barisal sentu

ভয়াল ২১ আগস্ট: নিহত পরিবারের খোঁজ রাখেনি কেউ

প্রকাশিত :১৯.০৮.২০১৭, ১২:৩৯ অপরাহ্ণ

শামীম আহমেদ, বরিশাল : ‘প্রিয় নেত্রীর (শেখ হাসিনা) জীবন বাঁচাতে গিয়ে সেদিন নিজের জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহসম্পাদক মোস্তাক আহম্মেদ সেন্টু। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ দলের শীর্ষ নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার সময় প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনার জীবন বাঁচাতে গিয়ে সেন্টু মাত্র ৩৬ বছর বয়সে শহীদ হয়েছেন।
প্রতিবছর ২১ আগস্ট আসলেই নিহতের পরিবারের প্রতি দায়সাড়াভাবে সমবেদনা জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। আর মিডিয়াকর্মী ব্যতিত নিহত পরিবারে খবর কেউ রাখেন না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে শহীদ মোস্তাক আহম্মেদ সেন্টুর বিধবা স্ত্রী আইরিন সুলতানা বেবী বলেন, আমার স্বামীর খুনীদের ও একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারী এবং পরিকল্পনাকারীদের অনতিবিলম্বে ফাঁসি চাই।
বরিশালের মুলাদী উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের রামারপোল গ্রামের মৃত আফছার উদ্দিন হাওলাদারের সাত পুত্র ও তিন কন্যার মধ্যে গ্রেনেড হামলায় নিহত মোস্তাক আহম্মেদ সেন্টু ছিলেন ষষ্ট। সেন্টুর লাশ রামারপোল গ্রামের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।
ক্ষোভ প্রকাশ করে শহীদ সেন্টুর বিধবা স্ত্রী বেবী আরও বলেন, বিগত বছরগুলোতে ২১ আগস্ট স্মরণ সভায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের দাওয়াত পেয়ে আমি ও আমার একমাত্র কন্যা আফসানা আহম্মেদ রিদি, বৃদ্ধ শাশুড়ি মনোয়ারা বেগমসহ (৮৬) শোকাহত পরিবারের ৫/৬জন সদস্যরা শোকসভায় গিয়ে বসার জায়গা পাইনি। শোকাহত পরিবারদের বসার নির্ধারিত জায়গার চেয়ার আগে থেকেই নেতারা দখল করে বসে থাকেন। আমাদের বসার ব্যবস্থা পর্যন্ত কেউ করে দেয় না। তাই বৃদ্ধা শাশুড়িসহ আমরা গত দুইবছর ধরে শোকসভায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তিনি (বেবী) অনুষ্ঠানে বসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে শোকাহত পরিবারগুলোর সদস্যরা যেন সাক্ষাৎ করতে পারেন সে ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি জোর দাবি করেন।
সূত্রমতে, মোস্তাক আহম্মেদ সেন্টু বরিশাল জেলা স্কুল থেকে এসএসসি ও বিএম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে শহীদুল্লাহ্ হলে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেন্টু মাস্টার্স পাস করে। ১৯৯৬ সালে মুলাদী উপজেলার রামারপোল এএম উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক মো. আবুল হাসানাত মৃধার কন্যা আইরিন সুলতানা বেবীকে সামাজিকভাবে বিয়ে করেন সেন্টু। দাম্পত্য জীবনে তিনি (সেন্টু) আফসানা আহম্মেদ রিদি (১৫) নামের এক কন্যা সন্তানের জনক।
সেন্টুর নিজ এলাকা মুলাদী উপজেলার রামারপোল শহীদ সেন্টু স্মৃতি সংঘের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং সেন্টুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী রাজীব হোসেন ভূঁইয়া রাজু বলেন, ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভা চলাকালীন সময় মোস্তাক আহম্মেদ সেন্টু ভাইয়ের সাথে আমি মঞ্চের সামনে বসে নেত্রীর দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ শুনছিলাম। আকস্মিকভাবে গ্রেনেড হামলা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই সেন্টু ভাই প্রিয় নেত্রীকে (শেখ হাসিনা) রক্ষা করতে একলাফে মঞ্চে উঠে অন্যান্যদের সাথে নেত্রীকে জড়িয়ে রাখেন। একপর্যায়ে আমি (রাজু) দৌঁড়ে নিরাপদে আশ্রয় নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর ঘটনাস্থল থেকে গ্রেনেডের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত সেন্টু ভাইকে উদ্ধার করে মুমূর্ষ অবস্থায় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালের নিয়ে যাই। সেখানে বসে শরীর থেকে গ্রেনেডের স্প্রীন্টার বের করতে অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হয়। অপারেশন চলাকালীন সময় ওইদিন রাত সাড়ে নয়টার দিকে সেন্টু ভাই মারা যায়। বলেই একপ্রকার বাকরুদ্ধ হয়ে পরেন রাজু। এর একমাস পর কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল সেন্টুর স্ত্রী বেবীকে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে চাকুরি দেন।
একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহসম্পাদক মোস্তাক আহম্মেদ সেন্টুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রাজীব হোসেন ভূঁইয়া রাজু আরও বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই সেন্টু ভাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে কখনোই তিনি নিজের কথা ভাবেননি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশপ্রেম, মাটি ও মানুষের সাথে গভীর মমতার ছাঁপছিলো তার মাঝে। সেন্টু ভাই ছিলেন এতদাঞ্চলের মাটি ও মানুষের নেতা। দলমত নির্বিশেষে এলাকার সর্বস্তরের জনগণের হৃদয়ে ছিলো তার অবস্থান। তিনি ছিলেন মিষ্টিভাষি ও সদালাপি। খুব অল্পসময়ই তিনি মানুষকে ভালবেসে আপন করে নিতেন। তার অনুপস্থিতি আজ মুলাদীকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, রয়ে গেছে তার সকল স্মৃতি। আমরা শহীদ সেন্টু ভাইয়ের খুনীদের ও একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারী এবং পরিকল্পনাকারীদের অনতিবিলম্বে ফাঁসি চাই। তিনি (রাজু) আরও বলেন, প্রতিবছর গ্রেনেড হামলাকারীদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে মুলাদীর রামারপোল গ্রামে শহীদ সেন্টু স্মৃতি সংঘের উদ্যোগে ২১ আগস্ট স্মরণসভা ও দোয়া-মোনাজাতের আয়োজন করা হয়। এবছরও অনুরূপ কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়েছে।
শহীদ মোস্তাক আহমেদ সেন্টুর নিজ উপজেলা মুলাদী ও পাশ্ববর্তী বাবুগঞ্জ উপজেলার আওয়ামীলীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, জীবদ্দশায় মোস্তাক আহমেদ সেন্টু স্বপ্ন দেখেছিলেন বরিশাল-৩ আসনের উন্নয়ন ও সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে। ২১ আগস্ট বিরোধী পক্ষের গ্রেনেড হামলায় মোস্তাক আহমেদ সেন্টুর সব স্বপ্ন তছনছ হয়ে যায়। একাধিক আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট সরকারের সময় মুলাদী, হিজলা ও বাবুগঞ্জ উপজেলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ছিলো স্থবিরতা। আওয়ামী লীগের কোন সভা, সমাবেশ ও মিছিল রাজনৈতিক কর্মসূচী ওইসব উপজেলায় ছিল না। ঠিক সেই মুহুর্তে মোস্তাক আহমেদ সেন্টু আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবকাঠামোকে জোরদার করতে বিভিন্ন কর্মসূচী পালনের মাধ্যমে ওই তিন উপজেলাসহ পাশ্ববর্তী গৌরনদীর আওয়ামী লীগকেও উজ্জীবিত করে।
বেশ স্বল্প সময়ে সর্বত্র মোস্তাক আহমেদ সেন্টুর কয়েক হাজার ভক্ত বের হয়ে আসে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন সাহসী নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে মোস্তাক আহমেদ সেন্টু। ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে বাচাঁতে গিয়ে শহীদ হন মোস্তাক আহমেদ সেন্টু। এরপর থেকেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব শুন্যতা দেখা দেয় বরিশাল-৩ সংসদীয় এলাকায়। পরবর্তীতে সেন্টু শুন্য বরিশাল-৩ আসনে রাজনৈতিক হাল ধরেন মোস্তাক আহমেদ সেন্টুর বড় ভাই জাপান প্রবাসী মোস্তাফিজুর রহমান নিলু। মোস্তাফিজুর রহমান নিলু ২০০৪ সাল থেকে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। মোস্তাফিজুর রহমান নিলু মুলাদী উপজেলা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি ও কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
এছাড়াও মোস্তাফিজুর রহমান নিলু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ প্রজন্মলীগের প্রতিষ্ঠা সভাপতি। তিনি (নিলু) বলেন, রাজনীতি করতে গিয়ে ভাইকে হারিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য রাজপথে আছি। কিছু পাওয়ার আশায় নয়; জনগনের সুখে-দুঃখে পাশে থাকতে রাজনীতি করি। যতোদিন বেঁচে আছি শহীদ মোস্তাক আহমেদ সেন্টু স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাবো। মোস্তাফিজুর রহমান নিলু আরও বলেন, আওয়ামীলীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে রাজনৈতিক মাঠে আছি। সে চাইলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৩ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আসন পুনরুদ্ধার করবো।