আমানুল্লাহ নোমান।
আমানুল্লাহ নোমান।

যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে ব্লু-হোয়েল

প্রকাশিত :১১.১০.২০১৭, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ
  • আমানুল্লাহ নোমান
    এভ্রিল ঝড় থেকে বেড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন ব্লু -হোয়েলে’র দিকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটার পর একটা ইস্যু ঘোরপাক খায়। সেটা নিয়ে কিছু দিন চলে নানা গুঞ্জন। বর্তমানে ব্লু -হোয়েল নিয়ে চলছে।

ব্লু-হোয়েল বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢালাওভাবে এসেছে ঢাকার এক কিশোরীর আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে। আত্মহত্যাকারী রাজধানীর হলিক্রস স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী স্বর্ণা। অনেকের দাবি স্বর্ণা ব্লু -হোয়েল গেমস খেলে মারা গেছেন।

অবশ্য এর বিপরীতেও মত এসেছে। স্বর্ণার কাছের এক আত্মীয় কেয়া চৌধুরী জুই ‘দৈনিক আমাদের অর্থনীতি পত্রিকায়’ ব্লু -হোয়েল নয় মেয়েটাকে শান্তিতে থাকতে দিন’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছেন। উক্ত কলামে তিনি লিখেছেন স্বর্ণা ব্লু -হোয়েল খেলে মারা যায়নি। ‘আমি নিজের হাতে মেয়েটাকে শেষ শ্নান করিয়েছি। ওর গায়ে সামান্য কোন কাটা ছেড়ার দাগও ছিল না, ছিল না কোন ট্যাটু। ওর ফোন ঘেটেও পাইনি কোন প্রমাণ যার জের ধরে বলা যায়, ও ব্লু -হোয়েল খেলতে শুরু করেছিল।

যে কথাটা আজ ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে, সেকথাটা নিতান্তই অবান্তর। ভুলটা আসলে আমারই। আমিই সর্বপ্রথম অমুলক এ সন্দেহটা করি। কিন্তু সবকিছু দেখে-শুনে বুঝতে পারি যে, সন্দেহটা একদম ভিত্তিহীন।’

কেয়া চৌধুরী জুই এর একথাগুলো কত জনের কাছে পৌঁছেছে সে পরিসংখ্যান আমার জানা নেই। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখনো প্রতিষ্ঠিত আছে যে, মেয়েটি ব্লু -হোয়েল গেমস খেলে মারা গেছে।

বিশ্বের অনেক দেশে এ গেমসের শিকার হয়ে বহু লোক আত্মহত্যা করেছে। এ কথাটি সত্য। কিন্তু বাংলাদেশে সর্বপ্রথম স্বর্ণার নামটি আসাতে মিডিয়াতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। টনকনড়ে প্রশাসনেরও।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একে অপরকে সতর্ক করতে থাকে এ গেমস সম্পর্কে। ফেসবুকের ইনবক্স ভরে যাচ্ছে ব্লু -হোয়েল ম্যাসেজে। এক কথায় নীল তিমির জয় জয়াকার। এমন অবস্থায় অনেকে কৌতুহলী হয়ে ব্লু -হোয়েলের লিংক খুঁজছেন।

অনেকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন একথা বলে আমি ব্লু -হোয়েল গেমস খেলতে চাই, কারো কাছে লিংকটি থাকলে দিন। গুগুল সার্চে ব্লু -হোয়েল এখন টপে। অজানা এক সন্দেহে ব্লু -হোয়েল এখন সবার মুখে মুখে। কিছু দিন আগেও এ বিষয়ে সবাই জানতো না। এখন সবাই জানে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্লু -হোয়েল গেমের অ্যাপ সম্পর্কে কিছু কথা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই বলছেন, একবার অ্যাপটি ইনস্টল করা হলে তা আর মুছবে না। এটাও ভুল তথ্য। কারণ প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, সব অ্যাপই মোছা সম্ভব।

তাহলে প্রশ্ন আসে গেমসটি কিভাবে চলছে? বাস্তবে ব্লু -হোয়েল কোন গেম নয়। এটি মূলত কিছু দুষ্ট লোকের মাধ্যমে অসহায় বা দুর্বল একজনকে চালিত করা। আর এজন্য অন্য যেকোনো মেসেঞ্জার, ফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করবে তারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা পদচারণা করেন তারা এজন্য সহজেই এ গেমের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্লু -হোয়েল গেমস পরিচালনাকারীরা খেলোয়াড়ের সব তথ্য তারা নিয়ে নেয়। এরপর ব্লাকমেইল করে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করে এমনটাই শোনা যায়। তবে ওরা বিভিন্ন ধাপে ধাপে আত্মহত্যা প্রবণ লোককে শনাক্ত করে ফেলে। অন্যথায় তাকে গেমস কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে না।

দৈনিক মানব জমিনের রিপোর্ট সূত্রে জানা যায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আইটি ইঞ্জিনিয়ার আল ইমরান মঙ্গলবার মানবজমিনকে বলেন, ব্লু -হোয়েল নিয়ে হইচই শুরু হওয়ায় আমি এই ডেথ গেমটির বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠি। ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে পেয়েও যাই গেমসটি। ২৫তম ধাপে গেমসটির কিউরেটররা আমাকে অযোগ্য ঘোষণা করে। ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, সোমবার রাত ১২টার দিকে আমি গেমসটি খেলার চেষ্টা করি। ২৫তম ধাপে গেলে অ্যাডমিন প্যানেল থেকে আমাকে বলা হয়, আপনি বাঁ হাতের তর্জুনী দিয়ে বা কপালের পাশটা ম্যাসাজ করতে থাকুন। আমি জানাই, ওকে করছি। তারা পুনরায় জানায়, এবার আপনি ডান হাতের তর্জুনী দিয়ে ডান কপালের পাশটা ম্যাসাজ করুন। এবারও আমি তা না করেই জানাই, করেছি। এ জবাব পেয়ে তারা জানায়, এবার আপনার অনুভূতি লিখুন। আমি লিখি, বিশেষ কোনো অনুভূতি তো পাচ্ছি না। এর জবাবে তারা জানায়, ইউ আর নট এলাউড।

আল ইমরান বলেন, ব্লু -হোয়েলের অ্যাডমিন যারা চালায় তারা অত্যন্ত বিচক্ষণ। না হলে তারা আমাকে ব্লক মারতে পারতো না। আমার ধারণা, প্রথম কয়েকটি ধাপেই তারা তাদের আদর্শ শিকার চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। আর সে অনুযায়ীই একেকটি ধাপ সাজায়।

এ গেমের মধ্যে প্রথমে সহজ কাজ দেওয়া হয়। পাঁচ মিনিট হাঁটা, মুভি দেখা – এমন সাধারণ কাজ থেকে শুরু করে হাত কাটা বা তেলাপোকা/বিড়াল/কুকুর হত্যা বা ছাদে দাঁড়ানোর মতো কাজ দেয়া হয়। এরপর খেলোয়াড়ের মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে কঠিন টাস্ক দেয়। যেমন ড্রাগ নিয়ে তার ছবি দিতে বলে, একটি নুড ছবি পাঠাতে বলে তারা। এভাবে ধাপে ধাপে ব্যবহারকারীকে আত্মহত্যার দিকে ঝুকে দেয়। যার মাধ্যমে তারা বেঁচে থাকাকে মূল্যহীন মনে করে।

এ গেমের শেষ কয়েকটি ধাপ সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। ধারণা করা হয় অনেককে এভাবে ব্রেন ওয়াশ করা হয় যে, মৃত্যুর পর নতুন আরেকটি সুন্দর জীবনের শুরু হবে। জঙ্গিরাও একই কায়দায় আত্মঘাতী হামলাকারী তৈরি করে। ঠিক একই ধরনের প্রলোভনেই হয়তো অনেকে ব্লু -হোয়েল গেমের শেষে আত্মহত্যা করে।

২১ বছর বয়সী রুশ ছাত্র ফিলিপ বুদেইকিন ২০১৩ সালে প্রথম এই গেমটি তৈরি করেন। তাঁর পড়াশোনার বিষয় ছিল মনোবিজ্ঞান। এই গেম ২০১৬ সাল থেকে ছড়াতে থাকে। গেমটির মূল লক্ষ্য দুর্বলচিত্তের মানুষ, বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীরা। চলতি বছর পর্যন্ত রাশিয়া, ভারতসহ ব্লু -হোয়েল খেলে বেশ কিছু আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর এসেছে।

ব্লু -হোয়েল গেম ইন্টারেনেটে প্রকাশ্য কোনো ওয়েবসাইটে (পাবলিক ডোমেইন) পাওয়া যায় না। ইন্টারেনেট সেবাদাতাদের সংগঠন আইএসপি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মো. আমিনুল হাকিম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এই গেম কোনো ওয়েবসাইট বা অ্যাপ স্টোরে থাকে না। কারও কাছ থেকে পাওয়া ওয়েবসাইটের ঠিকানা (লিংক) থেকে গেমটি নামিয়ে (ডাউনলোড) নিয়ে খেলতে হয়। বাংলাদেশে কোনো নেটওয়ার্কে এখনো ব্লু -হোয়েলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।’

ব্লু -হোয়েল অন্য গেমগুলোর মতো ইন্টারঅ্যাকটিভ নয়। এই গেমে খেলোয়াড়ের কাছে লিখিত বার্তায় গেম প্রশাসকের নির্দেশনা আসে। সেখানে একটা একটা করে কাজের নির্দেশ বা চ্যালেঞ্জ থাকে। সে কাজটা করার পর ছবি তুলে বা ভিডিও করে গেম প্রশাসককে পাঠাতে হয়। এভাবে ৫০তম ধাপ বা ৫০তম দিনে সবশেষ নির্দেশটি আসে। এই নির্দেশ হলো আত্মহত্যা করার।

ব্লু -হোয়েল প্রথম মরণঘাতী গেম নয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে স্ট্রেনজার মেন নামের একটি উইন্ডোজভিত্তিক গেম তৈরি করা হয়েছিল। সেটির কারণে দুজন গেম খেলোয়াড় মারা গিয়েছিলেন বলে ইন্টারনেট সূত্র থেকে জানা যায়।

ব্লু -হোয়েল গেম এখন বৈশ্বিক সমস্যা। হীনমন্যতায় ভোগা ও দুর্বল মানুষ, বিশেষ করে কিশোর কিশোরীদের জন্য ভয়াবহ। তাই সকলকে এ বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে। অভিভাবক, শিক্ষক সহ সবাই যার যার অবস্থান থেকে সচেতন হলেই আমরা এ বিষয়টি থেকে মুক্তি পেতে পারি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আজসারাবেলা/রবি/কলাম/ব্লু-হোয়েল