জামালপুরের চারটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে
জামালপুরের চারটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে

ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

প্রকাশিত :১৩.০৮.২০১৭, ৬:২৭ অপরাহ্ণ

সামিউল তারেক : ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি ব্যাপক অবনতি হয়েছে। সঙ্গে রয়েছে উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় জেলা সুনামগঞ্জও। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, আত্রাই, সুরমাসহ কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। ভেসে গেছে অনেকের ঘরবাড়ি-গবাদিপশু। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে লাখো মানুষ। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, ফসলি জমি। কিছু কিছু জায়গায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ হয়ে রয়েছে।

প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদগুলো তুলে ধরা হলো-

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: অবিরাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কুড়িগ্রামে ১৬টি নদ-নদীর পানি দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এর মধ্যে কয়েকটির পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। এ কারণে বন্যায় জেলার নয়টি উপজেলায় সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ভূরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে পানি উঠেছে। সদরে কল্যাণ এলাকায় ধরলা নদীর বাঁধ ভেঙে কুড়িগ্রাম-রংপুর মহাসড়কে যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ হয়ে পড়েছে। উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের গোড়ক মণ্ডল গ্রামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধের ২০ ফুট অংশ ভেঙে গিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এমনকি কাঁঠালবাড়ী ও হুলোখানা ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থানে বাংটুর ঘাট এলাকায় বাঁধ ভেঙে ওই এলাকা দিয়ে পানি ঢুকে দুই ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।এদিকে সাপের কামড়ে ও পানিতে ডুবে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
পাউবো জানায়, বেলা একটায় ধরলা নদীর পানি বিপৎসীমার ১ মিটার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে ধরলার পানি ১ মিটার ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল।

সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি : সৈয়দপুরের খড়খড়িয়া নদীর বাঁ তীরে পশ্চিম পাটোয়ারীপাড়া এবং বসুনিয়া এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধের প্রায় ১০০ মিটার বিলীন হয়ে গেছে। বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়ায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে আশপাশের মানুষ। অনেকে গরু-ছাগল ও বাড়ির আসবাব নিয়ে দিগ্‌বিদিক পালাতে থাকে। ওই এলাকায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
আজ রোববার সকালে সৈয়দপুর উপজেলা সদরের কুন্দল, পাটোয়ারীপাড়া, নয়াবাজার, সুড়কিমিল, কাজীপাড়া, হাতিখানা, নতুন বাবুপাড়া, মিস্তিরিপাড়া এবং বাঁশবাড়ি মহল্লা প্লাবিত হয়। এসব এলাকার কোথাও কোথাও কোমরপানি। সৈয়দপুর বিমানবন্দরেও যেকোনো সময় বন্যার পানি ঢুকে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট লোকজন।

দিনাজপুর প্রতিনিধি : টানা তৃতীয় দিনের বৃষ্টিতে দিনাজপুর শহরের মাহুত পাড়া এলাকায় পুনর্ভবা নদীর বাঁধ ভেঙে কয়েক হাজার মানুষের ঘরবাড়ি হুমকির মুখে পড়েছে। উঠানে পানি, ঘরে পানি। জেলা সদর ও উপজেলার প্রায় সব সড়কে হাঁটুপানি, কোথাওবা কোমরপানিও ছাড়িয়ে গেছে। এ অবস্থা দিনাজপুর জেলা শহরসহ ১৩টি উপজেলার।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, পুনর্ভবা নদীর ঘুঘুডাঙ্গা, উলিপুর, বালুয়াডাঙ্গা, রামনগর এলাকার বাঁধ অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছে। সেসব জায়গা মেরামতের জন্য সেনাবাহিনী, বিজিবি ও জেলা প্রশাসন মিলে এসব জায়গা রক্ষা করার চেষ্টা চলছে। পুনর্ভবা নদীর পানি বিপৎসীমার ৭০ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার ও আত্রাই নদের পানি ৮০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে; যা ১৯৬৮ সালের পর এই প্রথম।
জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম বলেন, দুর্গত মানুষ জেলায় ১৩৬টি কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। স্রোতের বেগ খুব বেশি হওয়ায় স্থানীয় নৌকা দিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখানে সাপোর্ট দিচ্ছে। তিনি জানান, সব উপজেলাই কম বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তবে ফসল ও ঘরবাড়ি ডুবে সদর উপজেলাসহ, বিরল, বোচাগঞ্জ, খানসামা, কাহারোল ও চিরিরবন্দর বেশি ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছে।

নওগাঁ প্রতিনিধি : ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে আত্রাই নদের পানি গতকাল শনিবার সকাল থেকে বাড়তে শুরু করে। রাতে মান্দা উপজেলার নুরুল্যাবাদ ইউনিয়নের পার নুরুল্যাবাদ ও নুরুল্যাবাদ উত্তরপাড়া এলাকায় দুই স্থানের বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এতে বেড়িবাঁধের ভেতর থাকা পার নুরুল্যাবাদ, নুরুল্যাবাদ উত্তরপাড়া ও শিবচর গ্রাম প্লাবিত হয়। বন্যার পানির তোড়ে চারটি কাঁচা বাড়ি ভেঙে গেছে। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ হয়ে পড়েছে পানিবন্দী। এদিকে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে মূল বাঁধও।
পানি উন্নয়ন বোর্ড নওগাঁর নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, আজ সকাল ১০টার দিকে পানি বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার এবং দুপুর ১২টা নাগাদ বিপৎসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

জামালপুর প্রতিনিধি : যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে জামালপুরের চারটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আজ রোববার বেলা একটার দিকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনার পানি বিপৎসীমার ৬৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের কার্যালয় সূত্র জানায়, ইসলামপুর উপজেলার চিনাডুলী, কুলকান্দি, বেলগাছা, সাপধরী ও নোয়ারপাড়া ইউনিয়ন, মাদারগঞ্জ উপজেলার চরপাকেরদহ, বালিজুড়ি ও জোড়খালি ইউনিয়ন এবং দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চুকাইবাড়ি ও চিকাজানি ইউনিয়ন এবং দেওয়ানগঞ্জ পৌর শহরের কিছু অংশে বন্যার পানি উঠেছে। এতে ওই সব ইউনিয়নের অর্ধশত গ্রামের ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানির কারণে ইসলামপুর-নোয়ারপাড়া রাস্তা, শিংভাঙা-আমতলি পাকা রাস্তা, দেওয়ানপাড়া-ভূতেরপাড়া রাস্তা, বাম বাজার-পশ্চিম বামনা রাস্তা, মেলান্দহ-মাহমুদপুর রাস্তা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
জামালপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পানি পরিমাপের নিয়ন্ত্রক আবদুল মান্নান বলেন, ‘যেভাবে পানি বাড়ছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হতে পারে।’

লালমনিরহাট প্রতিনিধি : জেলার পাঁচটি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৫০ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ২৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে। আজ দুপুর ১২টায় তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ও মোগলহাট ইউনিয়নে অবস্থিত পাউবোর ধরলা নদীর ডান তীর সংরক্ষণ বাঁধের চারটি স্থানে গতকাল শনিবার দুপুর থেকে রাতের মধ্যে ভেঙে যায়। এতে ধরলা ও রতনাই নদীর পানি এক হয়ে প্রবল বেগে প্রবাহিত হচ্ছে। অপর দিকে মোগলহাট ও কুলাঘাট ইউনিয়নের ব্যাপক এলাকা জলাবদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি লালমনিরহাট পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩, ৫, ৬ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের রাস্তা ঘাট, পুল কালভার্ট তিন থেকে চার ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বন্যার কারণে আজ ভোর থেকে এ বিভাগের চারটি রেল রুটের ট্রেন চলাচল সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে লালমনিরহাট রেলস্টেশন থেকে তিস্তা পর্যন্ত, কালীগঞ্জের কাকিনা থেকে বুড়িমারী, রমনা বাজার থেকে কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও থেকে পঞ্চগড়।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানিবন্দী হয়ে পড়ছে মানুষজন; বিশেষ করে উপজেলার শতাধিক গ্রামের ৪০ হাজার মানুষ এবং তাহিরপুর উপজেলার শতাধিক গ্রামের মানুষ। তলিয়ে গেছে সাড়ে চার হাজার হেক্টর রোপা আমন জমি। আজ রোববারও জেলার আটটি উপজেলার ১ হাজার ২০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোনো পরীক্ষা হয়নি। একই সঙ্গে জেলার ৩১২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আজ পাঠদান বন্ধ রয়েছে। সুনামগঞ্জ পৌর শহরের কাছে সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার ৮৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কামরুজ্জামান বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে একটি তথ্যকেন্দ্র খোলা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় বন্যার্ত ব্যক্তিদের জন্য ১৩ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।