khulna sasto complex

বেহাল খুলনার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো

প্রকাশিত :১১.১০.২০১৭, ৫:৪১ অপরাহ্ণ

শুভ্র শচীন, খুলনা : চিকিৎসা সরঞ্জাম বিকল অথবা সচল থাকলেও টেকনিশিয়ানের অভাব, চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্স সংকট নিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে খুলনার নয়টি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো। বছরের পর বছর কর্তৃপক্ষ এসব সংকটের দিকে নজর না দেয়ায় চিকিৎসাকেন্দ্রের সেবার মান অত্যন্ত নিচে নেমে গেছে। এ সুযোগে জমে উঠেছে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বাণিজ্য। স¤প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো ঘুরে এমন চিত্রই চোখে পড়ে।

তেরখাদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন অচল থাকার পর মেরামত শেষে এক্স-রে মেশিনটি সচল হয়েছিল ২০০৯ সালে। কিন্তু গত আটবছরেও মেশিনটি আর চালু করা যায়নি। এর একমাত্র কারণ মেডিকেল টেকনোলজি (রেডিওগ্রাফি) পদে কোনো লোক না থাকা। মাইক্রোস্কোপটিও বিকল। জনবল না থাকায় ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম চালু নেই। ১৯৭৪ সালে মাত্র ২৫টি বেড নিয়ে যাত্রা করা হাসপাতালটি এখনো ৩১ বেডে সীমাবদ্ধ। পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক্স-রে মেশিনটিও অচল। সংস্কার করতে ২০১৫ সালে একজন ইঞ্জিনিয়ার মেশিনটি পরিদর্শন করেন। কিন্তু সচল আর হয়নি। এ হাসপাতালের জেনারেটর ও অপারেশন থিয়েটারের লাইট পর্যন্ত নষ্ট।
দীঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আন্তঃবিভাগ অনেকটা অরক্ষিত। টেকনিশিয়ান ও চালকের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এক্স-রে মেশিন ও অ্যাম্বুলেন্স।
ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান সমস্যাই হচ্ছে জনবল সংকট। ৫০বেডের এ হাসপাতালের ২৫টি পদের মধ্যে ডাক্তারের ১১টি পদই শূন্য। এখানকার উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের ছয়টি পদের সবক’টিই শূন্য। একইভাবে তিনজন ফার্মাসিস্টের একজনও নেই। তিনজনের স্থলে দুজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাবরেটরি) রয়েছেন। ২০ জনের মধ্যে মাত্র ১১ জন রয়েছেন নার্স। এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি কিছুই হয় না এ হাসপাতালে। জেনারেটরটি রয়েছে বাক্সবন্দি। আর এক্স-রে মেশিনটি বসানোর আগেই অচল হয়ে রয়েছে। শুধু সিবিসি ও ইউরিন ছাড়া আর কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নেই রোগীদের ।
১৯৮৪ সালে ৩১ বেড নিয়ে যাত্রা হওয়া রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এখনো ৩১ বেডে সীমাবদ্ধ। যদিও কিছুদিন আগে ৫০ বেডের জন্য ভবন নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু এখনো পদায়ন হয়নি জনবল। চিকিৎসকের পাঁচটিসহ এ হাসপাতালে বর্তমানে ২৯টি পদ শূন্য রয়েছে। জনবলের অভাবে বন্ধ রয়েছে ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও ডেন্টাল এক্স-রে।
নয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট তো রয়েছেই, পাশাপাশি যারা আছেন, তাদেরও খুব একটা দেখা পাওয়া যায় না। যেসব চিকিৎসকের উপজেলা পর্যায়ে প্রাইভেট ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে বা সেখানে কাজ করেন, তাদের ততপরতাই বেশি লক্ষ করা যায়। তারা এখান থেকে রোগী সংগ্রহ করেন!
খুলনার সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানায়, জেনারেল হাসপাতালসহ সিভিল সার্জনের আওতাধীন নগরীর অন্যান্য স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ও জেলার নয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে ৫৮৭টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণীর ১১২টি, দ্বিতীয় শ্রেণীর ৬০টি, তৃতীয় শ্রেণীর ২৮৪টি এবং চতুর্থ শ্রেণীর ১৩১টি পদ শূন্য থাকায় উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। সিভিল সার্জন ডা. এএসএম আব্দুর রাজ্জাক বলেন, জনবলসহ জেলার স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্র তুলে ধরে প্রতিমাসেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পত্র পাঠানো হয়। প্রতিটি প্রতিবেদনেই জনবলসহ অন্যান্য সংকটের কথা উল্লেখ থাকে।
এদিকে ৪ হাজার ৩৯৪ দশমিক ৪৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের খুলনা জেলার জনসংখ্যা ২৩ লাখ ৩৪ হাজার ২৮৫ জন (আদমশুমারি-২০০১)। এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে সুলভে স্বাস্থ্যসেবা দিতে নির্মিত সরকারি হাসপাতালগুলোর সংকটকে পুঁজি করে ভূঁইফোঁড় বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে দেদার। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হাসপাতালের চিকিৎসকদের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক চিকিৎসকের রয়েছে নিজস্ব ক্লিনিক। এ কারণে উদ্দেশ্যমূলকভাবেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর বিকল যন্ত্রপাতি সচল করেন না তারা। হাসপাতালের পাশেই এসব ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলে দিব্যি ব্যবসা করে যাচ্ছেন। দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে এমন একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক্স-রে মেশিন স্থাপন করা হয়েছে টিনশেড ঘরে। এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মবহির্ভূত হলেও খুলনার স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে প্রতিবছর লাইসেন্স নবায়ন হচ্ছে। আর কপাল খুলছে এসব নবায়ন কর্মকর্তাদের। কোনো রকম জবাবদিহিতা ছাড়াই তারা যুগের পর যুগ একইস্থানে চাকরি করে জীবন পার করছেন। অবৈধ পন্থায় গড়ছেন টাকার পাহাড় আর বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি!