Sariat Picture 11

ক্যাডার নন-ক্যাডারের সাপ-লুডু: প্রসঙ্গ জাতীয়করণ

প্রকাশিত :২৩.০৯.২০১৭, ১:২০ অপরাহ্ণ
  • এইচ এম শরীয়াত উল্লাহ

‘ক্যাডার নাকি নন-ক্যাডার’ এ নিয়ে খেলা (!) জমে উঠেছে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারদের একটি অংশ ও জাতীয়করণ হতে যাওয়া ২৮৩ কলেজ শিক্ষকদের মাঝে। কোন পক্ষ বিজয়ী হয়, সেটা জানি না। এ নিয়ে তেমন আগ্রহও আমার নেই। আমার যেখানটায় আগ্রহ তা হলো, এই খেলার পেছনের যুক্তি। যুক্তিটা আমার এই মোটা মাথায় ধরা না পড়লেও উদ্দেশ্যটা বোধ হয় একটু আধটু ধরা পড়েছে। কথায় আছে Morning shows the day. সকালের সূর্য বলে দেয় দিনটা কেমন যাবে। সুতরাং সকালের সূর্য অর্থাৎ ক্যাডার নন-ক্যাডার ইস্যু নিয়ে আন্দোলনে নামা বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারদের (অবশ্য অধিকাংশ শিক্ষা ক্যাডারই তাদের বিপক্ষে) মনোভাব ও কার্যক্রমই উদ্দেশ্যটা বুঝাতে অনেককেই সাহায্য করেছে।
জাতীয়করণের তালিকায় থাকা শিক্ষকদের বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের মর্যাদা দিলে তাদের আত্মসম্মানে নাকি ছেদ পড়ে। কারণ তাহারা তাহাদের এই বিরল সম্মান অর্জন করিয়াছেন বহু ক্লেশ করিয়া। তাই জাতীয়করণের ঘোষণায় থাকা কলেজের শিক্ষকগণ কোনভাবেই যেন ক্যাডারের মর্যাদা পাইতে না পারে, No BCS No Cadre ইহাই যুক্তিযুক্ত। এই যৌক্তিক বিষয়টিই তাহারা তুলিয়া ধরিবার জন্য জাতীয় শহীদ মিনারে গিয়ে অবস্থান করিয়া ছিলেন। কিন্তু তাহারা তাহাদের পাদুকা খুলিয়া শহীদ মিনারে উঠিতে নারাজ; পাছে ভয় হয় তাহাদের এই বিরল সম্মানে ছেদ পড়ে। তাদের সম্মানে ছেদ পড়–ক আমিও চাই না। কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্যখানে; এক বালতি দুধের ভেতর এক ফোঁটা প্রস্রাব ঢেলে দিলে পুরো দুধটাই যেভাবে অখাদ্য হয়ে যায়, তেমনিভাবে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি সোনার বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, উন্নয়নের রূপকার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যেই মহান উদ্দেশ্য তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে রাখার জন্য সরকারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানপন্থী কিছু অসাধু শিক্ষা ক্যাডার ও কর্মকর্তার গভীর ষড়যন্ত্র কিনা সেটা ভেবে দেখার জন্য বোদ্ধাদের কাছে অনুরোধ রইল।
দেশটাকে যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মধ্যম আয়ের দেশের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তখন দেশটাকে পেছনে টেনে ধরার জন্য গুটি কয়েক অসাধু লোক তাদের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে যারপরনাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। উন্নয়নের সেই ধারাকে আরো ত্বরানিত করার জন্য শিক্ষাবান্ধব বর্তমান সরকার শিক্ষার চাকা এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ছাব্বিশ হাজার রেজিস্ট্রার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছেন। কিছুদিন আগেও হাজার হাজার পুল শিক্ষককে সরকারিকরণ করেছেন। পুল শিক্ষক আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ তো একই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাননি। কোথায়? এ নিয়ে তো আপনাদের মাথা ব্যথা ছিল না।
দ্বিতীয় ধাপ হিসাবে সরকার প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও একটি করে কলেজ জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়েছেন এবং এ লক্ষ্যে কাজও চলছে দ্রুতগতিতে। বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়াও তো ভিন্ন। এছাড়া ক’মাস আগে যখন প্রদর্শক থেকে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হলো, তখনও তো মান নিয়ে কোন কথা বললেন না। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে যত শিক্ষক আত্মীকরণ হয়েছে, সবাইকেই বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। অথচ এখন মরিয়া হয়ে উঠেছেন কেন? অবশ্য সবাই নয়, শুধু তারাই মারিয়া হয়ে উঠেছে যারা হাওয়া ভবন থেকে ক্যাডার হয়ে এসেছেন, যারা ২৪ শে আগস্ট নায়েমের অনুষ্ঠানে সিনিয়র কর্মকর্তাদের চামড়া তুলে নেয়ার শ্লোগান দিয়েছে আর যারা বাংলার ১৬ কোটি মানুষের আবেগের প্রতীক পবিত্র শহীদ মিনারে জুতা নিয়ে উঠেছে। তবুও আপনাদের সম্মানে আঘাত পরুক আমরা চাই না। কেউ আপনাদের সম্মানের চাদর টেনেও ধরছে না। আপনারা কেন অন্যের চাদর নিয়ে এত টানাটানি শুরু করলেন? স্যার, এটা কি বিনয়ের নমুনা? অথচ যে যত বেশি জ্ঞানী সে তত বেশি বিনয়ী।
তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, জাতীয়করণের তালিকায় থাকা সকল শিক্ষকই অযোগ্য। তাই তাদের নন-ক্যাডার করে রাখা হলো। তাহলেই কি সকল সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে? নন-ক্যাডার কোন শিক্ষক অবসরে চলে গেলে ঐ পদে সরকার কাকে পাঠাবে? ক্যাডার নাকি নন-ক্যাডার? যদি পদগুলো স্থায়ীভাবে নন-ক্যাডারদের জন্য নির্ধারিত করা হয় তাহলে আমার কোন অভিযোগ নেই। কিন্তু তাতো হবে না। ঐ পদে কোন না কোন ক্যাডার আসবে। তাহলেও একটা প্রশ্ন থেকে যায়, আপনাদের ভাষায় বেসরকারি কলেজে যেনতেনভাবে নিয়োগ পাওয়া অযোগ্য শিক্ষকদের সহকর্মী হিসেবে আপনি কিভাবে কাজ করবেন? তখন আত্মসম্মান কোথায় লুকিয়ে রাখবেন? আর প্রমোশন নিয়ে ভাবছেন? কেন, এত ভাবনার কি আছে? আপনারা তো অধিকতর যোগ্য, তাই প্রমোশনের দৌড়ে আপনাদেরই তো এগিয়ে থাকার কথা। জনাব, অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলছি, ছাত্র-ছাত্রীদের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের পরিসংখ্যানটা মেলাবেন কি? আপনাদের কথা যদি সত্য হয়, তাহলে বেসরকারি কলেজে সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক কম শিক্ষার্থী কৃতকার্য হওয়ার কথা। খুব সম্ভব চিত্রটা একটু ভিন্ন।
সুতরাং দেশ গঠনে সরকারি কলেজের শিক্ষকদের যেমন অবদান আছে অনুরূপভাবে বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদেরও অবদান আছে। তাই আসুন, সাপ-লুডুর মত ক্যাডার নন-ক্যাডারের খেলা বন্ধ করে আইনকে বাঁধাগ্রস্ত করার চেষ্টা না করে বরং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ মাতৃকার সেবায় নিয়োজিত হই। আর আইন চলুক তার আপন গতিতে।

লেখক: প্রভাষক, হিজলা কলেজ, বরিশাল।