ডা. জাকির হোসেন
ডা. জাকির হোসেন

মিসেস সিমিন ভাল আছেন, আমি এখনও কসাইয়ের দলে

প্রকাশিত :৩১.০৭.২০১৭, ৪:৫০ অপরাহ্ণ
  • ডা. জাকির হোসেন
    হাসপাতালের কর্মব্যস্ত দিন শেষে বাসায় ফিরেছি। সপ্তাহের শেষ দিন, স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে আরাম দেবার একটা মহাপরিকল্পনা মাথায় এঁটে বসেছিল। ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘণ্টা খানেক পর ছোট বাবুটা মোবাইল হাতে দৌড়ে এসে ডেকে তুলল- আব্বু তোমার ফোন। রিসিভ করতেই, ওপাশ থেকে সিমিন আপা খুব কষ্ট করে বলল, একটু বাসায় আস, আমি খুব অসুস্থ। সিমিন আপা দু’সন্তানের জননী। ছোট ছেলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। তার এ ছেলেকে চিকিৎসা দিতে গিয়েই পরিবারটির সঙ্গে আমার সখ্য। স্বামী একটা সরকারি অফিসের বড় কর্মকর্তা। ঢাকার বাহিরে পোস্টিং। সিমিন নিজেও একটা কর্পোরেট অফিসে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা।

আপার বাসায় গেলাম। কাজের মেয়ে দরজা খুলে দিল। উনি আর কাজের মেয়েটা ছাড়া কাউকেই দেখতে পেলাম না। চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেন সিমিন আপা। বললাম এক সপ্তাহ পর এই টেস্টগুলো করে আমাকে দেখাবেন। নিজে বেশ ক্লান্ত থাকায় টেবিলে দেয়া চা, নাস্তা গ্রহণ না করেই বাসায় চলে এলাম।

সপ্তাহ খানেক পর আবার ঢাকলেন বাসায়। রিপোর্ট একেবারেই নরমাল। আপা মাথা নিচু করে বসেছিলেন। হঠাৎ করে বললেন, আমি আপনার সঙ্গে একটা অন্যায় কাজ করেছি। জানতে চাইলাম -কী অন্যায়? কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, সেদিন মাত্রাতিরিক্ত ইয়াবা সেবন করেছিলাম। শুনে আকাশ থেকে পড়লাম! বললাম, আপনি ইয়াবা সেবন করেন? উত্তরে বললেন, হ্যাঁ। যা জানলাম তা হলো স্বামী ঢাকার বাহিরে থাকায় নিজের একাকীত্ব দূর করতে মোবাইল ফোনে মোহাম্মদপুরের এক বেকার যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। যা পরবর্তীতে কাল হয়ে দাঁড়ায়। এক সময় এই যুবকের মিথ্যে ভালবাসায় হাবুডুবু খেতে শুরু করেন। সর্ম্পক গভীর থেকে গভীরতর হয়। একদিন এই যুবক তাকে বলে, তুমি এত সুন্দর, তোমার স্বাস্থ্য আরেকটু কমে গেলে আরো বেশি সুন্দর লাগবে। তারপর মিসেস সিমিন এর হাতে ইয়াবা দিয়ে বলে, এ ট্যাবলেট খেলে তোমার স্বাস্থ্য কমে যাবে। সেই থেকে শুরু।

মিথ্যে ভালবাসার ফাঁদে মিসেস সিমিন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সুযোগটি কাজে লাগায় মাদক ব্যবসায়ী যুবক। সিমিন রহমান বুঝে উঠার আগেই আসক্ত হয়ে পরেন নেশায়। আসক্ত হওয়ার আগে দু’বছর পর্যন্ত এই যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে পরিবারের কেউ টের পায়নি। আসক্ত হওয়ার পর ধরা পড়ে যান স্বামী আর সন্তানদের কাছে।

জানতে চাইলাম, একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ হয়ে কিভাবে এই অক্ষরজ্ঞানহীন যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালেন? কোন উত্তর দিলেন না। ঐদিন তাকে প্রায় এক ঘণ্টা বোঝালাম। নিজের মনকে শক্ত করে ইচ্ছে পোষণ করলে খুব সহজেই এই নেশা থেকে মুক্ত হতে পারবেন। কিছু টিপস্ দিলাম। সিমিন আপা কথা দিলেন মেনে চলবেন আমার দেয়া পরামর্শ। এখন ইয়াবা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত সিমিন রহমান। বেশ ভাল আছেন।

সমাজের এই রকম হাজারো জনকল্যাণমূলক কাজ প্রায় প্রতিদিনই চিকিৎসকদের করতে হয়। হাজারো সত্যকে ঢেকে মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে হয়। এই সকল কাজের স্বীকৃতি কোনদিনই আমাদের চিকিৎসক সমাজ পায়নি। যে দেশে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসককে ‘কসাই’ বলে গালি দেওয়া হয়, সে দেশে আবার নিজের গন্ডির বাহিরের জনকল্যাণমূলক কাজের স্বীকৃতি চাওয়া কল্পনারও বাইরে।

(পরিচয় গোপন রাখতে সিমিন রহমান এই ছদ্ম নাম ব্যবহার করা হয়েছে )

লেখক: চিকিৎসক ও কলামিস্ট