abu-farhad_ajsarabela

রোহিঙ্গা নিধন বন্ধের জন্য বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হোক

প্রকাশিত :১৬.০৯.২০১৭, ৪:১৫ অপরাহ্ণ
  • আবু ফরহাদ
    আরাকানি বা রোহিঙ্গাদের উপর প্রথম জাতিগত নিধন বা এথনিক ক্লিনজিং পর্যায়ের আক্রমণ সূচনা হয় ১৭৮৪ সালের শেষের দিকে। যখন ব্রম্মরাজ থাংচি আরাকান দখল করে। তখনও হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে পৈশাচিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। সে সময়ে প্রাণরক্ষার তাগিদে প্রায় চল্লিশ হাজার রোহিঙ্গা পালংকি বা বর্তমানের কক্সবাজারে আশ্রয় গ্রহণ করে।

১৭৯১ সালে কম্পানির সরকার ক্যাপ্টেন হিরম কক্স সাহেবকে পালংকিতে শরণার্থী ব্যবস্থাপনার জন্য পাঠান। ক্যাপ্টেন হিরম কক্স পালংকিতে দশ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীর একটি বসতি গড়ে তোলেন। সে বসতি অঞ্চল আজ কক্সবাজার নামে পরিচিত।

১৭৯১-৯২ সালের দিকে বর্মীরা প্রায় দু’লক্ষ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধদের হত্যা করে। একই ধারাবাহিকতায় ১৯৪২ সালে এবং তারপর আরো অনেকবার রোহিঙ্গারা এই সহিংসতার শিকার হয় রক্তপিপাসু বর্মীদের হাতে। ১৯৪২ ও তৎপরবর্তী সময়ে কক্সবাজার কিংবা তখনকার বাংলাদেশের নানা অঞ্চলে রোহিঙ্গারা আশ্রয় গ্রহণ করে।

অতীতে কতবার বর্মীরা এই নৃশংসতা করেছে তা তো আমরা জানি-ই। এই নৃশংসতা রোহিঙ্গাদের জাতিসত্ত্বা নিশ্চিহ্ণ করার একটি অপপ্রয়াস, নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কথা বলে বর্মীদের নৃশংসতাকে আড়াল না করাই উচিত। শত শত বছর ধরে রক্তলোলুপ বর্মীরা রোহিঙ্গা জনগোষ্টিকে নিশ্চিহ্ণ করার বা জাতিগত নিধনের অমানবিক প্রয়াস চালাচ্ছে- তারাই এই নির্মম নিষ্ঠুরতার জন্য এককভাবে দায়ী অন্য যত ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কথা আমরা বলি না কেন।

রাখাইন প্রদেশে যেটি একসময় আরাকান নামে পরিচিত ছিল সেখানে চীনাদের বড় ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়ে গেছে, তারা সেখানে গ্যাস পাইপলাইন বসানো, গ্যাস আহরণ, হাইড্রোকার্বনসহ আরো মূল্যবান খনিজ ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে। চীনের ব্যবসায়িক স্বার্থকে নস্যাৎ করার জন্য আমেরিকা বা অন্যকোন বৃহৎগোষ্টি সেখানকার জনজীবনকে অশান্ত করার উদ্দেশ্যে এ সবে ইন্ধন দিচ্ছে, কিংবা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার শান্তিপূর্ণ জনপদকে অশান্ত করার এটি একটি পাঁয়তারা। আদতে এটি রোহিঙ্গা জনগোষ্টিকে মিয়ানমান হতে, আরাকান বা রাখাইনে তাদের স্বভূমি হতে চিরতরে উচ্ছেদ করার একটি অমানবিক পরিকল্পনার অংশ, যেটি তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী করে আসছে।

মিয়ানমারের অমানবিক বর্মী বৌদ্ধদের নিষ্ঠুরতাকে ভূ-রাজনৈতিক রাজনীতি কিংবা আধিপত্যের লড়াই এসব সূত্রের ছাঁচে ফেলে তাদের এই এথনিক ক্লিনজিংকে খাটো করে দেখার কোন কারণ নেই। মিয়ানমার সরকার এবং মিয়ানমারের বৌদ্ধ জনগোষ্টি এই অমানবিক আচরণের জন্য দায়ী। তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেক জাগ্রত করার প্রয়াস এখন খুব জরুরি।

রোহিঙ্গাদের দুর্ভাগ্যের জীবন এখনো শেষ হয়নি। এখন মনে হবে তারা একসময়ের ইহুদি জনগোষ্টির মত ক্রমাগত স্টেটলেস বা রাষ্ট্রহীন মানুষে পরিণত হতে যাচ্ছে। ক’দিন আগে পড়লাম, পাকিস্তানের করাচীতে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব- এ সব দেশে তো আছেই। বাংলাদেশে অবস্থান করছে এক বিশাল অংশ।

ইহুদিদের জন্য আমেরিকা, ব্রিটেন থাকাতে তাদের একটি রাষ্ট্র এখন হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা তাদের জন্মভূমি ফিরে পাবে কি না সেটি এখন বিরাট এক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

মাতৃভূমিহীন মানুষ ভীষণ কষ্টের জীবনই যাপন করে। সর্বত্রই তারা রিফিউজি। করাচীর ঘিঞ্জি বস্তিতে থাকা এক বয়স্ক রোহিঙ্গা নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক কে বলেছে, They won’t let me be citizen, because then they have to give me rights, and they won’t call me refugees because then they have to give me aid.

কী মর্মান্তিক ও করুন জীবনযাপন করছে এই জনগোষ্টি। তারা রিফিউজির স্ট্যাটাসও পাচ্ছে না সরকারকে রিলিফ দিতে হবে বলে, আবার নাগরিকত্বও না। তাহলে তারা কিভাবে জীবন ধারণ করবে।

করাচীর বস্তির আর এক রোহিঙ্গা বলেছে, ‘We will die, trapped here without access to our livelihood.’ রোহিঙ্গাদের জন্য জীবনাবসানই কি সর্বশেষ উত্তর?

কোন ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ কিংবা ষড়যন্ত্র নয় নৃশংস বর্মীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলাই দরকার। ভূ-রাজনৈতিক কোন ষড়যন্ত্রের কথা বলে বর্মীদের নৃশংসতাকে আড়াল না করাই উচিত।

 

লেখক: কবি ও ব্যাংক কর্মকর্তা।