আমানুল্লাহ নোমান
আমানুল্লাহ নোমান

জলে ঢাকা, ঢাকা

প্রকাশিত :১১.০৯.২০১৭, ৫:৩৪ অপরাহ্ণ
  • আমানুল্লাহ নোমান
    একটু বৃষ্টিতেই জলে ঢাকা পড়ে যায় ঢাকার রাস্তা। স্থবির হয়ে পড়ে নগর জীবন। কয়েক দশক আগেও ঢাকার অবস্থা এমন ছিল না। ৪৬টি খাল দিয়ে বৃষ্টির পানি নেমে যেত পার্শ্ববর্তী নদী বা জলাশয়ে। অনেক খাল ও জলাশয়ের এখন অস্তিত্বই নেই। কোনো রকমে অস্তিত্ব ধরে রেখেছে যে কয়টি খাল, সেগুলো দিয়েও পানি নামতে পারে না। দখল-ভরাটের কারণে ৫০ ফুট প্রস্থের খাল কোথাও কোথাও ২০ ফুট, কোথাও তার চেয়েও সরু হয়ে গেছে। একদিকে সরু, অন্যদিকে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকায় পানি নামা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এই সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন সময় নেয়া হয়েছে নানা প্রকল্প। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

ঢাকার জলাবদ্ধতার চিত্র। ফাইল ছবি

ঢাকার জলাবদ্ধতার চিত্র। ফাইল ছবি

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, দিন দিন ঢাকা শহরের খোলা জায়গাগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে, আর দখল হয়ে যাওয়া জায়গাগুলোতে পাকা দালান গড়ে ওঠায় পানি চুয়ে নিচে যেতে না পারায়, রান অব ওয়াটার বেড়ে যাচ্ছে। এতে করে জলাবদ্ধতা দিন দিন বাড়ছে।

অন্য দিকে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, প্রতি আট দশ বছর পরপর এ রকম অতি বর্ষণ হতে পারে, এটাকে মাথায় নিয়েই নগরীর ড্রেনেজ সিস্টেম করা উচিত।

পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন ১৯৯৬ অনুযায়ী ঢাকা ওয়াসাকে পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ২৬টি খাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাদের। তারা খালগুলোর কী রক্ষণাবেক্ষণ করে আর কী পানি নিষ্কাশন করে, তা তো ঢাকাবাসী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০০০ অনুযায়ী ঢাকার নদী, খাল, জলাভূমি সংরক্ষণের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ড বা পাউবোর। রাজধানীতে তাদের স্লুইস গেট, ডিএনডি বাঁধসহ বেশ কিছু প্রকল্প রয়েছে। ডিএনডি এলাকার অবস্থা আরো দুর্বিষহ। বছরের বেশির ভাগ সময়ই তাদের জলমগ্ন থাকতে হয়। কাগজে-কলমে ঢাকার সব খালের মালিক ঢাকা জেলা প্রশাসন। খাল ভরাট করে সারা ঢাকায় অনেক বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। তারা সেগুলো দেখেও দেখে না। অনেক সরকারি সংস্থাও খাল দখল করে ভবন তৈরি করেছে। সিটি করপোরেশন খাল ভরাট করে রাস্তা বানিয়েছে, কবরস্থান বানিয়েছে কিংবা বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করেছে। এমনকি খাল-জলাভূমি ভরাট করে প্লটও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বড়ই বিচিত্র আমাদের দেশ। বড়ই বিচিত্র আমাদের দায়িত্ববোধ।

সাধারণত বৃষ্টির পানি প্রথমত ভূগর্ভে শোষণ করে নেয়, বাকি পানি রান অব ওয়াটার হয়ে খাল বিল ও ড্রেন দিয়ে নদীতে চলে যায়। কিন্তু এখানে এই দুই পথের সবই অকার্যকর। তাছাড়া নগরীতে যে ড্রেনগুলো আছে তাও আবর্জনায় পূর্ণ, পানি যাওয়ার রাস্তায় বাধা প্রাপ্ত হচ্ছে, এ কারণে নগরীর জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করছে। যদিও এ ক্ষেত্রে নগরবাসীর দায়ও কম নয়। নিষিদ্ধ পলিথিন আর যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলার বাজে অভ্যাস যত দিন নগরবাসী বাদ না দেবে, তত দিন জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

ঢাকার জলাবদ্ধতার চিত্র। ফাইল ছবি

ঢাকার জলাবদ্ধতার চিত্র। ফাইল ছবি

ঢাকার খাল ভরাট করে কিছু এলাকায় বক্স কালভার্ট বানানো হয়েছে। ব্যয়বহুল প্রকল্প ছিল সেটি। খরচ শেষ তো আগ্রহও শেষ। এখন বক্স কালভার্টগুলো ময়লায় ঠেসে আছে, পানি নামতে পারে না। ফলাফল হয়েছে, বক্স কালভার্টের সামান্য জায়গা ছাড়া খালগুলোর বেশির ভাগ জায়গা দখলদারদের কবলে চলে গেছে। বিভিন্ন সময়ে ‘উর্বর মস্তির্কের’ এমন বাস্তবতাবর্জিত পরিকল্পনার কারণেই আজ ঢাকা মহানগরীর এই দুরবস্থা। শুধু প্রকল্প নিলেই হয় না, সেগুলোর পরিণতি নিয়েও ভাবতে হয়। আমরা চাই, সিএস বা আরএস নকশা অনুযায়ী ঢাকার খালগুলো উদ্ধারে চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একই সঙ্গে খালগুলোর সংস্কার করা হোক। সব ড্রেনেজ সিস্টেম পরিষ্কার করতে হবে। যাতে নদী পর্যন্ত পুরো লাইন পরিষ্কার থাকে। যাতে পানি সরল রেখায় প্রবাহিত হতে পারে। নদী পর্যন্ত এগুলো সচল রাখার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রয়োজন সমন্বিত কর্মদ্যোগ এবং তার বাস্তবায়ন। সঙ্গে গণসচতেনতা সৃষ্টি প্রয়োজন। যাতে করে আমরা নগরবাসীরা যেখানে সেখানে যেন ময়লা না ফেলি। আমাদের নিক্ষিপ্ত ময়লাগুলো ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে অতি দ্রুত অকার্যকর দেয়। তাই রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূর করতে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। এটা করতে না পারলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব হবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।