ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন : অভিযোগ জানাবেন কীভাবে?

প্রকাশিত :০৪.০৮.২০১৭, ৬:৩১ অপরাহ্ণ

আজাদ সিরাজী:  ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন  ২০০৯ সালে পাশকৃত একটি রাষ্ট্রীয় আইন যেটা ভোক্তা হিসেবে রাষ্ট্রে নাগরিক যেন কোন কিছু কিনে প্রতারিত না হয়, তার সুরক্ষা দিয়েছে।

দৈনন্দিন জীবনে আমরা অনেক কিছু কিনি। প্রায়ই দেখা যায়, বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশী দাম হাকাচ্ছে দোকানী মোড়কের গায়ে লেখা দামের চেয়েও বেশী দাম ছেয়ে বসছে হয়ত।

খাদ্যদ্রব ও কাাঁচামালে ভেজাল, শিল্পদ্রবে আসলে জিনিস না দিয়ে নকল জিনিস, বিখ্যাত ব্রান্ডের নকল করে ভূয়া ব্রান্ডের জিনিস প্রদান প্রভৃতি নানা প্রকারেই আমরা ক্রেতারা ঠকি।

এই প্রতারনা থেকে সুরক্ষার জন্যই অনুমোদন করা হয়েছে  ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন -২০০৯।

অনেক সময়ই আমরা ক্রয়-বিক্রয়ের সময় এরকম ছোটখাটো প্রতারনার শিকার হই। কিন্তু সঠিক আইন না জানায়, অথবা কীভাবে অভিযোগ করতে হবে সে সংক্রান্ত সঠিক তথ্যের অভাবে ব্যবস্থা নিতে পারি না ।

আসুন, আমরা জেনে নিই, কোন কোন ক্ষেত্রে এই আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন, এবং কীভাবে এর প্রতিবিধান করবেন।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন  আইন কী?

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন আইন হলো জাতীয় সংসদে পাশকৃত একটি রাষ্ট্রীয় বিধান, যার বলে ‌’জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিকার করা হয়েছে’ এবং তার মাধ্যমে ভোক্তা হিসেবে নাগরিকের অধিকার সংরক্ষন করা হয়।

কোন কোন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ??

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন -২০০৯ এর চতুর্থ অধ্যায়ে ২০ টি ক্ষেত্র দেখানো হয়েছে যেখানে ভোক্তা হিসেবে নাগরিকগন তার অধিকার নিশ্চিতের জন্য মামলা করতে পারেবন।

এগুলোর মধ্যে উ্ল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রগুলো নিম্নরূপ:

১. কোন প্রতিষ্ঠান যথোপযুক্ত পণ্যের ক্ষেত্রে মোড়ক ব্যবহার না করলে

২. দোকানে বা প্রতিষ্ঠানের সহজে দৃশ্যমান কোন স্থানে পণ্যের মূল্যের তালিকা লটকাইয়া প্রদর্শন  না করলে

৩. মূল্যের তালিকা সংরক্ষণ না করিলে

৪. আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে কোন পণ্য, ঔষধ বা সেবা বিক্রয় বা বিক্রয়ের প্রস্তাব করলে

৫.ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করিলে বা করিতে প্রস্তাব করিলে

৬. মানুষের জীবন বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক কোন দ্রব্য, কোন খাদ্য পণ্যের সাথে যাহার মিশ্রণ কোন আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কোন ব্যক্তি উক্তরূপ দ্রব্য কোন খাদ্য পণ্যের সাথে মিশ্রিত করলে

৭. মানুষের জীবন বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয় এমন কোন প্রক্রিয়ায়, যাহা কোন আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হইয়াছে, কোন পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ করলে

৮.পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করলে

৯. কোন ব্যক্তি প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করলে

১০. ওজনে কারচুপি

১১. বাটখারা বা ওজন পরিমাপক যন্ত্রে কারচুপি

১২. পরিমাপে কারচুপি

১৩. দৈর্ঘ্য পরিমাপের কার্যে ব্যবহৃত পরিমাপক ফিতা বা অন্য কিছুতে কারচুপি

১৪. কোন পণ্যের নকল প্রস্তুত বা উৎপাদন

১৫. মেয়াদ উত্তীর্ণ কোন পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করলে

১৬. কোন আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত বিধি-নিষেধ অমান্য করিয়া সেবা গ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্ন হইতে পারে এমন কোন কার্য করলে

১৭. কোন সেবা প্রদানকারী অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা অসতর্কতা দ্বারা সেবা গ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য বা জীবনহানী ঘটালে

১৮. কোন ব্যক্তি, কোন ব্যবসায়ী বা সেবা প্রদানকারীকে হয়রানি বা জনসমক্ষে হেয় করা বা তাহার ব্যবসায়িক ক্ষতি সাধনের অভিপ্রায়ে মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করলে

১৯. এই আইনে উল্লিখিত কোন অপরাধের জন্য দণ্ডিত ব্যক্তি যদি পুনরায় একই অপরাধ করেন তবে তিনি উক্ত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যে দণ্ড রয়েছে তার দ্বিগুন দণ্ডে দণ্ডিত হবেন৷

২০. এই অধ্যায়ে পূর্ববর্তী ধারাসমূহে বর্ণিত দণ্ডের অতিরিক্ত, আদালত যথাযথ মনে করলে, অপরাধের সংশ্লিষ্ট অবৈধ পণ্য বা পণ্য প্রস্তুতের উপাদান, সামগ্রী, ইত্যাদি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের আদেশ করতে পারবেন।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অবশ্যই ক্রেতা-সাধারণের উপকারের জন্য। কিন্তু, কোন ব্যক্তি যেন কোন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করতে না পারে তারও সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে ১৮ নং ধারার মাধ্যমে।

অতএব, সঠিক অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা করতে হবে ক্রেতাদের।

আরো পড়ুন: জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কী ও কেন? 

 

কোথায় অভিযোগ করবেন??

আপনি উপরিউক্ত কোন ধারা বা ক্ষেত্রে মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে থাকলে নিম্নোক্ত ঠিকানাগুলোতে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন:

১. মহাপরিচালক, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, ১ কারওয়ান বাজার (টিসিবি ভবন-৮ম তলা), ঢাকা, ফোন: +৮৮০২ ৮১৮৯৪২৫

২. জাতীয় ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্র,  টিসিবি ভবন- ৯ম তলা, ১ কারওয়ান বাজার ঢাকা, ফোন: ০১৭৭৭ ৭৫৩৬৬৮, ই-মেইল: [email protected]

৩. উপ পরিচালক, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, টিসিবি ভবন, বন্দরটিলা, চট্টগ্রাম, ফোন: ০৩১-৭৪১২১২

৪. উপ পরিচালক, রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, শ্রীরামপুর, রাজশাহী, ফোন: +৮৮০৭ ২১৭৭২৭৭৪

৫. উপ পরিচালক, খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, টিসিবি ভবন, শিববাড়ী মোড়, খুলনা, ফোন: ০৪১-৭২২৩১১

৬. উপ পরিচালক, বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, মহিলা ক্লাব ভবন, বরিশাল, ফোন: +৮৮০৪ ৩১৬২০৪২

৭. উপ পরিচালক, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, সিলেট ফোন: ০৮২১-৮৪০৮৮৪

৮. উপ পরিচালক, রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিউ ইঞ্জিনিয়ার পাড়া, রংপুর, ফোন: ০৫২১-৫৫৬৯১

৯. প্রত্যেক জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন

                                                                    অভিযোগ ফর্ম

যেভাবে অভিযোগ দায়ের করা যাবে:

১. দায়েরকৃত অভিযোগ অবশ্যই লিখিত হতে হবে।

২. ফ্যাক্স, ই-মেইল, ওয়েব সাইট, ইত্যাদি ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে; বাঅন্য কোন উপায়ে;

৩. অভিযোগের সাথে পণ্য বা সেবা ক্রয়ের রশিদ সংযুক্ত করতে হবে।

৪. অভিযোগকারী তাঁর পূর্ণাঙ্গ নাম, পিতা ও মাতার নাম, ঠিকানা, ফোন, ফ্যাক্স ও ই-মেইল নম্বর (যদি থাকে) এবং পেশা উল্লেখ করবেন।

অনলাইনে অভিযোগ করবেন কীভাবে?

১. জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত ওয়েবসাইট (www.dncrp.gov.bd) এ যান ।

২. ওয়েবসাইটের নীচের সারিতে, ডানের কলামে ‌’বিবিধ’ অংশতে গিয়ে ‌’অভিযোগ ফর্ম ডাউনলোড করে প্রিন্ট করুন এবং স্বহস্তে পূরন করুন।

৩. এবার ওয়েবসাইটের দ্বিতীয় সারির ডানের কলামে ‌’জাতীয় ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্র’ অথবা ওপরে খবর অংশে এই অংশে প্রদত্ত ই-মেইল: [email protected] এ আপনার প্রস্তুতকৃত প্রমানাদি, ক্রয়-রশিদ, ও অভিযোগ ফর্মের স্ক্যানকপি সাবমিট করুন।

৪. প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য এখানে প্রদত্ত মোবাইল: ০১৭৭৭-৭৫৩৬৬৮ এ যোগাযোগ করুন।