setab-uddin-ahmmed-

শোকের আগস্ট: সত্যের কাছে মিথ্যা টেকে না কোনদিন

প্রকাশিত :০১.০৮.২০১৭, ৭:০৮ অপরাহ্ণ
  • মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন

    আজ ১ আগস্ট। বাঙালির শোকের মাসের শুরু। আর ক’দিন পর ১৫ আগস্ট। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের মহাপ্রয়াণ দিবস। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী এবং মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানের দালালরা জাতির পিতাকে স্বপরিবারে হত্যা করে প্রকৃতপক্ষে আমাদের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করে দিতে চেয়েছিল। চেয়েছিল বাঙালি জাতির মুক্তির পথ রুদ্ধ করতে। ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা জাতির পিতা জানতেন শত্রুরা যেকোনো সময় আঘাত হানতে পারে স্বাধীনতা বিপন্ন হতে পারে। তাই ভারত-রাশিয়া মৈত্রী চুক্তির (নিরাপত্তা চুক্তি) আদলে ‘২৫ বছরের ‘বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি’(নিরাপত্তা চুক্তি) করে যান। তাতে একটি দফা ছিল-‘দুই বন্ধু দেশের কোন একটির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন হলে কিম্বা দুই বন্ধু দেশের যেকোন একটি দেশ বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হলে আক্রান্ত দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় অপর দেশ এগিয়ে আসবে’। বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এই মৈত্রী চুক্তি পাকিস্তানি দালাল ৭৫ এর খুনিদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা-পাকিস্তানের সঙ্গে পুনঃএকত্রিকরণের দুঃস্বপ্ন ব্যর্থ করে দেয় এবং দেশের স্বাধীনতা রক্ষা হয়। ২৫ বছরের মৈত্রী চুক্তি ছিল শিশু রাষ্ট্র- সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ‘রক্ষাকবচ।’

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, জাতির পিতাকে হত্যার পরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুটট খুনি মোশতাককে টেলিফোনে ভাই বলে সম্বোধন করে আবদার করেন ‘আমরা দুই ভাই আবারও মিলিত হতে পারি না? নিদেনপক্ষে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করে কনফেডারেশন?’ পাকি-মার্কিন দালাল মোশতাক ‘দোয়া করবেন’ ভাই বলে ভুট্টকে সম্বোধন করে তার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এদিকে, ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনার সমর সেন দিল্লীতে ছিলেন। তিনি অবস্থা আঁচ করতে পেরে, বিমান যোগাযোগ বন্ধ থাকা সত্তে¡ দিল্লী-কোলকাতা হয়ে সড়ক পথে দ্রুতই ঢাকা পৌঁছান। ১৮ তারিখ বঙ্গভবনে খন্দকার মোশতাকে’র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সাক্ষাতের সময় সমর সেন স্পষ্টতই ‘বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি’র কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রচ্ছন হুমকি প্রদর্শন করে বলেন ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিদেশি কোন দেশের সহযোগিতায় কোন ষড়যন্ত্র মেনে নেয়া হবে না’। এই হুমকির কারণেই মোশতাক বাংলাদেশকে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ হিসাবে ঘোষণা করতে পারেনি। পারেনি ভুট্টোর পরিকল্পনানুযায়ী বাংলাদেশকে পাকিস্তানের পতাকাতলে আনার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে।

২০১১ সালের ১৫ অক্টোবর কোলকাতার ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকার সম্পাদক মানস ঘোষ এই ঘটনা নিয়ে একটি নিবন্ধ লেখেন। তাতে উল্লেখ করেন ‘বঙ্গভবনে গিয়ে সমর সেন মোশতাককে একটি কূটনৈতিক নোট পড়ে শোনান। তাতে লেখা ছিল ‘যদি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করা হয় এবং কোন দেশের সঙ্গে কনফেডারেশন গঠনের চেষ্টা করা হয় তাহলে ভারতের কাছে থাকা বৈধ চুক্তির অধীনে ভারতীয় সেনাবাহিনী যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু যদি নাম পরিবর্তন কিম্বা কনফেডারেশন না করেন তাহলে আপনাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমরা কোন কথা বলব না।’

এরপর থেকেই আশাহত পাকিস্তানি দালালরা এই চুক্তিকে ‘দাসত্ব চুক্তি’ বলে অপপ্রচার চালাতে থাকে। আর ইতিহাসের অমোঘ সত্য চাপা পড়ে যায় সামরিক শাসকদের বুটের তলায়। সামরিক শাসনের অষ্ঠেপৃষ্ঠে দেশ ও জাতি বন্দী হয়। স্বাধীনতার সকল অর্জন ভূলুণ্ঠিত হয়। আশা পূরণ না হওয়াই পাকিস্তানের দালালরা সামরিক শাসনের ছত্রছায়ায় মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা হরণ এবং বাঙালি জাতিসত্তাকে ধ্বংস করার জন্যই যে জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়েছিল তা আর বুঝতে বাকি থাকে না। কারণ মাত্র তিন মাসের মধ্যেই পাকিস্তানী এজেন্ট, বিশ্বাসঘাতক জেনারেল জিয়াউর রহমান নাম সর্বস্ব রাষ্ট্রপতি, মীরজাফর খন্দকার মোস্তাককে হটিয়ে নিজেই রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা বনে যান। নানান ছল-চাতুরির মাধ্যমে প্রধান সামরিক শাসক হিসেবে বাংলার জনগণের ঘাড়ে চেপে বসেন। ইতিহাসে এমন ঘটনা আমরা দেখি- ‘সিরাজদৌলাকে হত্যার পর নামমাত্র নবাব মীর জাফর আলী খাঁকে ছুঁড়ে ফেলে ব্রিটিশেরা।

জেনারেল জিয়াউর রহমান এই সময় সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক, কবিতা, গান এবং বাংলা সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে হাজার বছর ধরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তিলে তিলে গড়ে উঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে বাদ দিয়ে পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদের অনুকরণে অন্তঃসারশূন্য ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। স্বাধীনতার বিরুদ্ধে জাতিসংঘে বক্তৃতা দানকারী পাকিস্তানী দালাল, স্বাধীনতা বিরোধী শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন করেন।
মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র, সাব সেক্টর কমান্ডারদের জমাকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা উধাও করে দেয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশ্নবিদ্ধ করতে রাজাকারদের নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে এলাকা ছাড়া করা হয়। অপরপক্ষে আত্মগোপনকারী পলাতক আলবদর, রাজাকার, আলসামস্ এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াত ইসলামের খুনিদের পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরত এনে পুনর্বাসন করা হয়। সংবিধান কাটাছেড়া করে সহজ-সরল মুসলমানদের সমর্থন লাভের আশায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে ইসলামিকরণ করতে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি বহির্ভূত ‘বিসমিল্লাহির রহমানের রাহিম’ সংযোজন করা হয়। এক কথায় সকল পর্যায়ে পাকিস্তানিকরণের চেষ্টা করা হয়। যুব-সম্প্রদায়কে, দেশ ও জাতিকে বিপদগামী করা হয়। সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের সকল নমুনা মুছে ফেলার ব্যবস্থা করা হয়। জেনারেল জিয়া তার শাসনামলে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা সৈনিককে হত্যা করেন।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির কবল থেকে আজও সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেনি এদেশ। পরিতাপের বিষয় আজও দেখি রাজনীতির নামে সাধারণ নিরীহ মানুষকে পেট্রোল বোমা মেরে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছে। এই নির্দয় পাষণ্ডদের হাত থেকে নারী-পুরুষ, শিশুকিশোর কেউ বাদ যাচ্ছে না। খুনি স্বাধীনতাবিরোধী ও গণবিরোধী পাকিস্তানি দালালদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সার্বিক নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে জাতির পিতার হত্যাকারী এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের সমন্বয়ে গঠিত খিচুড়ি রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং তাদের অঙ্গ সংগঠন যুবদল ও ছাত্রদল, জামায়াত এবং শিবির।

অনেকেই হয়ত ভাবতে পারেন আমি লোকটি বিএনপিবিরোধী তাই এমন বলছি। কিন্তু আপনি যদি নিরপেক্ষ হন কিম্বা বিএনপির সাধারণ সমর্থক হন তো আপনাকেই এক এক করে জিজ্ঞেস করি (১) ৭৫এর ১৫ আগস্ট আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করেছিল কারা এবং কেন? (২) ৭৫ এর ডিসেম্বর মাসেই দালাল আইন বাতিল করে নিষিদ্ধ জামায়াতকে বাংলাদেশের পবিত্র ভূমিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিল কে? নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না যে, তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা এবং সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান (পরে স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি)? (৩) আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে জাতিসংঘে বক্তৃতাদানকারী স্বাধীনতার শত্রু শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে পবিত্র মুক্তিযুদ্ধ তথা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ তিরিশ লক্ষ মা-ভাই-বোনের সঙ্গে নির্লজ্জ বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল কে? তিনি আর কেউ নন, মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান! (৪) মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী পাকিস্তানি দালাল মশিউর রহমানকে উপ-প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিল কে? জিয়াউর রহমানই তো না অন্য কেউ? (৫) স্বাধীনতা বিরোধী, খুনি-লুটেরা বগুড়ায় আব্দুল আলিমকে খুঁজে এনে কে মন্ত্রী করেছিল? (৬) স্বাধীনতা বিরোধী ধর্ম-ব্যবসায়ী তথাকথিত মওলানা পাকিস্তানী দালাল মান্নানকে মন্ত্রী বানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বুকে পদাঘাত করেছিল কে?

একদিকে, স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলসামস, মুসলিম লীগ, জামায়াতের পুনর্বাসন অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধা সেনাসদস্য এবং সেনা কর্মকর্তাদের গোপন হত্যা ছিল ধূর্ত জিয়ার মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অপকর্মের মূল লক্ষ্য। জিয়া অত্যন্ত সুচতুরভাবে বঙ্গবন্ধু গৃহীত অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা ও বীরঙ্গনা পুনর্বাসন প্রকল্প বন্ধ করে দেয়। আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এ মা-বোনদের মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত সকল বীরাঙ্গনা শেখ হাসিনার হাত ধরে আজ মুক্তিযোদ্ধা মর্যাদা পেয়েছেন এবং ভাতা, চিকিৎসাসহ সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন। অথচ জেনারেল জিয়া এই বীরাঙ্গনাদের রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধা জিয়ার স্বাধীনতাবিরোধী অপকর্মের এমন শত শত উদাহরণ দেয়া যাবে।

আর একটি মাত্র উদাহরণ দিয়ে আপাতত জিয়াচরিত শেষ করতে চাই, তাহলেই সব খোলাসা হবে। প্রশ্ন জাগে- মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন ঠিকই তবে তিনিও কি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের হত্যা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত? বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক, তাহের উদ্দিন ঠাকুরের ন্যায় তিনিও কি বর্ণচোরা পাকিস্তানী দালাল ছিলেন? খুনিরা অবশ্য বিবিসি কে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছিল- ‘জিয়া তাদের পরিকল্পনা সব অবগত ছিলেন। তিনি বাধা দেয়ার চেষ্টা না করে বরং এগিয়ে যাও বলে সাহস যুগিয়েছেন’। জিয়া যদি প্রকৃতই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সৈনিক হতেন- তাহলে কেন তিনি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপকর্মগুলো একের পর এক দ্বিধাহীন চিত্তে করেছিলেন? যারা আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সরাসরি পাকিস্তানীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছে, আমাদের মা-বোনদের নির্যাতন করেছে, দেশকে মেধাশুন্য করার জন্য বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে, সেইসব খুনিদের পাকিস্তান থেকে ফেরত এনে কেন তিনি রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করলেন?

বর্তমান প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ সময়ের ভয়াবহতা দেখেনি। হয়ত তারা কল্পনাও করতে পারছে না, এই অপরাধীরা কতবড় অপরাধ করেছিল। কিন্তু আপনি-আমি যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছি বা দেখেছি, বাবা-ভাইকে হারিয়েছি এবং আমরা যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তারা জেনারেল জিয়ার এই অপরাধ কে ক্ষমা করি কেমন করে? আজ বিএনপির অনেকেই জেনারেল জিয়ার এই গুরু অপরাধকে লঘু করার জন্য নির্লজ্জ মিথ্যাচার করেন এবং বলেন বঙ্গবন্ধু নাকি এদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু যদি ক্ষমা করেই থাকেন তাহলে তখন ওই রাজাকার আলবদর বাহিনীর নেতারা পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরেনি কেন? তাহলে বঙ্গবন্ধুর সময় যেসব স্বাধীনতাবিরোধী এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারে একজন ‘চিকন আলি’র ফাঁসি হয়েছিল। বিচারে যাদের জেল-জরিমানাসহ বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি হয়েছিল, ক্ষমতা দখল করে জেনারেল জিয়া যাদের জেল থেকে মুক্ত করে দিয়েছিল তারা কারা? জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় বসে চোখের সামনে এই খুনি অপরাধীদের জেলখানা থেকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন তা ভুলি কেমন করে? আমার ভাইয়ের হত্যাকারী সাইফুল্লাহ কে রাজশাহী জেল থেকে মুক্ত করে চাকরিতে পুনর্বহাল করেছিলেন জেনারেল জিয়া, এই কষ্ট আমার হৃদয়কে এখনও কাঁদায়।

বর্তমান প্রজন্ম না হলেও তার আগের প্রজন্ম অর্থাৎ যাদের বয়স চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ তাদের একটি অংশ যে স্বাধীনতাবিরোধীদের গোয়েবলিয় কায়দায় অনবরত মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত হয়েছে তা নিশ্চিত বলতে পারি। কারণ সুবিধাভোগী স্বাধীনতাবিরোধীরা পাকিস্তানী টাকায় পুষ্ট হয়ে ৭৫ থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত ফাঁকা মাঠে গোল দেবার মত হোটেল-রেস্তেরায়, পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে, স্কুল-কলেজে, মাদ্রাসায়-মসজিদে অপপ্রচার করে সরল সহজ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। এরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাল্টে দিতে চেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এবং তার পরিবারের নিহত সদস্যদের ছোট করার জন্য কাল্পনিক, বানোয়াট এবং অলীক গল্প প্রচার করেছে। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের দুই প্রজন্মের ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সের নারী-পুরুষের কেউই তখন বুঝতে পারেনি মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা কী ছিল। তবে ইতিহাসের সত্য একদিন না একদিন বের হয়ে আসে। বিভ্রান্ত পথিকও পথ খুঁজে পায়। বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাসের পথ ধরে আজ সত্য উপলব্ধি করছেন। তাই জাতির পিতার প্রতি অবনত হচ্ছে শ্রদ্ধায়।
আজ জাতির পিতার মহাপ্রয়াণ দিবসের প্রাক্কালে তাকে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।

 

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক, বাংলাদেশ বেতার।