ডাক্তার এড্রিক বেকার
ডাক্তার এড্রিক বেকার

প্রিয় ডাক্তারভাই ‘শান্তিতে থাকুন’ !!

প্রকাশিত :০২.০৯.২০১৭, ৯:৪২ অপরাহ্ণ
  • আবু ফরহাদ

গরীব মানুষের প্রিয় ডাক্তারভাই ডাক্তার এড্রিক বেকারের দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকী ১ লা সেপ্টেম্বর। ২০১৫ সালের এক বৃষ্টিস্নাত সকালবেলা মধুপুর কাইলাকৈরের সাধারন মানুষজন – গ্রামবাসী এবং তাঁর বন্ধু শুভানুধ্যায়ীরা বৃষ্টির জল আর চোখের জলে তাঁকে তাঁর হাসপাতালের অতি সাধারন একটি জীর্ন ঘরে, যে ঘরের মাটির বিছানায় তিনি তিন দশক কাটিয়েছেন সে ঘরের পিছনে তাঁকে সমাহিত করে।

এমন ঋষিতুল্য মহাপুরুষের সাক্ষাত এবং প্রিতী জীবনে খুব কমই পেয়েছি। তাঁকে শুধু একজন ঋষি বললে হয়তো খুব কম বলা হয়, তিনি আদতেই ছিলেন একজন মহান মানুষ- এমন মানুষের সান্নিধ্য পরম সৌভাগ্যের। তিনি কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন তা এখনো পরিমাপ করে উঠতে পারিনি।

সূদুর নিউজিল্যান্ড হতে নিজের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন রেখে নিজেরই অর্থসম্পদ ব্যয় করে বাংলাদেশের মধুপুর জংগলের যোগাযোগ বিহীন প্রত্যন্ত অন্চলের অতি সাধারন, প্রান্তিক ও হত দরিদ্র মানুষজনের প্রয়োজনীয় সাস্থ্য সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন প্রায় তিনদশকের ও বেশী সময়, গড়ে তুলেছেন গরীব মানুষের হাসপাতাল । কাইলাকুরি হেলথ কেয়ার প্রজেক্ট ।

যে অঞ্চলে একজন হাতুড়ে ডাক্তারও কখনো যায়নি যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও দূর্গমতার জন্য- সে গ্রামেই তিন দশকের ও বেশী সময় ধরে নিউজিল্যান্ডের একজন এমবিবিএস ডাক্তার – লন্ডনে যিনি পোষ্ট গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। নিজের জীবন কাটিয়ে গেলেন গ্রামের দরিদ্র মানুষদেরই মতোন। তিনি বলতেন নিজেকে সাধারন মানুষের জীবন যাপনে অভ্যস্ত না করতে পারলে সাধারন মানুষের বন্ধু হওয়া যায় না।

bekar-abu-farhad 1

সত্তর দশকের শুরুর মধুপুরের কাইলাকৈর গ্রামের কথা কি ভাবা যায় ! অনেকবার তাঁর হাসপাতালে গিয়েছি কখনো তাঁর থাকার ঘরে যেতে পারিনি। তাঁর মৃত্যুর পর দেখলাম একটি অতি সাধারন মাটির ঘর, ভিটি কাদা মাটিতে লেপা- সে ঘরে মাটিতে খুব সাধারন একটি বিছানা- পুরোনো বিছানার চাদর, সাধারন মানের দুটি বালিশ, ছোট একটি টেবিল ফ্যান, একটি মশারী,কিছু বই পত্র, জার্নাল এবং দড়িতে ঝুলানো মাত্র কয়েকটি সার্ট প্যান্ট । ঘরের দরজা উইয়ে খাওয়া, ভাংগাচোড়া নড়বড়ে। শীতকালে যখন তাঁর সাথে দেখা হয়েছে তখন দেখিছি তিনটি শার্ট যা তাঁর কাছে ছিল তা একটির উপর একটি করে গায়ে দিয়েছেন , কখনো দুটি, কখনো তিনটি। সারাদিন তিনি গ্রামের মানুষদের মতোনই লুঙ্গীপরে ই থাকতেন। শহর থেকে কেউ আসলে দ্রুত তিনি প্যান্ট পরে আসতেন।

হাসপাতালের সব ওয়ার্ডই মাটির ঘর। একটি আধুনিক হাসপাতালের মতোন সব ওয়ার্ডই আছে তার হাসপাতালে। আলাদা আলাদা মাটির ঘর। আউটডোরে প্রতিদিন প্রচুর রোগীর চিকিৎসা ও চলতো। ছোটখাট সার্জারী হতো। বিভিন্ন ক্যাজুয়ালটি, আগুনে পোড়া এ সব তো ছিলই। প্রসূতি এবং শিশু বিভাগের বাইরে একটি পুষ্টি ওয়ার্ড ও আছে। গ্রামের পুষ্টিহীন শিশু, মহিলা এবং বৃদ্ধরা এ বিভাগে রেসিডেন্ট হিসেবে পুষ্টিকর খাবার, পথ্য – এ সব পেত।

ডায়েবেটিকের জন্য ও ছিল সার্বক্ষনিক চিকিৎসা ও প্যাথলজিকেল টেষ্ট। এত সব তিনি গড়ে তুলেছেন তাঁর নিজের এবং তাঁর বন্ধুদের নিউজিল্যান্ডর সম্পদ হতে। অকৃতদার এই মানুষটির ধ্যান জ্ঞানে সাধারন মানুষজন ছিল সারাদিন সারারাত। নিজে সাইকেল চালিয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত্য গ্রামের দূর দূরান্তে রোগী দেখে আসতেন। ক্রিটিক্যাল রোগীকে ভ্যানগাড়ী করে তাঁর হাসপাতালে নিয়ে আসতেন কিংবা প্রয়োজন হলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাঠাতেন। তাঁর হাসপাতালের তাঁর সব সহকারীরা ছিল প্যারামেডিক- তিনি ই তাদের শিখিয়ে পড়িয়ে প্যারাম্যাডিক বানিয়েছেন; তাদের প্রায় প্রত্যেকেই রোগী হিসেবে আগে কখনো তাঁর হাসপাতালে এসেছিলেন। পরে তাঁরা তাঁর কাছে থেকে গেছেন। তিনি বলতেন গরীব মানুষের চিকিৎসা এই গরীব মানুষেরাই দরদ দিয়ে করতে পারে। তাঁর একটি ক্লাশরুম ও ছিল, যেখানে তিনি প্যারামেডিকদের পড়াতেন, শিখাতেন। তাঁর মৃত্যুর পর এই প্যারামেডিকরা আগের মতোন হাসপাতালটি দেখছেন।
প্রথম আলো পত্রিকা এই হাসপাতাল সম্পর্কে তাদের এক রিপোর্ট লিখেছে , “হাসপাতাল’ শব্দটি শুনলেই সচরাচর যে দৃশ্যটা চোখে ভাসে, তার সঙ্গে মিলবে না একদমই। কাব্যিক ভাষার আশ্রয় নিলে, ‘ছায়া সুনীবিড়’ কথাটির সঙ্গে বরং একদম মানানসই। প্রকৃতি, আধুনিকতা আর সেবার ব্রত মিলেমিশে একাকার এখানে। সত্যিকারের সেবার ব্রত আছে বলেই হাসপাতালের কর্মীবাহিনীকেও মনে হয় একান্ত কাছের কেউ। আর যিনি এই হাসপাতালের প্রধান কর্তাব্যক্তি, তাঁর সঙ্গে দূরত্বটা কেবলই ভৌগোলিক। তিনি এডরিক বেকার। জন্মসূত্রে নিউজিল্যান্ডের মানুষ এই বৃদ্ধ ডাক্তারের সদাহাস্যমুখ যেন সে দূরত্বটুকুও ঘুচিয়ে দেয়। চিরকুমার এই মানুষটি দেখতেই শুধু বিদেশি। আচরণে তিনি কেবল স্বদেশিই নন, স্বজনও! গ্রামবাসীর কাছে তাই ডাক্তার এডরিক বেকার হয়ে উঠেছেন একজন ‘ডাক্তার ভাই’।’

bekar-abu-farhad
এখন এই হাসপাতালে ডাক্তার ভাইয়ের মৃত্যুর পর আরেকজন মানবদরদী ডাক্তার এসেছেন এমেরিকা থেকে তাঁর স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে। স্বদেশ নিউজিল্যান্ডে কাইলাকুরি হাসপাতালের ডাক্তার বেকারের একটি বড় বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ী গ্রুপ তৈরী হয়েছে । তাঁরা এখন এই হাসপাতালের জন্য আর্থিক সাহায্য পাঠাচ্ছেন। তাছাড়া ডাক্তার ভাই মৃত্যুর পূর্বে এই হাসপাতাল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ফান্ডের ব্যবস্থা করে গেছেন।

আমার সংগে দেখা হলে প্রায়ই বলতেন তাঁর একটিই দু:খ – তিনি বাংলাদেশের একজন ডাক্তার পেলেন না যাকে তিনি এই হাসপাতালটি বুঝিয়ে দিতে পারতেন। তবু ও ভাল বর্তমানে বাংলাদেশের গনস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ডাক্তার ভাইয়ের এই হাসপাতালটিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে।

প্রথম আলোর খবরে আরো বলা হয়েছিল, ‘তিনি বলতেন ‘আমরা খোঁজ করছি এমন একজন ডাক্তার, যিনি বুঝবেন এই কাজটা। সবচেয়ে ভালো হয়, ভবিষ্যতে এ হাসপাতালের পরিচালক যদি হন একজন বাংলাদেশি। এই প্রজেক্টটাকে বলা যায় একটা বিদ্রোহী প্রজেক্ট। এখানে আমরা গরিবদের জন্য কাজ করতে চাই। কম খরচের ব্যাপারটা বুঝতে হবে। অনেক ডাক্তার আছেন, যাঁরা বড় প্রেসক্রিপশন না লিখতে লজ্জা পান। ওষুধ কোম্পানির চাপ থেকে ডাক্তাররা ওষুধ দেন। এটা খুব লজ্জার, খুব দুঃখের ব্যাপার। এখানে যিনি আসবেন, তাঁকে বুঝতে হবে, ‘কম ওষুধ, কম পরীক্ষা’। একজন ডাক্তার যে পরিমাণ উপার্জন আশা করেন, এখানে এলে তিনি হয়তো তার ২০ ভাগের এক ভাগ পাবেন। তবু তাঁকে বিশ্বাস করতে হবে, এখানে যদি আমরা মরেও যাই, অনাহারী হয়ে যাই, তবু আমরা জিতলাম!’
পাশের বাংলাদেশি সহকর্মীদের দেখিয়ে বেকার আরও যোগ করেছিলেন, ‘এ হাসপাতালে তাঁকে এঁদের নিয়ে কাজ করতে হবে। এই যে রতন ভাই, সুলতান—এঁদের কাজ শেখাতে হবে। এঁরাই হবেন তাঁর যন্ত্রপাতি। এঁরাই হবেন তাঁর স্টেথিস্কোপ, গ্লুকোমিটার, বিপি মেশিন!”

এই মহান মানব দরদী মানুষটির জন্য সর্বান্তকরনে দোয়া করছি। মহান কারুণিক সৃষ্টিকর্তা, পরম দয়ালু সৃজনকারী- এই দয়াদ্র মানুষটির মানুষের সেবা তাঁর পরম ক্ষমাশীলতায় গ্রহন করুন।

ডাক্তার ভাই পরকালে শান্তিতে থাকুন!

মৃত্যুর কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সরকার এই মানবদরদী ডাক্তারকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করেছেন। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেব তিনি বাংলাদেশের মাটিতে শায়িত এখন।

 

(লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে সংগৃহীত)