ডা. জাকির হোসেন।

ইরা’রা যেভাবে সীসার নেশায় আসক্ত হচ্ছে

প্রকাশিত :২৪.১০.২০১৭, ৬:৫৯ অপরাহ্ণ
  • ডা. জাকির হোসেন
    ইরা’র সঙ্গে পরিচয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি লেখা তার ভালো লাগে। এরপর ইনবক্সে তার কিছু সমস্যা তুলে ধরেন। পরিচয় জানতে চাইলাম। উনি ডির্ভোসড ৪৫ উর্ধ্ব এক ধনাঢ্য মহিলা। ফেসবুকে অনেক পরামর্শ চাইলেন, বললাম হাসপাতালে আসেন সময় নিয়ে, আপনার সমস্যাগুলো আগে ভাল করে জানতে চাই। আমাকে ফোন করে সময় চেয়ে নিলেন হাসপাতালে আসার জন্য। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় তার বাবার বাসায় থাকেন ইরা।

হাসপাতালে আসলেন। ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত। এসেছেন মূলত ডায়াবেটিসসহ তার আরো কিছু সমস্যার কথা জানাতে। ডির্ভোসড হয়েছে দু’বছর। বাবা গত হওয়ার পর ব্যবসা বাণিজ্য বড় ভাই দেখাশোনা করেন। বড় ভাইয়ের সংসারে দু’মেয়ে। মেয়েরা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা শেষ করে প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে।

ইরা হতাশা দূর করার জন্য ফেসবুক বন্ধুদের সঙ্গে রাত জেগে কথা বলেন। দু’সন্তান স্বামীর সংসারে ফেলে ইরা এখন একাকীত্বে ভুগছে। একদিকে জীবনের হতাশা, আরেক দিকে একাকীত্ব কোনভাবেই দূর করতে পারছেন না। ভাইয়ের মেয়ে বাসার ছাঁদে রাতভর বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডায় মেতে থাকে। ইরা তাদের সঙ্গে মিশতে পারে না। ভাইয়ের মেয়ে রাতে ইরা’র সঙ্গে একই রুমে থাকে। ইরা রাতের বেশিরভাগ সময়ই জেগে থাকেন। বন্ধুদের সঙ্গে রাতভর মোবাইলে কথা চলে। ভাইয়ের মেয়ে সিমি, ফুফু ইরা’কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে, বন্ধুত্ব করতে সাহায্য করে। অল্পদিনেই ইরা সিমিদের জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রতি সপ্তাহেই সিমি বাসার ছাঁদে বন্ধুদের নিয়ে সীসা পান করে। সেই সীসা তার ফুফুর জন্য গভীর রাতে রুমে নিয়ে আসে। ইরা ধীরে ধীরে সিগারেট ও সীসায় আসক্ত হয়ে পড়েন।

বয়স আর ডায়াবেটিস দুটোই এক সময় ইরাকে কাবু করতে থাকে। নিজেকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন। খুব বেশি মন খারাপ না থাকলে এখন আর সীসা পান করেন না। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত একজন রোগীকে সীসার নেশায় আসক্ত হতে সাহায্য করেছে নিজের ভাইয়ের মেয়ে। ডায়াবেটিস এমন এক রোগ যা রোগীর জীবনী শক্তি ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেয়। তারপর আবার মরণনেশা সীসায় আসক্ত এই ভঙ্গুর ডায়াবেটিক রোগীর দেহ।

কোথায় আজ আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধ। ইরা’কে বলেছিলাম পরিবারের সদস্যরা ব্যাপারগুলো কি একবারেই জানে না? উত্তরে ইরা বলেছিল, একবারে যে জানে না তা নয়। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা করায় এগুলো একটু আধটু বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে হয়েই থাকে। রীতিমত চমকে উঠলাম ইরা’র উত্তর শুনে!

কোথায় যাচ্ছে আমাদের প্রিয় প্রজন্ম? আজকাল নামিদামি সব রেস্টুরেন্ট মালিকরাও তাদের ব্যবসা-বৃদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠানে ‘সীসা লাউঞ্জ’ চালু করেছে। রাজধানীর পাবলিক এবং প্রাইভেট ভার্সিটির উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীদের টার্গেট করেই এসব ‘সীসা লাউঞ্জ’ গড়ে তোলা হচ্ছে। কোন কোন ‘সীসা লাউঞ্জ’ গোপনীয়তা ‘রক্ষার’ জন্য ছোট ছোট খোপ বা বিশেষ রুম করা থাকে। ফলে তরুণ প্রেমিক-প্রেমিকাদের পছন্দের তালিকায় খুব সহজেই ‘সীসা লাউঞ্জ’ জায়গা করে নেয়। সীসা মূলত মাদকেরই অন্য রূপ, আরেকটি ধরণ। তরুণ প্রজন্ম, নতুন প্রজন্ম যদি এভাবে সীসার নেশায় আসক্ত হয়, এই বলয় থেকে বের হতে না পারে তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অন্ধকার ছাড়া আর কী অপেক্ষা করছে?     (লেখাটিতে ইরা একটি ছদ্দ নাম)।

লেখক: চিকিৎসক ও কলামিস্ট