রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে সমালোচনাই বিএনপির অবদান

প্রকাশিত :০৬.১১.২০১৭, ২:১৭ অপরাহ্ণ
  • প্রফেসর ড. মো. মাহবুবর রহমান

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে শেখ হাসিনার পদক্ষেপ সারা বিশ্বে যখন প্রশংসিত তখন মীর্জা ফখরুল ইসলাম অযথা চিৎকার পটু রিজভী সাহেব স্বভাবজাতভাবেই ভুল বিবৃতি দিচ্ছেন। বিদেশ থেকে দেশে ফিরেই তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন যখন সরকারকে হেয় করার চিন্তায় সমালোচনা করেন তখন কারোই বুঝতে বাকি থাকে না, বিএনপির চাওয়া পাওয়া কী।
মিয়ানমার একসময়ের অতি পরিচিত বার্মা যা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মূল বাসস্থান। বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক স্বয়ং গৌতম বুদ্ধ একটি ক্ষুদ্র কীটকেও মেরে ফেলার বিপক্ষে। ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ এটিই গৌতম বুদ্ধের মূল শিক্ষা। বার্মার রাখাইন রাজ্যে মুসলমান, খৃষ্টান, হিন্দু এবং বৌদ্ধরা যুগযুগ ধরে একসঙ্গে বসবাস করে আসছে। রাখাইন রাজ্যে রোহিজ্ঞারা শত শত বৎসর ধরে একটি সুপরিচিত জাতিগোষ্ঠি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়ই শুধু নয়, সরকারি সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ এবং সক্রিয় অংশগ্রহণে সেখানে ২৫ আগস্ট ২০১৭ থেকে চলছে রোহিঙ্গা নিধন।

মিয়ানমারে যখন এই অমানবিক নির্যাতন, নৃশংসতা ও হত্যাযজ্ঞ চলছে বিশ্বনেতারা তখন নীরব, বিএনপি নেত্রী তখন শীতনিদ্রায় বিভোর, আর তার অন্য নেতৃবৃন্দ হয় সরকারের ব্যর্থতা প্রচারে ব্যস্ত অথবা যার যার কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত। কারো মুখে নেই কোন দুঃখ প্রকাশ, কোন প্রতিবাদ বা কোন বিবৃতি। এমন অবস্থায় নীরব থাকতে পারেননি মানবতার জননী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি মিয়ানমার সন্নিকটে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের আশ্রয় প্রার্থীদের প্রতি সদয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তার সরকারের সীমিত সম্পদ এবং জনগণের সহায়তা দিয়ে তাদের কষ্ট যতটা লাঘব করা সম্ভব সেদিকে দৃষ্টি রাখার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। প্রয়োজনবোধে নিজেদের খাবার অর্ধেক করে খাবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ২১ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এই অমানবিক নৃশংস ও নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনীর নির্যাতন বন্ধ, রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবনের অবসান এবং মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য উদাত্ত আহবানও জানান তিনি।

রোহিঙ্গাদের জন্য সহমর্মিতা ও সমানুভূতি প্রদর্শনের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচ্ছসিত প্রশংসা করে তাকে ‘প্রাচ্যের নতুন তারকা’ হিসেবে অভিহিত করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) পত্রিকা ‘দৈনিক খালিজ টাইমস’। ‘শেখ হাসিনা জানেন সহমর্মিতার নৈপুণ্য’ শিরোনামে প্রকাশিত লেখায় শেখ হাসিনা সম্পর্কে এমন মন্তব্য করা হয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর লেখাটি আমিরাতের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকটির ব্লগে পোস্ট করেন পত্রিকাটির মতামত সম্পাদক অ্যালন জ্যাকব।
অ্যালন জ্যাকব বলেন, ‘মিয়ানমারের নেত্রী অং সাং সু চি যখন কণ্ঠস্বর হারিয়েছেন এমন সময় শেখ হাসিনার সোচ্চার হয়ে ওঠা এক বিরাট স্বস্তি। সু চি ও শেখ হাসিনা তাদের নিজ নিজ দেশের মুক্তিসংগ্রামের মহানায়কের কন্যা। দুজনেই খুব কাছ থেকে ট্র্যাজেডি দেখেছেন। যদিও ফারাকটা বিশাল। মানবতা যখন বিপন্ন তখন একজন নিছক দর্শক হয়ে থাকার পথ বেছে নিলেন, অপরজন দেখালেন অসীম দয়া। শেখ হাসিনার প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত ছোট্ট দেশটিতে একবারে ৪ লাখ ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছেন।’

নিউইয়র্কে জাতিসংঘে অধিবেশন চলাকালে শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা ইতিমধ্যে তিন লাখ শরণার্থী পেয়েছি, কিন্তু আমাদের স্থান সংকুলানের সমস্যা থাকা সত্ত্বে আরও বেশি শরণার্থী গ্রহণের বিশাল হৃদয় আমাদের রয়েছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবেলায় ওআইসিভুক্ত দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহবান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি নির্যাতন বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়া এবং তাদের জন্য সেফ জোন তৈরিসহ ছয়টি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের সামনে তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই জাতিগত নির্মূল অভিযানের অবসান দেখতে চাই। মুসলমান ভাইদের দুর্দশার অবসান চাই। এই সংকটের সূচনা হয়েছে মিয়ানমারে, তাদেরকেই এ সমস্যা সমাধান করতে হবে। সংকট মোকাবেলায় ওআইসির যে কোনো উদ্যোগে অংশ নিতে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে।

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী বেকম্যান প্যালেসে যুক্তরাজ্য ও মাল্টার প্রধানমন্ত্রীর আহবানে কমনওয়েলথ দেশগুলোর প্রধানদের এক সংবর্ধনায় যোগ দেন। সন্ধ্যায় তিনি ম্যাডিসন এভিনিউর প্যালেস হোটেলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আয়োজিত অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সর্বত্রই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে শেখ হাসিনা জাতিসংঘে ঘোষিত পাঁচটি প্রস্তাবের বাস্তবায়নে সকলকে উদ্বুদ্ধ করেন:
১. চিরতরে মিয়ানমারে ‘সহিংসতা ও জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ করা।
২. অনতিবিলম্বে জাতিসংঘ মহাসচিবের নিজস্ব অনুসন্ধানী দল প্রেরণ।
৩. সব নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান এবং মিয়ানমারে নিরাপদ এলাকা গড়ে তোলা।
৪. বিতাড়িত সব রোহিঙ্গাকে নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
৫. কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার পূর্ণ ও দ্রæত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

এছাড়াও সন্ত্রাস দমনে তিনটি প্রস্তাব দেন:
১. সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে হবে।
২. সন্ত্রাস কাজে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে।
৩. আন্তর্জাতিক বিবাদ মীমাংসা করতে হবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে।
৪. শেখ হাসিনার নেত্বত্বে এই সকল কুটনৈতিক তৎপরতা আরো জোরদারভাবে অব্যাহত রয়েছে।

বিএনপির চোখে এসকল কর্ম ও কুটনৈতিক তৎপরতা নজরে আসে না। বরং উল্টো কথা বলে, জাতীয় ঐকমত গড়ে তুলতে বলে, মানুষকে উত্তেজিত করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায় যা অলিক স্বপ্ন মাত্র। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের ভূমিকা যখন সারা বিশ্বে প্রশংসিত, সে সময়ে বিএনপি প্রধান ও তার নেতৃবৃন্দের মিথ্যাচার আবারো প্রমাণ করছে যে সত্য বুঝতে এবং বলতে পারে না, যা কিছুই বলে সব অসত্য, অপউদ্দেশ্য প্রণোদিত।
লেখক: সাবেক উপাচার্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।