন্যায় বিচার চাই।

অধ্যাপক সাহেব আমাকে শুনলেন, কোন কথা বললেন না। পরবর্তীতে কোন ব্যবস্থাও গ্রহণ করলেন না। পরিচয়ের সূত্র ধরে এর আগে একবার তার বাসায় গিয়ে চাকরিতে আমার জ্যেষ্ঠতা বিষয়ে কাগজপত্র দিয়ে এসেছিলাম। ধারণা করি তিনি সেগুলো দেখেননি। দুঃখজনক হলেও সত্য ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করার ক’দিন পরই আমাকে উপ-পরিচালক পদে পদোন্নতি প্রদান করে ১৯৯৪ সাল থেকে আমার কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদোন্নতির তারিখ থেকে কার্যকর করে মন্ত্রণালয় আদেশ জারি করে।

৯৪ সালে বিএনপি সরকারের মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে যে পদোন্নতি তখন হয়নি (আবু সাইয়িদ সাহেবকে ৯৬ সালেই তা বলেছিলাম কিন্তু তিনিও কিছু করেননি)। আদেশ হাতে পেয়ে আমি সঙ্গে সঙ্গে আমার ওই কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের পরিচালক পদে পদোন্নতির তারিখ থেকে পদোন্নতির জন্য আবেদন করি এবং মন্ত্রণালয়ে অগ্রিম কপি প্রেরণ করি। কিন্তু দুর্ভাগ্য ডি.পি.সি মিটিং অনুষ্ঠিত হবার আগেই বিএনপি সরকার গঠন করে। যা হবার তাই হয়। আমার পদোন্নতি বন্ধ করে তথ্যমন্ত্রী তরিকুল ইসলামের নির্দেশে দ্রুতই আমাকে রংপুরে বদলি করা হয়। প্রতিমন্ত্রী মন্ত্রী আলমগীর কবিরের সরাসরি হস্তক্ষেপে আমার সরকারি বাসা বরাদ্দ বাতিল করে একমাসের মধ্যে খালি করতে বাধ্য করা হয়। ক’দিন আগে আমার স্ত্রীর বড় ধরনের অপারেশন হয়েছিল, তাকে আত্মীয়ের বাড়িতে রেখে বাসা বদল করতে বাধ্য হয়েছিলাম।

একটা ঘটনা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পিতার ন্যায় বেতারকে খুবই গুরুত্ব দিতেন। সম্ভবত তার ইচ্ছায় সর্বপ্রথম একজন বেতার কর্মকর্তাকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পোস্টিং দেয়া হয়। উপ-মহাপরিচালক (বার্তা) জনাব এ,কে, ফেরদৌসি (বৈবাহিক সূত্রে প্রতিমন্ত্রীর আত্মীয়, অন্ধ বিএনপি সমর্থক) মনোনীত ‘নুরুল কবীর’ নামে একজন কট্টর বিএনপিকর্মী এবং সাবেক ছাত্রদল ক্যাডারের নাম মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ক্ষতিসাধন হতে পারে ভেবে আমি বার্তা বিভাগের ডেপুটি কন্ট্রোলার, নজরুল ইসলাম (আমার ছোট ভাইয়ের মতো, বর্তমানে উপ-প্রেস সেক্রেটারি, প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়) কে এই ভয়াবহ বিষয়টি বগুড়ার মান্নান ভাই এমপি’র সঙ্গে আলোচনা করার জন্য বলি ও আমাকে সঙ্গে নিয়ে ১৫ নম্বরে গিয়ে আলোচনা করেছিল। মান্নান ভাই (বর্তমানে এমপি) প্রতিমন্ত্রীর নজরে বিষয়টি এনেছিলেন। কিন্তু ফল হয় উল্টো। নজরুলকে রংপুর বদলি করা হয়। এই নুরুল কবীর ৫ বছর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অনেক গোপন তথ্য বিএনপি কে সরবরাহ করেছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে ভিকারুন নিসা নূন স্কুল কেন্দ্রে নুরুল কবীরকে ভোট দিতে দেখেছি। আমি ফুটপাত এ দাঁড়িয়ে থেকে দেখছিলাম ভোটের অবস্থা। লোকজন নেই। কিন্তু নুরুল কবির আছে। আমাকে দেখে মুচকি হেসে এগিয়ে এসে বলল, ভোট দিলাম।

বেগম খালেদা জিয়ার সহায়ক সরকারের কথা বলতে গিয়ে সকলের জানার জন্য লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সহায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণদের বিষয়ে কিছু সত্য তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছি। কারণ সর্ষের ভেতর ভুত থাকলে আপনি যত ভালই করেন, ফল উল্টো হতে বাধ্য। চক্রান্তকারীরা বসে নাই।
তাই সাধু সাবধান!!

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক, বাংলাদেশ বেতার।