ডা. আব্দুন নূর তুষার। ছবি: সংগৃহিত

কেন্দ্র- স্বপ্ন বুননের কারখানা

প্রকাশিত :০৫.১১.২০১৭, ৪:৪২ অপরাহ্ণ
  • ডা. আব্দুন নূর তুষার
    বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে আমার প্রথম পদার্পন খুব নাটকীয়। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এস এস সি পরীক্ষার পরে আমাদের ক্লাসরুমে এসে বক্তব্য দিলেন, পৃথিবীটা বিরাট এক রসগোল্লা। এই রসগোল্লার স্বাদ নিতে হবে পিপড়ার মতো। তখন তিনি টেলিভিশন উপস্থাপনার কারনে খ্যাতির মধ্য গগনে।

আমরা এটাও জানতাম তিনি ঢাকা কলেজের শিক্ষক। তবে তার আগেই আমি কেন্দ্রের কথা জানতাম। আমার মায়ের স্কুলজীবনের বান্ধবী মমতাজ খালা ও তার স্বামী ফরিদ খালু হলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের চাচা শ্বশুর। কিনি ছিলেন কেন্দ্রের ট্রাস্টি। আর স্যার ছিলেন আমার প্রিয় উপস্থাপক। সত্তর ও আশির দশকে খুব বেশী বাড়িতে টিভি ছিল না। সৌভাগ্যবশত আমাদের বাড়ীতে একটা টেলিভিশন থাকায় , আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিল টেলিভিশন। আর প্রিয় উপস্থাপক ছিলেন স্যার।

স্যারের রসগোল্লা বক্তৃতার সাথে ছিল বই পড়া প্রতিযোগিতা ও তারপর পরীক্ষায় প্রথম দশজনকে ১০০০ টাকা করে মোট দশজনের জন্য ১০,০০০ টাকার বই পাবার প্রলোভন। সেই লোভে ৪০ টাকা দিয়ে কেন্দ্রের লাইব্রেরীর সদস্য হলাম। প্রতিযোগিতা শেষে সেই টাকা ফেরত দেবার নিশ্চয়তা দিলেন স্যার।

শুরু হল বই পড়ার প্রতিযোগিতা। ঢাকা শহরের বিভিন্ন কলেজ থেকে আসা ছেলে মেয়েরা বই পড়ে। তারপর বই নিয়ে হয় আলোচনা। স্যার আসেন। আমাদের বয়সীদের স্বল্প জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে বলা কথা তিনি মনোযোগ দিয়ে শোনেন। একসময় পুরষ্কারও পেয়ে গেলাম। তারপরও কেন্দ্রে আসা যাওয়া বন্ধ হলো না আমার। কি এক অদ্ভুত মায়া আর বই পড়ার অদম্য আকাংখা প্রতিবেলা কেন্দ্রে নিয়ে যেত আমাকে। বাংলা মোটরের মোড়ে বিআরটিসির লাল বাস থামতো না। লাফ দিয়ে নামতে হতো। কখনো কখনো ফার্মগেট থেকে হেঁটে চলে আসতাম। কেন্দ্রে দেখা হতো বাংলাদেশের নামকরা সব মানুষদের সাথে।

স্যার এর প্রিয় ছাত্ররাও আসতেন। লিয়াকত আলী, মিজারুল কায়েস, মিজানুর রহমান, আব্দুল বাতেন , লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম, আহমাদ মাজহার, এরা সব আমাদের সাথে বইয়ের আড্ডায় অংশ নিতেন। কেন্দ্র তখন অনেক ছোট। মাত্র বছর কয়েক হলো ইন্দিরা রোডের ভাড়া বাসা থেকে নিজের ঠিকানায় এসেছে । উত্তম সাহার ডিজাইনে কেন্দ্রের সাধারন ইটের মেটে লালচে রং এর একতলা দালান, আর একটা পুরোনো বাংলো। বাংলোটা লাইব্রেরী। তার পাশে গান শোনার কক্ষ। ওখানে ছিল সবেধন নীলমনি পুরোনো একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রনের যন্ত্র।

আমি ভিনাইল রেকর্ড ঝাড়পোছ করার উসিলায় দুপুরে এসি ছেড়ে গানশুনি। স্যার মাঝে মাঝে বৈকালিক বিশ্রাম করেন সেখানে। একটা ইজি চেয়ার ছিল ঘরের একমাত্র আসবাব। আর নানা রকম গানের যন্ত্রের সমাহার। ডেনন, আকাই রেকর্ড প্লেয়ারে গানে শোনার মজা্ আলাদা। আমি সুযোগ পেলেই শুনি। সেখানে পরিচয় হলো মোজার্ট, বিটোফেন,চাইকোভস্কি, রবিশংকর, কেনি রজার্স, জ্য মিশেল এর সাথে। শচীন দেব এর গান, নিধু বাবুর টপ্পা, ঠুমরি, গজল, গোলাম আলী, আলাউদ্দিন খান, মেহেদী হাসান, সকলেই বন্ধু হয়ে উঠলেন আমার একলা দুপুর আর শুকনো বিকেল গুলোতে।

আসেন সৈয়দ হক, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, আবদুস শাকুর, শামসুর রাহমান সহ বড় বড় সব লেখকেরা। সুপুরুষ সুদর্শন উপস্থাপক আনিসুল হক, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ আসেন। মাঝে মাঝে আসেন আবেদ খান ও সানজিদা খান। মমতাজউদ্দিন আহমেদ ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে হাস্যরসে ভরে রাখেন সকলকে। পটুয়া কামরুল হাসান এর গল্প শুনি মুগ্ধ হয়ে। ফরহাদ মজহার তখন সবে শুরু করেছেন নয়াকৃষি আন্দোলন। রাহমান চৌধুরী নাটক নিয়ে কঠিন সব কথা বলেন। আনোয়ার ভাই বসতেন সুরঞ্জনায় ! বড় মিষ্টভাষী , সজ্জন মানুষ , আমাকে খুব স্নেহ করতেন।

একদল তরুন সাহিত্যিক আসেন, আবৃত্তিকাররার আসেন, আসেন কিছু নবীন গান এর শিল্পী। কেন্দ্রের ছাদে গরম চা শিংগাড়ার সাথে জমে ওঠে তার চেয়েও গরম আড্ডা। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা , কেন্দ্র কখনো খালি নেই সন্ধ্যায়। আমার বন্ধুরা যখন যৌবনের আগমনের সময়টিতে নানা রকম ভাবে পুরূষ হয়ে উঠছে, আমি তখন বালকের বিস্ময়ে আবিস্কার করছি সৃজনশীল মানুষদের সাথে চলবার আনন্দ ।

কেন্দ্র ছিল একটা স্বপ্নচাদর বুননের কারখানা। আমি চিনে ফেললাম অস্ত্রভস্কি, গোগল, রাহুল সাংকৃত্যায়নকে। আহমদ ছফা, আরজ আলী মাতব্বর সবই পড়া হয়। কিন্তু কেন্দ্র কোন বিশ্বাস বা আদর্শের প্রচার করে না। কেন্দ্র অনেকটা রেল স্টেশনের মতো। যে যার গন্তব্যে যাবার জন্য সেখানে আসে, কেউ বসে আড্ডা দেয়, কেউ চায়ের দোকানে, কেউ বইয়ের স্টলে। কেন্দ্র কারো গন্তব্য ঠিক করে দেয় না।

বিশ্ব সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, রাজনীতি, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, ধর্ম নিয়ে কেন্দ্র বই হাতে তুলে দেয় কিন্তু কোন কিছু চাপিয়ে দেয় না। কেন্দ্র মানুষের অন্তরের শক্তি ও সামর্থ্যতে আস্থা রাখে, বিশ্বাস করে মানুষের মধ্যে ভালো আছে, আলো আছে, আছে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠার সম্ভাবনা। হৃদয় নি:সৃত ভালোবাসা ও শুভকর্ম দিয়ে আলোকিত মানুষ হবার কথা বলে কেন্দ্র কিন্ত সে আলো ধার করা নয়, সে আলো নিজস্ব আলো।

প্রতিটি হৃদয় একেকটি মোমবাতি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আগুন হাতে কেবল ধরিয়ে দিচ্ছেন সলতের মাথায় দীপশিখা। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র এরপর শুরু করলো স্কুল কর্মসূচি। শুরুর দিনগুলিতে আমরা অল্প কয়েকজন আর স্যার ঘুরে ঘুরে স্কুলগুলিকে রাজি করিয়ে বই পৌঁছে দিতাম। প্রতি সপ্তাহে একবার গিয়ে বই বিলি করতাম। আর সবশেষে পরীক্ষা আর পুরষ্কার। স্যারের দুই দরোজার ভগ্নপ্রায় পাবলিকা গাড়ীতে দুটো স্পীকার, পুরস্কারের বই আর মাইক্রোফোন নিয়ে চলে যেতাম স্কুলে। প্রধান শিক্ষকের ঘরে বসে স্যার কথা বলতেন আর আমি জুড়ে দিতাম তারের সাথে মাইক। আমি উপস্থাপক, স্যার বক্তা।

তারপর এলো চলমান পাঠাগার , বইয়ের বাস, মোবাইল লাইব্রেরী। আলো আমার আলো ওগো গানের শব্দে মুখরিত হয়ে উঠলো ঢাকা শহর ও পরে দেশের বিভিন্ন শহরের রাস্তা। বইয়ের ফেরীওয়ালা তার পসরা সাজিয়ে রাস্তাকে বদলে দিলো পাঠাগারে।

সারাদেশে মানুষ বই পড়ছে এখন। কেন্দ্রের সেই লালচে দালান নেই, নেই আমগাছ আর মহুয়া গাছ, হাস্নাহেনা আর বকুল। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র এখন অনেক বড়। কোটি কোটি বই এখন মানুষের ঘরে ঘরে পৌছে গেছে। প্রতি বছর ত্রিশ লক্ষ স্কুলের শিশু বই পড়ে। কেন্দ্র এখন আর উঠোন শোভিত ছোট্ট বাড়ী নয় বরং গোটা দেশ হয়েছে তার উঠোন, সব স্কুল হয়েছে তার পাঠাগার।

আমার মনে হয় এসব কেবলি সংখ্যা। সংখ্যা দিয়ে কেন্দ্রকে বোঝা সম্ভব না। কেন্দ্রকে বুঝতে হলে, মানুষকে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে ভালো মন্দের লড়াইকে। বিশ্বাস করতে হবে, অন্ধকার যতো গাঢ়, ভয়ংকর ও সীমাহীন হোক, একটি আলোর ফুলকি তাকে এক নিমেষে হারিয়ে দেয়।

অনেকে বলেন স্যার আমার গুরু। তিনি আসলে আমার বন্ধু। তিনি কোন কিছু শেখান না, শিখতে বলেন। তিনি মনে করেন মানুষ নিজে থেকেই শেখে।  ঠিকানাটুকু বলে দিলে মানুষ নিজে থেকেই যেমন বাড়ী খুঁজে পায়, তেমনি আলোর দেখা পেলে মানুষ নিজে থেকেই আলোর দিকে যায় আর আলো না পেলে নিজেই পাথরে পাথর ঠোকার মতো হৃদয়ের অজস্র বেদনা দিয়ে আলো জ্বালায়। তিনি কখনো হতাশার কথা বলেন না। সময় সময়ের মতো যেখানে যায় যাবে, তিনি কেবল কাজ করার কথা বলেন। ভালো যা, সেটা করলেই হলো। সেই ভালোর ফলাফল নিজে না পেলেও কেউ না কেউ তো পাবে।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আমাকে বলতেন , তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না তুষার। বড় ছটফটে আর অস্থির তুমি। আমার সেই অস্থিরতা আজো যায় নাই। এখনো আমি সময় পেলেই কেন্দ্রে যাই। একা একা বইয়ের শেল্ফে চোখ বুলাই। এখনো আমি জানি কেন্দ্রের কোন ঘরে একটা দরোজা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে, কব্জায় তেল দিতে হবে। কারন কেন্দ্র আমার ও আমার মতো অনেকের কাছেই নিজের বাড়ীর মতো।

আলোর ইশকুল খুলেছে কেন্দ্র। আমি মাঝে মাঝে সেখানে কথা বলি। এখন স্যারের সাথে সাথে আমিও বই নিয়ে আড্ডা দেই। কিছু হতে না পেরেও হয়েছি তো কিছু। স্যার বলতেন বড় ভাই হওয়া খুব সহজ না। সমাজে এখন আর বড় ভাই নাই। আমি এখন অনেকের ভাই হয়েছি।

শত শত সংগঠকের পরিশ্রম আছে কেন্দ্রের প্রতিটি ইটে । সায়ীদ স্যার তাদের কে অনুপ্রাণিত করেছেন বৃহত্তর স্বপ্নকে গড়ে তুলতে , মানুষকে তার স্বপ্নের সমান বড় আর আশার সমান মহান করে , আলোকিত মানুষ গড়তে।

সদ্য স্কুল পাশ করে চল্লিশ টাকা দিয়েছিলাম পাঠাগারের সদস্য হয়ে একটা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাবার লোভে্। বয়স বেড়েছে, কিন্তু কেন্দ্র আমাকে এখনো সেই কৈশোরের মতোই কৌতুহলী আর বিস্মিত করে রেখেছে।

সেই চল্লিশ টাকা আমি কখনো ফেরত নেবো না।

(লেখকের ফেজবুক প্রোফাইল থেকে সংগৃহিত)

অাজসারাবেলা/রবি/কলাম/০৫/নভেম্বর/২০১৭