লিউকোরিয়া নারীর একটি অস্বস্তিকর স্বাস্থ্য সমস্যা
লিউকোরিয়া নারীর একটি অস্বস্তিকর স্বাস্থ্য সমস্যা

লিউকোরিয়া: যে রোগটির কথা মেয়েরা বলতে চান না

প্রকাশিত :১৯.০৭.২০১৭, ২:৫৫ অপরাহ্ণ
  • সারাবেলা ডেস্ক : নারীরা গোপন কোন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগলেও লজ্জার কারণে তা বলেন না এমনকি চিকিৎসাও গ্রহণ করেন না। ফলে তারা এই রোগে ভুগতে থাকেন দীর্ঘদিন যাবত। লিউকোরিয়া নারীর এমনই একটি অস্বস্তিকর স্বাস্থ্য সমস্যা। লিউকোরিয়াকে সাদা স্রাব ও বলা হয়। এই সমস্যাটির ক্ষেত্রে মেয়েদের যোনীপথ দিয়ে সাদা বা হলুদ রঙের ঘন তরল বের হয়। সাধারণত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জীবাণু দূর করার জন্য ভ্যাজাইনাল ডিসচার্জ হয়ে থাকে এবং এটি থাকে স্বচ্ছ ও গন্ধহীন। কিন্তু লিউকোরিয়ার ক্ষেত্রে নির্গত তরল ঘন ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়। নারীর এই বিব্রতকর স্বাস্থ্য সমস্যাটির বিষয়ে জানবো আজকের ফিচারে।

সাদা স্রাব দুই ধরণের হয়ে থাকে – ফিজিওলজিক্যাল বা শারীরবৃত্তীয় ও প্যাথলজিক্যাল। উত্তেজনা বা স্নায়বিক দুর্বলতার কারণে ভেজাইনাল ডিসচার্জ হলে তাকে ফিজিওলজিক্যাল লিউকোরিয়া বলে। ফিজিওলজিক্যাল লিউকোরিয়া হয়ে থাকে যাদের– নবজাতক বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের হয়ে থাকে কারণ তাদের শরীরেও মায়ের মত ইস্ট্রোজেন হরমোন থাকে, মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালে, গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে এবং ডিম্বস্ফোটনের সময় এবং যৌন উত্তেজনার কারণে।

প্যাথলজিক্যাল লিউকোরিয়া হয়ে থাকে অপর্যাপ্ত পুষ্টি এবং খারাপ স্বাস্থ্যের কারণে। জনন নালীর অকার্যকারিতার কারণেও হয়ে থাকে প্যাথলজিক্যাল লিউকেরিয়া। কিছু ক্ষেত্রে শারীরবৃত্তীয় কারণেও হয়ে থাকে এই রোগ। অনেক নারীদেরই প্রসবের পরে লিউকোরিয়ায় আক্রান্ত হতে দেখা যায়, যার সাথে দুর্গন্ধ ও পিঠে ব্যথাও হয়, যা জরায়ুর সংক্রমণকে নির্দেশ করে।

লক্ষণ

লিউকোরিয়ার তীব্রতা একেকজন নারীর ক্ষেত্রে একেক রকম হয়ে থাকে। সাধারণ যে লক্ষণগুলো দেখা যায় সেগুলো হচ্ছে :

· সাদা বা হলদেটে ডিসচার্জ বের হওয়া

· নির্গত তরল ফেনার মত ও বাজে গন্ধযুক্ত হয়

· কোমরে ও পায়ে ব্যথা হয়

· ক্লান্ত ও দুর্বল অনুভব করা

· উদর অঞ্চল ভারী মনে হওয়া

· চুলকানি

· কোষ্ঠকাঠিন্য

· ঘন ঘন মাথাব্যথা হওয়া

· পরিপাকের সমস্যা

· বিরক্তভাব

· চোখের নীচে কালি পড়া

দীর্ঘমেয়াদী লিউকোরিয়ার ক্ষেত্রে বিরক্তিভাব এবং চোখের নীচে কালি পড়া সাধারণ লক্ষণ।

কারণ

অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে যদি শরীরে অস্বাভাবিক বিষাক্ত পদার্থ জমা হয় তাহলে কিডনি, উদর ও ত্বকের দ্বারা বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়া কঠিন হয়ে যায় শরীরের জন্য। ফলে শরীর এই বিষাক্ত পদার্থ দূর করে দিতে চেষ্টা করে ঘন ও দুর্গন্ধযুক্ত ভ্যাজাইনাল ডিসচার্জের মাধ্যমে। ক্রনিক লিউকোরিয়ার ক্ষেত্রে সাদা, হলুদ অথবা সবুজাভ স্রাব হয় এবং পুঁজও থাকতে পারে। লিকোরিয়ার সাধারণ কারণগুলো হচ্ছে :

· মনিলিয়াল ভ্যাজাইনিটিস, ট্রাইকোমোনাল ভ্যাজাইনিটিস বা সারভিসিটিস এর মত সমস্যার কারণে হতে পারে

· অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস

· হরমোনের ভারসাম্যহীনতা

· জননাঙ্গ পরিষ্কার না রাখা

· অতিরিক্ত চুলকানির কারণে আঘাত পাওয়া

· ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের সংক্রমণ হওয়া

· বদহজম

· কোষ্ঠকাঠিন্য

· রক্তশূন্যতা

· ডায়াবেটিস ও ম্যানোরেজিয়া (পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হওয়া)

· স্ট্রেস ও অ্যাংজাইটি

সাধারণত তরুণীদের পিরিয়ডের পূর্বে ও পরে হয়ে থাকে লিকোরিয়া। তাদের ক্ষেত্রে ময়লা, অন্ত্রের জীবাণু, ভেজা বা নোংরা অন্তর্বাস পরার কারণেও হতে পারে লিকোরিয়া। তরুণীদের ক্ষেত্রে মাসিক হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে হয়ে থাকে যখন মিউকাস মেমব্রেন ঘন থাকে। বয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে গনোরিয়ার মত স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে হয়ে থাকে লিউকোরিয়া।

প্রতিকার

লক্ষণ শনাক্ত করাই লিউকোরিয়ার নিরাময়ের প্রথম পদক্ষেপ। সঠিক কারণ নির্ণয়ের পরে চিকিৎসক সেবন করার জন্য ঔষধ দেবেন অথবা অয়েন্টমেন্ট বা ক্রিম ব্যবহারের জন্য বলবেন। কিছু ঘরোয়া উপায়ও লিউকোরিয়ার নিরাময়ের ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।

· ১ গ্লাস পানিতে ১ চামচ ধনের বীজ দিয়ে সারারাত রেখে দিন এবং সকালে খালিপেটে এই পানি পান করুন। ১ সপ্তাহ নিয়মিত পান করে দেখুন ভালো ফল পাবেন।

· ১ লিটার পানিতে ২-৩ চা চামচ মেথি বীজ দিয়ে আধা ঘন্টা সিদ্ধ করুন। এরপর এই পানীয়টি পান করুন।

ডায়েট

লিউকোরিয়ার নিরাময়ের ক্ষেত্রে ডায়েট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন টকদই খেতে পারেন। তাজা ফল ও সবজি আপনার দৈনিক ডায়েটের অংশ হবে। ফাইবার, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ সুষম খাদ্য গ্রহণ করা শুধু আপনাকে লিউকোরিয়া থেকে নিরাময় লাভ করতেই সাহায্য করবেনা বরং এর পুনরায় হওয়াও প্রতিরোধ করবে।

পরামর্শ

লিউকোরিয়ার সমস্যা প্রতিরোধের জন্য সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা উচিত। নিয়মিত অন্তর্বাস পরিষ্কার করুন। প্রতিদিন ব্যায়াম বা ইয়োগা করার চেষ্টা করুন। লিউকোরিয়া থেকে নিরাময় লাভ করার জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া প্রয়োজন।