abdullah-noman

ধুলোর শহর ঢাকা

প্রকাশিত :০২.১০.২০১৭, ৬:২৩ অপরাহ্ণ

আমানুল্লাহ নোমান

কার্তিকের শুরু। বৃষ্টিও খানিকটা কমে এসেছে। আবহাওয়ায় এসেছে শীতের পরশ। কিন্তু ঢাকার জীবনে শুরু হয়েছে নতুন যন্ত্রণা। ধুলোর যন্ত্রণায় অস্থির নগরবাসী। দিন দুপুরে নগরের অধিকাংশ রোড থাকে কুয়াশাস্নাতের মত ঘোলাটে। নগরজুড়ে সর্বত্রই চলছে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ।

বিভিন্ন সড়কে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলাকালে গাড়ি যাতায়াতের সময় সড়কের ধুলা উড়ে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এতে পথচারিদেও পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ। কোথাও কোথাও সড়কের খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলাকালে নির্মাণ সামগ্রী মাটি, বালু, পাথর ইত্যাদি রাস্তার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হচ্ছে দিনের পর দিন। এতে গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে ধুলো ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। আর ধুলোর রাজত্বে অসহায় হয়ে পড়ছেন নগরবাসী।
ধুলার কারণে একদিকে বাড়ছে ভোগান্তি অন্যদিকে রোগবালাই। এ ধুলায় শুধু জনস্বাস্থ্যই যে হুমকির মুখে তা নয়, মানুষের জীবনযাত্রায় ঘটছে বাধা। অনেক মহল্লায় দেখা গেছে রোড কেটে সুয়ারেজের পাইপ বসানো হয়েছে অথবা গ্যাস বা টেলিফোন লাইনের কাজ করা হয়েছে বছর খানেক আগে। কিন্তু আজো রাস্তায় পিচ ঢালা হয়নি। যার ফলে ধুলোয় ঢেকে যায় পুরো মহল্লা। রাজধানীর অধিকাংশ মহল্লার চিত্র এমনই।

ধুলোময় ঢাকার প্রধান সড়কের দুই পাশের গাছের পাতায় এমন গভীর আস্তরণ পড়েছে যে, পাতাগুলোর ছিদ্র বন্ধ হয়ে গেছে। পাতাগুলো যেমন অক্সিজেন ছাড়তে পারছে না, তেমনি পরিবেশ থেকে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইডও গ্রহণ করতে পারছে না। এ ধুলোর কারণে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গাছের নিজের খাদ্য তৈরির পথও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে মানবদেহেও। কারণ ধুলোর জন্য পাতার মাধ্যমে মানবদেহের জন্য বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরিতেও বিঘ্ন ঘটছে।

পুরো রাজধানী যে এখন ধুলোয় ঢাকা, তা যে কেউ রাস্তায় বের হলেই টের পাবেন। অথবা বাসার জানালা দিন রাত খোলা রেখে আসবাবপত্র বা ফ্লোরে হাত রাখলেই বোঝা যাবে বাসার ভেতরে কী পরিমাণ ধুলোর স্তর জমেছে। প্রধান সড়কগুলোয় উড়তে থাকা ধুলো রূপ নিয়েছে ধুলোর কুয়াশায়। সেই সব ধুলো নিয়েই দম বন্ধ অবস্থায় চলতে হচ্ছে মানুষকে। দ্রুতগতির গাড়ি উন্নয়নের নির্মাণযজ্ঞের ধুলো উড়িয়ে দিচ্ছে বাতাসে। নাকে-মুখে ঢুকছে পথচারীদের। মুখে মাস্ক নিয়েও ধুলো থেকে রক্ষা মিলছে না কারো। বিশেষ করে স্কুলগামী শিশু ও রোগীদের পড়তে হচ্ছে বেশি দুর্ভোগে।
অথচ এই ধুলো থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে দুই সিটি করপোরেশনের কোনো পদক্ষেপও দেখা যাচ্ছে না। দুই সিটি করপোরেশনের দাবি, ধুলোর মূল কারণ মূলত ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল নির্মাণ। যেসব শর্তের মধ্যে থেকে এই নির্মাণকাজ করার কথা, তা নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো মানছে না। সেই সঙ্গে রয়েছে আরো কিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন নালা, তিতাস গ্যাসের লাইন স্থাপন, ডেসকো ও ডিপিডিসি ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক তার, বিটিসিএল টেলিফোন লাইন এবং বিভিন্ন বেসরকারি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ভূগর্ভস্থ ইন্টারনেট ক্যাবল লাইন বসাতে রাজধানীজুড়ে সড়ক কাটা হচ্ছে। এসব কাজের জন্যও সড়কে ধুলা হচ্ছে।

এই ধুলোর কারণে শুধু জনস্বাস্থ্যই যে হুমকির মুখে তা নয়; রাজধানীর মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন একটি জরিপ করেছে। পবা উক্ত রিপোর্টে বলেছে, ধুলোর পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুমে নিম্নবৃত্ত থেকে উচ্চবৃত্ত পরিবারের খরচ ৫-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। তারা এর স্বপক্ষে যুক্তি দেখিয়েছে যে, ধুলোর পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে কাপড় পরিষ্কার, ঘর ধোয়ামোছা, বাড়ির টপের গাছ পরিষ্কার এবং রোগব্যাধির খরচ বেড়ে গেছে। এসব দিক বিবেচনা করে তারা জরিপ কাজটি করেছেন।
ঢাকার বাতাস যে কতটা বিষাক্ত ও দূষিত তার প্রমাণ আরো পাওয়া যায় ঘরের বাইরে (আউটডোর) বায়ুদূষণের ওপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ জরিপ। ওই জরিপ বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান চতুর্থ। ৯১টি দেশের এক হাজার ৬০০টি শহরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষিত ২৫টি শহরের তালিকায় রয়েছে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপের ফল অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি দূষিত বায়ুর ২৫টি শহরের তালিকায় নারায়ণগঞ্জের অবস্থান ১৭তম। গাজীপুর ২১তম ও ঢাকা ২৩তম অবস্থানে। তালিকায় সবচেয়ে বেশি দূষিত শহর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ভারতের দিল্লিকে। সবচেয়ে বেশি দূষণের দেশের তালিকার শীর্ষে আছে পাকিস্তান।

রাজধানীকে ধুলো বালি থেকে মুক্ত রাখতে একসময় ভোররাতে সিটি করপোরেশনের গাড়ি প্রধান সড়কগুলোয় পানি ছিটাতো। পানিতে ধুয়ে যেত দুই পাশের গাছের পাতা। বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা বর্জ্যও পরিষ্কার হতো ভোরের আলো ফোটার আগেই। ভোরে নাগরিকরা পেত ধুলো-আবর্জনামুক্ত পরিচ্ছন্ন এক নগরী। কিন্তু এখন পানি ছিটানো হয় না। শহরে বের হলেই ধুলোয় দম বন্ধ হয়ে আসে। অথচ বিভিন্ন দেশে এখনো ধুলো দূর করতে পানি ছিটানো হয়। সিটি কর্পোরেশনের নাগরিক সেবা অনেকটা দায়সাড়াভাবে চলছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকেরা নিজেদের চাকুরি বাঁচাতে এক প্রকার দায় এড়ানোর কাজ করছেন। যার ফলে নাগরিকেরা প্রকৃত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ঢাকার রাস্তায় ধুলোর প্রভাব নতুন কোন সমস্যা নয়। পুরাতন এ সমস্যাটির আজও স্থায়ী সমাধান হয়নি। নগর উন্নয়ন যেমন জরুরি তার চেয়েও বেশী জরুরি স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ। নগর উন্নয়নের দোহাই দিয়ে পরিবেশ দূষণ কারো কাম্য নয়। নগর পিতা সহ অন্যান্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের উচিত নগরবাসীর স্বাস্থ্যকে ভালো রাখতে ধুলো মুক্ত ঢাকা গড়তে সচেষ্ট হওয়া।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।