নির্বাচন, রাজনীতি এবং বিএনপি’র ষড়যন্ত্র

প্রকাশিত :০২.১১.২০১৭, ২:১০ অপরাহ্ণ
  • মোহাম্মদ সেতাব উদ্দিন

জাতীয় নির্বাচনের প্রায় বছরখানেক দেরি আছে। কিন্তু কিছুদিন ধরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন সভা-সমিতিতে, সাংবাদিক সম্মেলনে কিংবা ঘরোয়া অনুষ্ঠানে নিয়মিত বক্তব্য দিয়ে চলেছেন। কখনও বলছেন, ‘সহায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না’, কখনও বলছেন, ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন হবে না’, কখনও বলছেন- ‘এই নির্বাচন কমিশন দুর্বল মেরুদণ্ডহীন’, আবার কখনও দাবি তুলছেন, ‘বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী নামাতে হবে’। আর এই সবকিছুর জন্য আলাপ আলোচনা দরকার।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভি পল্টন অফিসে বসে ক্রমাগত বক্তব্য দিয়েই চলেছে আরও একটু বাড়িয়ে। তার ভাষায় ‘অবৈধ সরকারের অধীনে তাদের ধামাধরা নির্বাচন কমিশনের কাছে বাংলাদেশের মানুষ নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করে না। বিএনপির পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে তা দেখে অবৈধ সরকার ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বিএনপিনেতা তারেক জিয়ার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে এবং দেশনেত্রীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় হয়রানিমূলক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।’
প্রশ্ন হলো সরকার তো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে না, বিচারিক আদালত প্রয়োজনে এ কাজ করে থাকে। তাহলে সরকারের কথা বলে জনগণকে ধোকা দেয়া হচ্ছে কিনা?
অন্যদিকে ১৪ দলের মুখপাত্র আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী মো. নাসিম বলছেন, ‘বিএনপি’র সঙ্গে কোন আলোচনা নয়। কারণ ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি’র নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তার দাবি অনুযায়ী আমাদের দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা আলোচনার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, টেলিফোনে অনুরোধ করেছিলেন আলোচনায় বসার জন্য কিন্তু তিনি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। বেগম খালেদা জিয়া নিজেই সময় বেধে দিয়েছিলেন কিন্তু পরে তার বেধে দেয়া সময়ের মধ্যেই আলোচনায় বসতে তিনি অসম্মতি জানান।
মো. নাসিম আরও বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দায়িত্ব পালন করবে শেখ হাসিনার বর্তমান সরকার আর সেনাবাহিনী থাকবে কি থাকবে না সেটা ঠিক করবে নির্বাচন কমিশন।

এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নিত্যদিন বলেই চলেছে, ‘সহায়ক সরকারের কাজ করবে শেখ হাসিনার সরকার। অনির্বাচিতদের নিয়ে তথাকথিত সহায়ক সরকার গঠনের কোন সুযোগ নাই। আর বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় আওয়ামী লীগ যাবে না। কারণ গত নির্বাচনের আগে তারা বারবার আলোচনার প্রস্তাব দেয়ার পর আমাদের নেত্রী দেশরত্ম শেখ হাসিনা যখন আলোচনার জন্য আহ্বান জানালেন তখন তারা প্রত্যাখ্যান করল। সুতরাং আর কোন আলোচনা নয়।’
আমরা সকলেই জানি বেগম খলেদা জিয়া সময় বেধে দিয়ে উন্মুক্ত জনসভায় বলেছিলেন, ‘৩৬ ঘণ্টার মধ্যে আলোচনায় ডাকতে হবে নইলে ৩৬ ঘণ্টা পর, পরশুদিন থেকে হরতাল হবে।’ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই টেলিফোন করে আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া হরতালের অজুহাতে পরদিন আলোচনায় বসতে রাজি হননি। শেখ হাসিনা বুঝিয়ে বলতে চেষ্টা করেছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘আবার হরতাল কেন? ৩৬ ঘণ্টা তো হয়নি, ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমি আলোচনায় বসতে আমন্ত্রণ জানিয়েছি।’ কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া সেদিন জনসভায় লাখ জনতার সামনে দেয়া তার ওয়াদা রক্ষা করেননি। তিনি আলোচনায় বসতে রাজি হননি। কেন রাজি হননি তা আজও মানুষ জানতে পারেনি। তবে কোন কোন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ধারণা কোন অদৃশ্য শক্তির ইরাশায় তিনি এমন করেছিলেন! প্রথমে নিশ্চিত ধারণা ছিল হাসিনা আলোচনার জন্য ডাকবেন না। কিন্তু সত্যি সত্যি যখন শেখ হাসিনা তাদের বেধে দেয়া সময়ের অনেক আগেই বেগম খালেদা জিয়াকে আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ জানালেন তখন বেগম জিয়া এবং তার মুরুব্বীদের মাথায় বজ্রাঘাত হলো। কিংকর্তব্যবিমুঢ় খলেদা জিয়া কি করবেন তাৎক্ষণিক বুঝে উঠতে না পেরে শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে রীতিমত দুর্ব্যবহার করে বসলেন।

এদিকে নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোন ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। বিএনপি’র অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নাকচ করে দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দিল। এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ মোট সাতটি মন্ত্রণালয় বিএনপিকে দেবার জন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাব দিলেন। এবার বিএনপি দাবি করল শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হবে, পদত্যাগ করতে হবে। বিএনপি’র এই দাবির সবগুলোই ছিল তথাকথিত সুশীল সমাজের ক্ষুদ্র একটি অংশের। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ বা ‘সুজনের’ একটি সেমিনারে বক্তারা ঠিক এই দাবিগুলোই তুলে ধরে ছিল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিল কোন টালবাহানা করে লাভ হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে। এমন অবস্থায় বিএনপি নির্বাচন থেকে কার্যত সরে দাঁড়াবার ঘোষণা দিল। আলাপ আলোচনা, বাকবিতণ্ডায় সময় গড়িয়ে গেল। শেখ হাসিনা বললেন, আমাদের নিয়ম রক্ষার জন্য হলেও এই নির্বাচন করতে হবে। ফিরে আসার কোন পথ নাই। তখন বিএনপি বলল, এই নির্বাচন আমরা যেকোনো মূল্যে রুখে দেব। এই নির্বাচন হতে দেব না । বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুই বড় রাজনৈতিক দল মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেল। বিএনপি নির্বাচন বন্ধের জন্য সারা দেশ জ্বালাও পোড়াও শুরু করল। পোলিং সেন্টার, পোলিং বুথে পেট্রোল দিয়ে আগুন দিল। ভোট কেন্দ্র জ্বালিয়ে দেবার নামে প্রায় পঞ্চাশটি মত প্রাথমিক বিদ্যালয় পুড়িয়ে ছাই করে দিল। কয়েকজন প্রিজাইডিং অফিসার অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেল। ভোটাররা জীবনের ভয়ে ভোট কেন্দ্র ছেড়ে পালিয়ে গেল। অনেক প্রার্থী তার প্রার্থীতার আবেদন তুলে নেবার ঘোষণা দিল। এমতাবস্থায় ভোট হলো কিন্তু ১৫৪ জন প্রাথী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলো।

নির্বাচনের পর থেকে বর্তমান সরকারকে বিএনপি অবৈধ সরকার বলে আসছে। ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত প্রতিনিধির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিএনপি নেতাদের মুখে প্রায় শোনা যায় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন নিয়ম রক্ষার জন্য আমাকে এই নির্বাচন করতে হবে। তাহলে আজ কেন তিনি জেকে বসলেন? আওয়ামী লীগের বক্তব্য পরিস্কার ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন কিন্তু আপনারা তো তার কথা শুনেন নাই, জ্বালাও পোড়াও, ব্যালট বাক্স ছিন্তাইসহ নির্বাচন বন্ধ করার জন্য হেন অপচেষ্টা নাই আপনারা করেননি। আপনারও কথা রাখেননি। আমরাও রাখতে বাধ্য নই।’
আসলে বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে জন্মলগ্ন থেকেই ষড়যন্ত্র এবং গোপন আঁতাতে বিশ্বাসী। গত ২৮ অক্টোবর রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দেবার নাম করে বেগম খালেদা জিয়া গাড়িবহর নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন এটা কি মনে করেন উদ্দেশ্যমূলক নয়? অবশ্যই ‘ডালমে কুছ কালা হ্যায়।’ সামনে ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা হত্যা মামলার রায়। এই মামলায় তথ্য প্রমাণ যা উপস্থাপিত হয়েছে তাতে বিএনপি ফেঁসে যাবারসমূহ সম্ভাবনা। আর তাই জনসমর্থন ঝালিয়ে নিতে গজগামিনী হলেন।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা এবং অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক, বাংলাদেশ বেতার।