Roman

হজ যাত্রীদের দুর্ভোগের শেষ নেই!

প্রকাশিত :১১.০৮.২০১৭, ১:২২ অপরাহ্ণ
  • আমানুল্লাহ নোমা

চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। প্রচলিত প্রবাদটি হজ ব্যবসায়ীদের জন্য পুরোপুরি প্রযোজ্য বললে মন্দ হবে না। হাজিরা আল্লাহর মেহমান। কিন্তু সেই মেহমানদের হয়রানির কমতি নেই। প্রতি বছরই হাজিরা নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হন। এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে আসেন অসংখ্য হজ গমনেচ্ছু। ভিসা প্রসেসিং, বিমান শিডিউলের ঝামেলাসহ নানা বিড়ম্বনায় ফ্লাইট মিস করেন হাজিরা। ভাঙা মন নিয়ে ফিরে যান বাড়িতে। ফিরে যাওয়াটা যে কত বেদনার তা একমাত্র যে যায় সেই বোঝে। এমন ঘটনা প্রতিবছরই ঘটছে। তিলে তিলে সঞ্চিত অর্থ খরচ করে প্রভুর ডাকে সাড়া দিতে যখন যাত্রা করেন ঠিক তখনই শিকার হন নানা বিড়ম্বনার। হাজিদের নিয়ে ব্যবসার অন্ত নেই।
অসাধু কিছু ব্যবসায়ীরা হাজিদেরকে ওমরা বা হজ করতে নানা ধরনের লোভনীয় স্বল্প মূল্যের অফারে প্রেরণের প্যাকেজ ঘোষণা করে আকৃষ্ট করেন। কিন্তু তাদের অনেকেরই এ ব্যবসার বৈধ লাইসেন্সই নেই, অথচ তারা বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এদের না আছে লাজ-লজ্জা, না আছে আল্লাহ ভীতি। ব্যবসাটাই মূখ্য উদ্দেশ্য। হজের উদ্দেশে রওয়ানা দেয়ার আগে সকল যাত্রী মনে করেন এ কাজে সকলেই আল্লাহর মেহমানদেরকে চরম স্বচ্ছতা ও স্বর্গীয় সহযোগিতা করবেন, কিন্তু বাস্তবে প্রায় সব যাত্রীই যে অভিজ্ঞতা পান তা দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য। অনেকে এ ব্যাপারে ভোগান্তির শিকার হলেও আল্লাহর কাছে ‘লাব্বায়েক লাব্বায়েক’ বলে হাজির হয়েছেন বলে নিরবে সব কিছু মেনে নেন।
প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও উৎকণ্ঠার শেষ নেই। অনেকেই পড়ে আছেন অনিশ্চয়তায়। ই-ভিসা জটিলতা, ফ্লাইট বিপর্যয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা, মধ্যস্বত্বভোগীর প্রতারণা এবং এক শ্রেণীর মুনাফালোভী হজ এজেন্টদের পাকচক্রে পড়ে হজ যাত্রীরা দুঃসহ সময় পার করছেন। এই সংকট এবং ভোগান্তির জন্য হজ এজেন্সি এবং ধর্ম মন্ত্রণালয় পরস্পরকে দোষারোপ করছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, হজের মতো ধর্মীয় পবিত্রতা নিয়ে রাঘব-বোয়ালদের ব্যবসা বাণিজ্য চলছে বেপরোয়া। হজ নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। তাদের অনুগত হজ এজেন্টদের কাছে নিবন্ধিত হজ যাত্রীরা আছেন কিছুটা স্বস্তিতে। অন্য হজ যাত্রীদের অবস্থা করুণ। এখনও প্রায় ৪৮ হাজার হজ যাত্রীর ভিসা হয়নি। আর কিছু দিন পর সৌদি সরকার ভিসা দিবে না। এ পর্যন্ত অনেক এজেন্সি ধর্ম মন্ত্রণালয়ে হজ যাত্রীর ভিসার আবেদনই জমা দেয়নি। হজের শেষ ফ্লাইট যাবে ২৬ আগস্ট। প্রতিদিনই যাত্রীর অভাবে বাতিল হচ্ছে শিডিঊল ফ্লাইট। ই-ভিসা জটিলতার কারণে টিকিট কনফার্ম থাকার পরও যাত্রীরা বিমানে উঠতে পারছেন না। ই-ভিসার প্রিন্ট নিতে গিয়ে সার্ভার ও যান্ত্রিক ত্রুটিতেও আটকা পড়ছেন অনেক যাত্রী। বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের আশঙ্কা দ্রুত জটিলতা নিরসন না হলে কমপক্ষে ৪০ হাজার যাত্রীর হজ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। যদিও হাব নেতারা বলেছেন এটা সর্বোচ্চ দশ হাজার হতে পারে।
সৌদি সরকার নতুন ভিসা কাঠামো কার্যকর করে ২ অক্টোবর (১ মহররম)। নতুন নিয়মাবলিতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, পুনরায় হজে গেলে দুই হাজার রিয়াল ফি দিতে হবে। তবে গত ফেব্রুয়ারি মাসে সরকারের জারি করা বিশাল হজ প্যাকেজের কোথাও এর উল্লেখ ছিল না। এরই পরিণতি ২৫ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে ৫ হাজারের বেশি হজ যাত্রীকে। সংশ্লিষ্ট অনেকেই এখন এ জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ আনছে। হজ এজেন্সি মালিকদের সংগঠন হাবের নেতারা বলছেন, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের গাফিলতির কারণে আজ এই পরিস্থিতি। অতিরিক্ত ফির কথা হজ প্যাকেজে থাকলে ভোগান্তি হতো না। ধর্ম মন্ত্রণালয় বলছে এ বিষয়টি তাদের জানা ছিল না। এমন গুরুত্ব একটি বিষয় ধর্ম মন্ত্রণালয় জানবে না এটা কেমন কথা! এখানে ধর্ম মন্ত্রণালয় তাদের দায়িত্বেও চরম অবহেলা করেছে। তাদের অবহেলার মাসুল হজ যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে। হজ যাত্রার সময় দিনে দিনে কমে আসছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে কিছু হজ যাত্রীর উৎকণ্ঠা। তারা জানে না তাদের ভাগ্যে এবছর হজ জুটবে কিনা। এভাবেই অনিশ্চয়তা নিয়ে আশকোনার হাজি ক্যাম্পে অবস্থান করছেন অনেক হজ যাত্রী।

হজ যাত্রীর এমন অবস্থা বাংলাদেশে নতুন নয়। প্রতি বছরই হজের মৌসুমে নতুন কোন না কোন সমস্যা দেখা দেয়। তাতে বিপাকে পড়েন যাত্রীরা। আর সমস্যার পেছনের মূল কারণ হচ্ছে সিন্ডিকেট বাণিজ্য। একদল সরকারি-বেসরকারি লোক মিলে এখানে এমন এক সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠা করেছেন তা ভেঙে ফেলা বেশ দূরূহ। সরকারের উচিৎ হবে হাজিদের কল্যাণের কথা ভেবে হজের নামে সকল ধরনের অতি মুনাফা অর্জনের পথ বন্ধ করতে সচেষ্ট হওয়া।
লেখক: সেক্রেটারি, বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ফাউন্ডেশন।