মা অায়েশা ফয়েজ'র সঙ্গে ভালবাসাপূর্ণ মুহুর্তে হুমায়ূন আহমেদ। ছবি: সংগৃহিত
মা অায়েশা ফয়েজ'র সঙ্গে ভালবাসাপূর্ণ মুহুর্তে হুমায়ূন আহমেদ। ছবি: সংগৃহিত

হিমু চরিত্রটি হয়তো হুমায়ূন নিজেই: মা আয়েশা ফয়েজ

প্রকাশিত :১৯.০৭.২০১৭, ৪:১৬ অপরাহ্ণ
  • আয়েশা ফয়েজ। হুমায়ূন আহমেদের রত্মগর্ভা মা। বছর কয়েক আগে একটি সাক্ষাৎকারে নিজের দীর্ঘ জীবনের কথা বলেন। হুমায়ূন আহমেদ নিজেও সাক্ষাৎকারটি পড়ে প্রশংসা করেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী এই লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সাক্ষাৎকারটির ‘হুমায়ূন’ অংশ তুলে ধরছেন জব্বার হোসেন

জব্বার হোসেন: আপনার প্রথম সন্তান হুমায়ূন আহমেদ, আলোকিত মানুষ। প্রথম সন্তান হওয়ার স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতা যদি বলেন।

আয়েশা ফয়েজ: সবাই তখন অসম্ভব রকমের খুশি। আমার বাবার ছিল তিন ভাই। প্রত্যেকে আলাদাভাবে মিষ্টি নিয়ে এলো। খুব খাওয়া-দাওয়া, আনন্দ অনুষ্ঠান করল।
হুমায়ূনের বাবা পুলিশের চাকরি করতেন। জন্মের এক মাস পরে তার বাবা দেখতে এলেন। সবাই খুব উদ্গ্রীব হয়েছিল। তখন এভাবে কেউ সরাসরি এসে বাচ্চা দেখত না। পরে রাতের বেলা তিনি বললেন, জানো হুমায়ূনের জন্ম আর ইংল্যান্ডের রানির ছেলে চার্লসের জন্ম একই সময়ে। তিনি আবার অ্যাস্ট্রোলজি চর্চা করতেন। তার কথা শুনে আমি হাসলাম। তিনি বললেন, হাসলে কেন? বললাম, কোথায় ইংল্যান্ডের রানির ছেলে আর কোথায় আমার ছেলে।

তিনি বললেন, রানির ছেলে তো রানির যোগ্যতায় বড় হবে, আর তোমার ছেলে নিজের যোগ্যতায় বড় হবে। বরাবরই তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, তার ছেলে একদিন অনেক বড় হবে। হুমায়ূন তো বরাবরই পড়াশোনায় ভালো করেছে, যেখানে গিয়েছে সেখানেই ভালো করেছে। ম্যাট্রিক যখন দিল, তখন আমরা তো জানতাম এটা হলো সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। প্রথমবার যে কেউ ফেল করবেই, তার পরের বার গিয়ে পাস করবে। সেই জায়গায় রেডিওতে তার নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন তো টেলিভিশন ছিল না। তখন বাড়িতে আমার ভাইয়ের বিয়ে ছিল। সবাই মহা খুশি। আমার বাবা প্রচুর মিষ্টি আনলেন। এত মিষ্টি আনলেন, একেবারে মিষ্টিময় হয়ে গিয়েছিল বাড়ি। বাড়ির পাশেই থানা ছিল। থানায় মিষ্টি পাঠানো হলো।

জব্বার হোসেন: প্রথমে হুমায়ূন স্যারের নাম রাখা হয়েছিল কাজল। কে রেখেছিলেন কাজল নামটা?

আয়েশা ফয়েজ: হুমায়ূনের বাবা কাজল নামটা রেখেছিলেন।

জব্বার হোসেন: আর হুমায়ূন আহমেদ নামটা কার রাখা?

আয়েশা ফয়েজ: আমার শ্বশুর আর আমার বাবা মিলে প্রথমে নাম রাখল শামসুর রহমান। পরে, হুমায়ূনের বাবা বললেন, বাচ্চার নাম রাখা হবে হুমায়ূন আহমেদ। আমার শাশুড়ি অবশ্য আমাকে সারাজীবন শামসুর মাই ডেকেছেন।

জব্বার হোসেন: হুমায়ূন স্যারের ছবি দেখেছি, শৈশবে মেয়েদের ফ্রক পরা!

আয়েশা ফয়েজ: হুমায়ূনের বাবার খুব মেয়ের শখ ছিল। উনি হুমায়ূনকে প্রায়ই মেয়েদের জামা পরিয়ে রাখতেন। তিনি দীর্ঘদিন হুমায়ূনকে মেয়েদের জামা পরিয়ে রেখেছেন। অনেক ছবিও তুলেছিলেন মেয়েদের জামা পরিয়ে।

জব্বার হোসেন: ছোটবেলায় হুমায়ূন আহমেদ কেমন ছিলেন?

আয়েশা ফয়েজ: খুব বুদ্ধিমান ছিল। তার প্রতিটা কাজেই বুদ্ধির ছাপ ছিল। কিন্তু খুব দুষ্টু ছিল। আর কেমন যেন একটা পাগলামি করত। হঠাৎ করে হুলস্থুল চিৎকার করত। তার বাবাকে এ কথা বললে বলত, ওর মধ্যে আলাদা একটা কিছু আছে, যা সাধারণ মানুষের ভেতর নেই। আবার বলত, প্রমথনাথ বিসি এমন ছিল। কোথায় কোথায় ঘুরতে যেত তার ঠিক নেই। কোনো খোঁজখবর নেই। একবার দেশে খুব দুর্ভিক্ষ হলো। লঙ্গরখানা দেওয়া হয়েছিল তখন। সে ওই লঙ্গরখানায় গিয়ে খেয়ে আসত। কলাপাতার মধ্যে খাবার দেয়, তার দেখতে খুব ভালো লাগে। একদিন ছোট বোন সুফিয়াকেও নিয়ে গেল। পুলিশ ওদের দেখতে পেয়ে নিয়ে এলো আমার কাছে। আমি খুব রেগে গেলাম। বললাম, লঙ্গরখানায় যদি খাওয়া লাগে, তাহলে বাসায় এসেছিস কেন? লঙ্গরখানাতেই যা। ওর বাবা শুনে বলল, ওর মধ্যে বিশেষ কিছু আছে, যেটা অন্যদের মধ্যে নেই। হুমায়ূনের বাবা ছেলের সবকিছু সম্পর্কে একটা ভালো ব্যাখ্যা করতেন।

আরেক দিনের ঘটনা, এক ফকিরকে ভাত খেতে দেওয়া হলো। সেই ফকির তার বিশাল টিনের থালায় ডাল দিয়ে খাচ্ছে, তা দেখে হুমায়ূনের খুব ভালো লাগল। এখন সেও সেভাবে ভাত খাবে, না হলে খাবে না। কী যে পাগলামি তার মাথার মধ্যে ঢুকত! পরে তাকে সেভাবে খেতে দেওয়া হলো। এ রকম পাগলামি তার ভেতরে ছিল। যেটা অন্যেরা করত না, সেটা সে করবেই।

aysha foyej 1

পল্লবীর বাসায় পড়ার ঘরে বই পড়ছিলেন হুমায়ূন আহমেদের মা। ছবি: সোহেল রানা রিপন

জব্বার হোসেন: খেলাধুলা কি করতেন?

আয়েশা ফয়েজ: খেলাধুলা তখন যা ছিল তা-ই করত। তারপর যখন পড়াশোনা আরম্ভ করল, তখন থেকেই আবৃত্তি-টাবৃত্তি করা। বাসার মধ্যেও তার বাবা বিভিন্ন কবিতা পড়াত। রবীন্দ্রনাথের ‘বীরপুরুষ’ একটা কবিতা আছে, এটা তার খুব পছন্দ ছিল। কোনো প্রতিযোগিতায় গেলে প্রাইজ যে সে পায়নি এ রকম হয়নি কখনো।

জব্বার হোসেন: ছবি আঁকা তিনি শিখলেন কীভাবে? হুমায়ূন আহমেদ তো চমৎকার ছবি আঁকেন।

আয়েশা ফয়েজ: আমার সব কটা ছেলেমেয়েই কিন্তু ছবি আঁকতে পারে। কীভাবে ছবি আঁকা শিখল, সেটা আমার কাছেও বিস্ময়। হুমায়ূন খুব সুন্দর ছবি আঁকে। ইকবাল, শাহীন (আহসান হাবীব) এরা তো আঁকেই। ইকবাল তো কার্টুন এঁকে পড়ার খরচও চালাত। এখন জানতে চাইলে বলে যে বড় মামার কাছে শিখেছে। অথচ বড় মামা যে ছবি আঁকতে জানে, সেটা তো আমরাই জানতাম না। আমার ছোট মেয়েটা তো শংকর পুরস্কার পেয়েছিল ছবি এঁকে।

জব্বার হোসেন: হুমায়ূন আহমেদ তার ‘আমার ছেলেবেলা’য় বিভিন্ন ধরনের শাস্তির কথা বলেছেন। এ ধরনের শাস্তি দেওয়া হতো কেন? তার দাদি নাকি বিভিন্ন রকমের শাস্তি দিতে ভালোবাসতেন? ছোটদের মার খাওয়াতে ভালোবাসতেন?

আয়েশা ফয়েজ: তিনি তো অনেক ছেলেমেয়ে মানুষ করেছেন। তার ছিল পাঁচ ছেলে, দুই মেয়ে। তাদের শাসনের ভেতর দিয়েই মানুষ করেছেন। আর সবাই যখন বেড়াতে যেতাম, বাড়িতে অনেক ছেলেমেয়ে, অনেক রকম দুষ্টুমি করত। আমরা চাইতাম, ছোটরা যা খুশি করুক। তিনি এটা মানতেন না। বলতেন, শাসন করো।

জব্বার হোসেন: হুমায়ূন আহমেদের বিভিন্ন লেখা থেকে পাওয়া যায়, তার ‘হিমু’ চরিত্রটা আসলে তার বাবার একধরনের প্রতিকৃতি। আপনার কী মনে হয়?

আয়েশা ফয়েজ: হুমায়ূন তার বাবার কোনো আদল থেকে হিমু চরিত্রটা করেছে কি না আমি নিশ্চিত না। তবে হতে পারে। ওর বাবা অনেকটা খেয়ালি ধরনের ছিল। হিমু যেমন অনেকটা খেয়ালি ধরনের, যা বলে তা-ই করে। অন্যদের অনেক কিছুই মেলে না। মানুষটা একটু অন্যরকম ছিল। যখন যেটা ইচ্ছে হতো, করত। যেটাকে সে নিজে ভালো মনে করত, সেটাকেই গুরুত্ব দিত। আবার হুমায়ূনও কিন্তু তাই। হিমু হয়তো হুমায়ূন নিজেই। হতে পারে অবচেতনভাবে।

জব্বার হোসেন: হুমায়ূন আহমেদ প্ল্যানচেট করেছেন। এ রকম একটা ঘটনা বলবেন?

আয়েশা ফয়েজ: তখন আমরা কুমিল্লাতে। ইকবাল ওর বন্ধুবান্ধব নিয়ে বাসায় গেল, খুব হইচই হচ্ছিল। বিরাট বড় বাসা ছিল। সবাই মিলে একদিন প্ল্যান করল, তারা নকল প্ল্যানচেট করবে, ওদের ভয় দেখাবে। তারপর কী কী যেন করল, নির্দিষ্ট সময়ে মোম নিভে গেল। ইকবাল তার বন্ধুবান্ধব নিয়ে অপেক্ষা করছে। সে এর মধ্যে নেই। হঠাৎ রাতের বেলা হুমায়ূন, ইকবালকে না জানিয়ে আব্দুল হক নামের অডার্লিকে বলল, তুমি গাছের আগায় একটা দড়ি বাঁধো। দড়ির আরেক মাথা তোমার ঘরের ভেতর রাখবে। রাত যখন আড়াইটা বাজবে, তখন তুমি দুইটা ঝাঁকি দেবে। যখন ঝাঁকি দিল মোমটা নিভে গেল। ভয়ংকর পরিবেশ তৈরি হলো। ইকবালসহ সবাই ভয়ে অস্থির। তারা ভয়ে আমার ঘরে এসে শুয়ে থাকল। সকাল হতেই সবাই চলে গেল। এখানে আর থাকলই না। হুমায়ূনের আরও অনেক দুষ্টুমি ছিল।

জব্বার হোসেন: শুনেছি, মুক্তিযুদ্ধের সময় হুমায়ূন স্যারকেও পাকিস্তানি আর্মিরা মারতে চেয়েছিল?

আয়েশা ফয়েজ: হুমায়ূনকে একদিন ধরে নিয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সঙ্গে আরও তিনটা ছেলেকে নিল, একজন শিক্ষককে নিল। হুমায়ূনকে আর্মিরা প্রচুর টর্চার করেছে। অনেক দিন আটকে রেখেছিল। ওকে গুলি করে মেরে ফেলবে, তখন টিচাররা গিয়ে উদ্ধার করল। হুমায়ূন ঘরে ফিরে গিয়ে দেখে, ঘরে তালা দেওয়া।

জব্বার হোসেন: ঘটনা কোথায়?

আয়েশা ফয়েজ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওই দলটার মধ্যে কেবল হুমায়ূনই বেঁচে ছিল, বাকি সবাইকে গুলি করে মেরেছিল ওরা।

জব্বার হোসেন: ১৬ ডিসেম্বর আপনি কোথায় ছিলেন? দেশ স্বাধীন হয়েছে খবরটা আপনি কীভাবে পেলেন?

আয়েশা ফয়েজ: ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ দেশ স্বাধীন হলো। তখন হুমায়ূন আর ইকবাল ঢাকায়। দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। কে জানে তারা কোথায় আছে, কেমন আছে। পুরো দেশে রাস্তাঘাট নেই, বাস-ট্রেন চলে না, তাদের কোনো খোঁজ জানি না। দীর্ঘদিন পর তারা পায়ে হেঁটে একদিন মোহনগঞ্জে হাজির হলো।

জব্বার হোসেন: যুদ্ধের পর তো নতুন জীবন। এক অনিশ্চয়তার দিকে একরকম জীবন ছেড়ে দেওয়া। সেই অভিজ্ঞতার জায়গাটা থেকে বলবেন, যুদ্ধের পর বেঁচে থাকার সংগ্রামের কথা?

আয়েশা ফয়েজ: আমার ভাই এবং বাবা তারা সব সময় আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। এখন তো আমার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। কী জানি আমি নিজেও চিন্তা করি, সময়গুলো কীভাবে পার হয়েছিল! কীভাবে মান-সম্মানের সঙ্গে আল্লাহ দুনিয়ার জীবন পার করে দিল।

পেনশন তুলতে অনেক দুর্ভোগ হয়েছিল। পাকিস্তানি পেনশন তো খুবই সামান্য। আবার ছেলেমেয়ের বয়স কমিয়ে নাকি পেনশন নেওয়া লাগে। আমি পেনশন পেয়েছি খুবই সামান্য। আরেকটা ফান্ড থেকে বোধ হয় মাসে ২০০ টাকা দিত। কাগজপত্রে হুমায়ূনের নাম শামসুর রহমানই ছিল। যখন ওই পেনশন ছেলের নামে দিয়েছে, তখন অনেক যন্ত্রণা সহ্য করে টাকা পেতে হয়েছে। কী জানি আল্লাহর বোধ হয় একটা রহমত ছিল। কীভাবে

ছেলেমেয়েরা এত বড় হলো, মানুষ হলো, আমি নিজেও এখন ভাবি।
আর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলে বোধ হয় আল্লাহ শোনেন। তাদের বাবা খুব সৎমানুষ ছিলেন। এই মানুষটার অছিলায় এই ছেলেগুলো মানুষ হয়েছে। ভাবতাম, বাচ্চাগুলোর কী হবে? আমার দোয়া আল্লাহ কবুল করেছেন। আল্লাহ আমাকে বুঝিয়েছেন, আমি যদি মানুষ করি, তবে মানুষটা ছাড়াও আমি মানুষ করতে পারি। যা মানুষ হয়েছে, তার চেয়ে বেশি কি উনি বেঁচে থাকলে করতে পারতেন? আমি বিশ্বাস করি যে আমার প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করেছেন।

জব্বার হোসেন: ঢাকায় পৌঁছে প্রথম কোথায় আসেন?

আয়েশা ফয়েজ: এখানে আমার এক মামা ছিলেন, তার বাসায় উঠেছিলাম। আবুল হাসিম আমার ভাই। তার বাসায় ছিলাম প্রথমে, তারপর মামার বাসায়। আনিসুর রহমান ঠাকুর নাম। উনি ইনস্যুরেন্সে চাকরি করতেন। হুমায়ূন তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত।

জব্বার হোসেন: তখন তো হুমায়ূন আহমেদ লেখালেখি করেন।

আয়েশা ফয়েজ: তত দিনে বোধ হয় হুমায়ূনের একটা বই বেরিয়েছে।

জব্বার হোসেন: কোনটা?

আয়েশা ফয়েজ: ‘নন্দিত নরকে’ হয়তো। এখন মনে নেই।

জব্বার হোসেন: ঢাকায় সরকারি বাসা পেলেন কীভাবে?

আয়েশা ফয়েজ: মোহাম্মদপুরে বাসা পেয়েছিলাম। একদিন রক্ষীবাহিনী এসে তো খুব হম্বিতম্বি। তারা গাড়ি ভর্তি করে লোক নিয়ে ঢোকে। লুটপাট করে। আমাদের ঘরে এলো। তিন-চারটে ফাঁকা গুলি করল, ঘরের পর্দা, কাপড়চোপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলে দিল। আমার তো জিনিসপত্র তেমন ছিল না। যা ছিল সব ছুড়ে বাইরে ফেলে দিল আর বন্দুক নিয়ে আমার দিকে এলো। ইকবাল আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। পাশের বাসায় মনোয়ার সাহেব ছিলেন। ডা. মনোয়ার হোসেন। তার বাসায় ছিলাম। পরে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়েছি।

জব্বার হোসেন: খ্যাতিমান লেখক আহমদ ছফা আপনাদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। তার সঙ্গে পরিচয় কীভাবে? কীভাবে তিনি সাহায্য-সহযোগিতা করতেন?

aysha foyej

বাড়ীর উঠানে আয়েশা ফয়েজ। ছবি: সোহেল রানা রিপন

আয়েশা ফয়েজ: আহমদ ছফার সঙ্গে মূলত পরিচয়টা ছিল হুমায়ূনের। হুমায়ূন, ছফাকে অনেক পছন্দ করত, আবার আহমদ ছফাও হুমায়ূনকে অনেক পছন্দ করতেন। হুমায়ূনের প্রথম বই ‘নন্দিত নরকে’। এই বইটি আহমদ ছফাই অনেক চেষ্টা করে ছাপানোর ব্যবস্থা করেন। রক্ষীবাহিনী যখন আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিল, তখন আহমদ ছফা এসে আমাকে নিয়ে গেলেন আহমদ শরীফের বাসায়। সেখানে নেওয়ার পরে আহমদ শরীফ সকল ঘটনা শুনে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েন। এরপর ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় আমার অ্যালটমেন্টটি ছাপিয়ে দিলেন। ইতিমধ্যেই আমি সন্তানদের নিয়ে একটি ভাড়া বাড়িতে উঠে পড়ি। পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর রক্ষীবাহিনীর প্রধান আমাদের প্রতিবেশী ডা. মনোয়ারের বাসায় ফোন করে আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। আমি কথা বলতে রাজি হইনি। আমি চাইনি ওই বাড়িতে উঠে নতুন করে আর কোনো ঝামেলায় জড়াতে। এরপর রক্ষীবাহিনীর প্রধান আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং বিশেষভাবে অনুরোধ করতে থাকেন। এ সময়টাতে আহমদ ছফা ও ডা. মনোয়ার আমাকে বোঝাতে থাকেন। তারপর আমি মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের এই বাড়িতে আবার বসবাস শুরু করি।

আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনায় আহমদ ছফা প্রেসক্লাবের সামনে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিতে চেয়েছেন। এই ঘটনার প্রতিবাদ করেছেন। আহমদ ছফা অনেক বড় মনের মানুষ ছিলেন।

জব্বার হোসেন: সে সময় তো সংসারে উপার্জনের কেউ ছিল না। সংসারের খরচ নির্বাহ করতেন কীভাবে?

আয়েশা ফয়েজ: মুক্তিযোদ্ধা পরিবার হিসেবে তখন একটি সংগঠন থেকে মাসে ২০০ টাকা পেতাম, হুমায়ূনের বাবার একটি প্রাইভেট ফান্ড ছিল। আর আমার ছেলেরা সবাই তখন স্কলারশিপ পেত। জাফর ইকবাল প্রাইভেট পড়াত। পত্রিকায় কার্টুন আঁকত। টেলিভিশনে ‘কিন্তু কেন?’ নামে একটি অনুষ্ঠান করত। তারা এই টাকা খরচ না করে পুরো টাকাই আমার হাতে দিত।

জব্বার হোসেন: বড় ছেলে হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ সংসারের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল ছিলেন?

আয়েশা ফয়েজ: হুমায়ূন আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হয়, রেজাল্ট বের হওয়ার পরদিনই চাকরি হয় ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে কিছুদিন থাকার পর চাকরি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। হুমায়ূনের বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির বেতনটা সংসারের জন্য অনেক বড় সহায়ক ছিল। এদিকে কিছুদিন পরেই জাফর ইকবাল স্কলারশিপ নিয়ে চলে গেল আমেরিকাতে। শাহীনও পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু না কিছু করত। এরপর আর আমাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আমেরিকা থেকে ওরা দুই ভাই টাকা পাঠাত আর হুমায়ূনের বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতনটাও তুলতাম। তারা তাদের যোগ্যতা দিয়েই এগিয়ে গেছে।

জব্বার হোসেন: লেখার জন্য হুমায়ূন আহমেদকে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন কে?

আয়েশা ফয়েজ: ওর বাবা লিখত সেটা একটা বিষয়। লেখার জন্য একটা পরিবেশ লাগে। এসব তার মধ্যে ছিল না। সবার মধ্যে বসে সে লিখত। তার লেখার জন্য নির্দিষ্ট কিছু ছিল না।

জব্বার হোসেন: আপনার তিন ছেলের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী কে? আপনার কাছে কী মনে হয়?

আয়েশা ফয়েজ: আমার কাছে তো মনে হয় হুমায়ূনই। কারণ, লেখালেখির দিক দিয়ে সে এ পর্যন্ত যা করে এসেছে, তা একমাত্র মেধাবী ছেলের দ্বারাই সম্ভব। একেকজনের মেধা-প্রতিভা একেক দিক দিয়ে। ইকবালেরও কিন্তু অনেক প্রতিভা। সে সমাজের অনেক কিছু নিয়ে এগিয়ে যায়। অন্যরা যা বলে না, সে বলে। এটাও তো অনেক বড় ব্যাপার।

জব্বার হোসেন: লেখক হিসেবে তিন ছেলের মূল্যায়ন কী?

আয়েশা ফয়েজ: তিনজনের লেখা তিন রকম। হুমায়ূন আহমেদের লেখা অনেক ভালো। লেখার ভাষাও সুন্দর। হুমায়ূন যে প্রসঙ্গ নিয়েই লেখুক না কেন, তার বই মানুষ একবার হাতে নিলে পড়ে শেষ করতেই হবে। একবার সৈয়দ শামসুল হক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বাংলাদেশে পাঠক তৈরি করার পেছনে হুমায়ূন আহমেদের অনেক বড় ভ‚মিকা রয়েছে। আমি নিজেও ভারতীয় লেখকদের বই পড়তাম। কিন্তু আমার ছেলে লেখক হওয়ার পর থেকে আমি ভারতীয় বই পড়া বাদ দিয়েছি। জাফর ইকবাল বিজ্ঞানবিষয়ক বই লেখে। মাঝেমধ্যে গল্প-উপন্যাসও লেখে। তার লেখাও আমার ভালো লাগে। আর আহসান হাবীব তো উন্মাদ নিয়েই আছে। আমার একজন বোন বলেছিল, লেখক হলো আহসান হাবীব। কারণ, তার লেখায় অনেক মজা আছে। সে মানুষকে আনন্দ দিতে পারে।

জব্বার হোসেন: এই তিনজনের মধ্যে আপনি কার লেখা বেশি পছন্দ করেন?

আয়েশা ফয়েজ: হুমায়ূন আহমেদের লেখা আমার অনেক ভালো লাগে। কারণ, তার লেখা সহজ এবং ভাষা অনেক সুন্দর। সে যে বিষয় নিয়েই লেখুক, একটানা পড়ে শেষ করা যায়।

জব্বার হোসেন: ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল সায়েন্স ফিকশন লেখেন। অসম্ভব জনপ্রিয়ও তিনি। হুমায়ূন আহমেদও প্রথমে সায়েন্স ফিকশন লিখেছেন। তাদের দুজনের মধ্যে আপনার কার লেখা ভালো লেগেছে?

আয়েশা ফয়েজ: সায়েন্স ফিকশন নিয়ে আমি তেমন কিছু বলতে পারব না। কারণ, আমি সায়েন্স ফিকশন তেমন ভালো বুঝি না। তবে ইকবালের কিছু সায়েন্স ফিকশন পড়েছি, ভালো লেগেছে। তাদের দুজনের লেখার বিষয় এবং ধরন দুটো তো একেবারেই ভিন্ন।

 

আ-সা/রবি/সাক্ষাৎকার/শিল্প-সাহিত্য